তেঁতুলিয়ায় বালু-পাথর উত্তোলন: মৃত ৫ জনসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে মামলা
৪৫ বছর আগে মৃত্যু, তবুও মামলার আসামি ৫ জন

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:১৪:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৫ বার পড়া হয়েছে
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযানে তিনটি মেশিন জব্দের পর দায়ের করা মামলায় কয়েক দশক আগে মারা যাওয়া পাঁচ ব্যক্তিকেও আসামি করার অভিযোগ উঠেছে। শুধু মৃত ব্যক্তিই নন, প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন—এমন আরও কয়েকজনের নামও মামলায় দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
ঘটনাটি নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর মামলাটি প্রত্যাহারের আবেদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট তহশিলদার ও পুলিশ। উপজেলা প্রশাসনও মামলায় মৃত ও নিরপরাধ ব্যক্তিদের নাম আসার বিষয়টি স্বীকার করে তা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
তিন মেশিন জব্দ, ২২ জনের বিরুদ্ধে মামলা
মামলার এজাহার ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ১৫ সেপ্টেম্বর তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর ইউনিয়নের পোহাতুগছ এলাকায় অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের অভিযোগে অভিযান চালান উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম আকাশ।
অভিযানে তিনটি মেশিন জব্দ করে তেঁতুলিয়া মডেল থানায় নেওয়া হয়। ওই রাতেই ভজনপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার মানিক চন্দ্র বর্মন ২২ জনকে আসামি করে খনি ও খনিজ সম্পদ (নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন) আইন, ১৯৯২-এর ৫ ধারায় মামলা করেন।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, যারা অবৈধভাবে মেশিন দিয়ে বালু-পাথর উত্তোলনে জড়িত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথভাবে ব্যবস্থা না নিয়ে মামলায় মৃত ও নিরপরাধ ব্যক্তিদের নাম দেওয়া হয়েছে।
৩০-৪৫ বছর আগে মারা গেছেন, তবু মামলার আসামি
মামলার এজাহারে ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে ভজনপুর ইউনিয়নের কাউরগছ এলাকার ফয়জুল হককে, যিনি স্থানীয়ভাবে ‘ফজলু মেম্বার’ নামে পরিচিত ছিলেন। স্বজন ও স্থানীয়দের দাবি, তিনি প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ বছর আগে মারা গেছেন।
২ নম্বর আসামি করা হয়েছে তার আপন দাদা মহর আলীকে। স্বজনদের দাবি, তিনিও প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ বছর আগে মারা গেছেন।
এ ছাড়া মামলার ৫ নম্বর আসামি মহামুদ্দিনও বহু বছর আগে মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন তার স্বজনরা। ১০ নম্বর আসামি রমজান আলী এবং ১৪ নম্বর আসামি মজিবর রহমানও কয়েক দশক আগে মারা গেছেন বলে দাবি স্থানীয়দের।
সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় ও স্বজনরা ওই পাঁচ ব্যক্তির কবরও দেখিয়েছেন।
‘আমার দাদাকে জন্মের পর দেখিনি’
ফয়জুল হক ও মহর আলীর স্বজন সাদেকুল ইসলাম বলেন, তার দাদা ও বড় ভাই অনেক বছর আগেই মারা গেছেন।
তার ভাষ্য, “কয়েক দিন আগে পোহাতুগছ এলাকায় প্রশাসন অভিযান চালিয়ে মেশিন জব্দ করেছে। পরে জানতে পারি, মামলায় আমার মৃত দাদা, বড় ভাই ও আমার নামসহ পরিবারের আরও কয়েকজনের নামে মামলা হয়েছে।”
মৃত মহামুদ্দিনের নাতি সামিউল ইসলাম বলেন, “আমার দাদাকে আমি জন্মের পর দেখিনি। আমার বাবার বয়স যখন চার-পাঁচ বছর, তখন আমার দাদা মারা গেছেন বলে শুনেছি। এখন মামলায় দেখি আমার মৃত দাদার নাম। ঘটনাটি দুঃখজনক।”
কাউরগছ এলাকার বৃদ্ধ আব্দুর রহমান বলেন, “মামলায় যাদের মৃত বলা হচ্ছে, তাদের আমরা দাফন-কাফন করেছি। তাদের নামে মামলা হয়েছে শুনে হতবাক হয়েছি।”
স্থানীয় যুবক মনির হোসেনের অভিযোগ, মামলার ২২ আসামিই নিরপরাধ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বলেন, “যারা মারা গেছে তাদের নামে মামলা হয়েছে। যারা মেশিন চালিয়েছে, তাদের নামেই মামলা নেই।”
ক্ষোভে সড়ক অবরোধ, তহশিলদারকে ঘেরাও
মামলা দায়েরের পরদিন ১৬ সেপ্টেম্বর ভজনপুর বাজারে তেঁতুলিয়া-পঞ্চগড় মহাসড়ক অবরোধ করেন স্থানীয়রা। এ সময় তহশিলদারকে অবরুদ্ধ করার ঘটনাও ঘটে বলে জানা গেছে।
পরে প্রশাসনের আশ্বাসে অবরোধ প্রত্যাহার করেন ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া এসিল্যান্ড এস এম আকাশের উপস্থিতিতে মামলাটি প্রত্যাহারের আবেদন করেন তহশিলদার। পরে পুলিশের সহযোগিতায় সংশ্লিষ্টদের ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই মেশিন দিয়ে অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলন চলছে। অথচ অভিযানে মাত্র তিনটি মেশিন জব্দ করা হয়েছে। এর পর মামলায় মৃত ও নিরপরাধ ব্যক্তিদের নাম আসায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
‘হোল্ডিং দেখে মামলা, একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে’
মামলার বাদী ও ভজনপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার মানিক চন্দ্র রায়ের কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী জমির হোল্ডিং দেখে মামলাটি করা হয়েছে।
তবে তিনি স্বীকার করেন, “একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে” এবং মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করা হয়েছে।
‘মামলায় কিছু ত্রুটি হয়েছে’
মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম আকাশ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে কার্যালয় ত্যাগ করেন। পরে গাড়িতে ওঠার সময় তিনি বলেন, মামলা করা হয়েছে এবং তা চলমান রয়েছে। পুলিশ তদন্ত করে প্রতিবেদন দেবে।
মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে তিনি বলেন, “মামলায় কিছু ত্রুটি হয়েছে। এটা প্রত্যাহারের জন্য বলছি। রিপোর্ট দিলে পরে ওইভাবে মামলার ব্যবস্থা করা হবে।”
তেঁতুলিয়া মডেল থানার ওসি লাইছুর রহমান ২২ জনের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করা হয়েছে। থানায় এবং আদালতেও আবেদন দেওয়া হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন।
‘মৃত ও নিরপরাধদের নাম কীভাবে এলো, দেখছি’
তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আনোয়ার হোসাইন বলেন, এ বিষয়ে তিনি অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, তহশিলদার জমির মালিকের খতিয়ান দেখে মামলায় নাম দিয়েছেন। এর কারণে এমন অনেক মানুষের নাম এসেছে, যারা ঘটনাস্থলে ছিলেন না, ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন; এমনকি মৃত ব্যক্তিদের নামও এসেছে।
মৃত ও নিরপরাধ ব্যক্তিদের নাম কীভাবে মামলায় এসেছে এবং কীভাবে তা সংশোধন করা যায়, সে বিষয়ে প্রশাসন ব্যবস্থা নিচ্ছে বলেও জানান ইউএনও।
























