চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বগতি, ৩ মাসে আক্রান্ত ৪ হাজারের বেশি
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১৪:৫৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
চট্টগ্রামে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—মাত্র তিন মাসে জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ১৬৮ জন। সেপ্টেম্বরের শেষেও সংক্রমণের গতি কমেনি; বরং অক্টোবরের প্রথম চার দিনেই নতুন করে ৩৪১ জন আক্রান্ত হয়েছেন। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন ২১ জন, যার মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বরেই মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের।
রোববার (৪ অক্টোবর) চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ৫৩৬ জন। আগস্টে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২০২ জনে। সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যায়—এক মাসেই আক্রান্ত হন ২ হাজার ৪৩০ জন। অর্থাৎ আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।
অক্টোবরের শুরুতেও সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি থামেনি। মাসের প্রথম চার দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ৩৪১ জন। দৈনিক হিসাবে এ সময়ে গড়ে প্রায় ৮৫ জন করে রোগী শনাক্ত হয়েছেন। অথচ সেপ্টেম্বরে দৈনিক গড় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল প্রায় ৮১ জন। অর্থাৎ নতুন মাসের শুরুতেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
হাসপাতালেও বাড়ছে চাপ
গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে নতুন করে ৯৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৭ জন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেসে (বিআইটিআইডি) ১০ জন, ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে ১৫ জন, সিএমএইচে ৪ জন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ১৪ জন এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ২৪ জন ভর্তি হয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে, বর্তমানে ৯৪ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ পর্যন্ত চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৪ হাজার ৫৬৬ জন।
মহানগরের পাশাপাশি উপজেলাতেও বিস্তার
চলতি বছরের ৪ অক্টোবর পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৮০৭ জনে। এর মধ্যে মহানগর এলাকায় আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ২২৮ জন। বিভিন্ন উপজেলায় আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৬০ জন। আর চট্টগ্রামের বাইরে থেকে এসে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর সংখ্যা ৫১৯ জন।
উপজেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে সীতাকুণ্ডে—৬০৮ জন। এরপর কর্ণফুলীতে ২৮১, বাঁশখালীতে ১৫৩, রাঙ্গুনিয়ায় ১৫০ এবং সাতকানিয়ায় ১১৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
সেপ্টেম্বরে মৃত্যু ১৬ জনের
আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। চলতি বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে একজন, জুলাই ও আগস্টে দুজন করে এবং সেপ্টেম্বরে সর্বোচ্চ ১৬ জন মারা গেছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের ডেঙ্গুর মূল চাপ শুরু হয়েছে জুলাই থেকে। এরপর প্রতি মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। জুলাইয়ের ৫৩৬ জন থেকে আগস্টে তা বেড়ে ১ হাজার ২০২ এবং সেপ্টেম্বরে ২ হাজার ৪৩০ জনে পৌঁছেছে। অক্টোবরের শুরুতেও সংক্রমণের সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে।
রোগীর সঙ্গে বাড়ছে পথ্যের খরচ
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় ডাব, মাল্টাসহ বিভিন্ন ফলের চাহিদাও বেড়েছে। আর এই বাড়তি চাহিদার প্রভাব পড়েছে বাজারদরে। চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি প্রতিদিনের পথ্য কিনতেও অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে রোগীর স্বজনদের।
চট্টগ্রামের বাজারে বর্তমানে মাল্টা কেজিপ্রতি প্রায় ৪৮০ থেকে ৫২০ টাকা এবং আকারভেদে একটি ডাব ১৫০ থেকে ২২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রোগীর স্বজনদের ভাষ্য, হাসপাতালে ভর্তি ও ওষুধের খরচের পাশাপাশি প্রতিদিন ডাব, মাল্টা ও অন্যান্য ফল কিনতে হচ্ছে। ফলে ডেঙ্গু আক্রান্ত পরিবারের ওপর চিকিৎসার বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পথ্যের খরচও।
ব্যবসায়ীদের দাবি, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ায় ডাব ও মাল্টার চাহিদা বেড়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন বাঁশখালীর আব্দুস সবুরের ভাই আরিফ বলেন, চিকিৎসকের পরামর্শে তার ভাইকে বেশি করে তরল খাবার দিতে হচ্ছে। কিন্তু ডাব ও মাল্টার বাড়তি দামের কারণে তা কিনতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
ডেঙ্গুর সুযোগ নিয়ে ফলের দাম বাড়ানোর অভিযোগ তুলে ক্ষোভও প্রকাশ করেন তিনি।
সব মিলিয়ে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর সংক্রমণ যেমন দ্রুত বাড়ছে, তেমনি এর প্রভাব পড়ছে হাসপাতাল ও আক্রান্ত পরিবারের ব্যয়ের ওপরও। অক্টোবরের শুরুতেই আক্রান্তের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকায় সামনে পরিস্থিতি আরও কতটা ভয়াবহ হয়, এখন সেটিই বড় উদ্বেগের বিষয়।






















