ঢাকা ০৬:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

বন্যা ঠেকাতে নির্মাণ, এখন জলাবদ্ধতার কারণ—৩৬ বছরেও বদলায়নি ব্যবস্থাপনা

টাঙ্গাইল শহরের ‘মরণফাঁদ’ যুগনির স্লুইস গেট

মোঃ মশিউর রহমান, টাঙ্গাইল
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৫:৫৫:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বন্যার পানি নিয়ন্ত্রণে নির্মাণ করা হয়েছিল স্লুইস গেট। লক্ষ্য ছিল নদীর পানি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বাড়ানো এবং টাঙ্গাইল শহরকে বন্যার কবল থেকে রক্ষা করা। কিন্তু ৩৬ বছর পর সেই ব্যবস্থাপনাই যেন উল্টো বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, যুগনির স্লুইস গেটের ভুল ও অপরিকল্পিত পরিচালনায় একদিকে লৌহজং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে বর্ষায় পানি জমে সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।

স্থানীয়দের ভাষায়, টাঙ্গাইল শহর রক্ষা বাঁধের গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামো এখন অনেকটাই ‘মরণফাঁদ’।

১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পর ১৯৮৯ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশে প্রণয়ন করা হয় ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যান—ফ্যাপ-২০। এর অন্যতম উপাদান ছিল কম্পার্টমেন্টালাইজেশন পাইলট প্রজেক্ট (সিপিপি), টাঙ্গাইল। পরিকল্পনাটির উদ্দেশ্য ছিল যমুনার প্লাবনভূমিতে ছোট-বড় কম্পার্টমেন্ট বা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেষ্টনী তৈরি করে পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনের উন্নয়ন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে ওই প্রকল্পের অংশ হিসেবে টাঙ্গাইল শহর রক্ষা বাঁধের সঙ্গে নির্মাণ করা হয় যুগনির স্লুইস গেট।

২১ কিলোমিটার বাঁধ, একটিই প্রবেশপথ

স্থানীয়ভাবে সিলিমপুর-করটিয়া বাঁধ নামে পরিচিত প্রায় ২১ কিলোমিটার দীর্ঘ টাঙ্গাইল শহর রক্ষা বাঁধটি পৌরসভা ও আশপাশের এলাকাকে যমুনা, পুংলী, ধলেশ্বরী ও লৌহজং নদীর ভাঙন এবং বন্যার হাত থেকে রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এই বাঁধের ভেতরে বর্ষা ও বন্যার পানি প্রবেশের জন্য সদর উপজেলার বাঘিল ইউনিয়নের কাঠুয়া যুগনিতে লৌহজং নদীর ওপর নির্মাণ করা হয় স্লুইস গেটটি।

পরিকল্পনা ছিল—বর্ষায় প্রয়োজন অনুযায়ী গেট খুলে পানি প্রবেশ করানো হবে। শুষ্ক মৌসুমে তা বন্ধ রেখে বাঁধের ভেতরের জমি রক্ষা করা হবে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবে সেই পরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনা কার্যকর হয়নি।

দীর্ঘদিন ধরে গেটের সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় লৌহজং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। নদীর উৎস মুখে পলি জমে কমেছে নাব্যতা। একসময়কার প্রবাহমান নদীটি অনেক জায়গায় এখন মরা খালের চেহারা নিয়েছে।

নদীর পথ বন্ধ, কমছে মাছও

গেটের কারণে নদীর সঙ্গে বাঁধের ভেতরের জলাশয়গুলোর স্বাভাবিক যোগাযোগও ব্যাহত হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি। এতে মাছের চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিল-ঝিলে মাছের উৎপাদন কমেছে।

অন্যদিকে নদী ও খালের অববাহিকায় পলি জমে ভরাট হচ্ছে বিভিন্ন জলাশয়। এতে শুধু মৎস্যসম্পদ নয়, পুরো এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাও সংকটে পড়ছে বলে অভিযোগ।

এরই মধ্যে প্রকল্পের আওতায় একসময়ের প্রবাহমান শ্যামা বাবুর খালকে ১৯৯৬ সালে ড্রেনে রূপান্তর করা হয়। কিন্তু পানি নিষ্কাশনের পথ কার্যকর না থাকায় বর্ষা এলেই টাঙ্গাইল শহর ও আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

বৃষ্টির পানি দ্রুত বের হতে না পেরে কোথাও ঘরবাড়ি, কোথাও সড়ক তলিয়ে যায়। অভ্যন্তরীণ এলাকায় দীর্ঘসময় পানি জমে থাকায় ব্যাহত হয় রবি ফসলের আবাদও। স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থির পানি ও জলাবদ্ধতার কারণে ডেঙ্গুসহ পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে।

‘একটি গেট দিয়ে ২১ কিলোমিটার এলাকার পানি ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়’

পানি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদ ড. মোবাশ্বেরার মতে, একটি মাত্র স্লুইস গেট দিয়ে ২১ কিলোমিটার বাঁধের ভেতরের পানি ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ফ্যাপ-২০ প্রণয়নের সময়কার বাস্তবতায় পরিকল্পনাটি কার্যকর হতে পারে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও দ্রুত নগরায়ণের কারণে সেই পুরোনো মডেল এখন আর আগের মতো কার্যকর নয়।

তার প্রস্তাব, যুগনির স্লুইস গেট আধুনিকায়নের পাশাপাশি বড় আকারের স্বয়ংক্রিয় গেট স্থাপন করতে হবে। জোয়ার, বৃষ্টি ও নদীর পানির স্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে গেট পরিচালনার ব্যবস্থা করতে হবে। বাঁধের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আরও দুই থেকে তিনটি স্লুইস বা কালভার্ট নির্মাণের কথাও বলেন তিনি।

একই সঙ্গে লৌহজং নদী ও শ্যামা বাবুর খাল খনন করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং গেট পরিচালনায় স্থানীয় পানি ব্যবহারকারী সমিতিকে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।

‘কখন গেট খোলা-বন্ধ হবে, নীতিমালা নেই’

স্থানীয় কাঠুয়া যুগনির বাসিন্দা রহিম শেখ ও কৃষক রইজ উদ্দিনের অভিযোগ, স্লুইস গেট পরিচালনায় স্বচ্ছতা নেই। কখন গেট খোলা হবে কিংবা কখন বন্ধ থাকবে—এ বিষয়ে স্থানীয়দের কাছে স্পষ্ট কোনো নীতিমালা নেই।

তাদের অভিযোগ, অনেক সময় রাজনৈতিক বিবেচনা বা ব্যক্তিস্বার্থে গেট খোলা-বন্ধ করা হয়। এতে সাধারণ মানুষের উপকারের বদলে ক্ষতি হচ্ছে।

টাঙ্গাইল জেলা সচেতন নাগরিক ফোরামের সভাপতি অকিবুর রহমান ইকবালের দাবি, ৩৬ বছর আগে যে বাস্তবতায় প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল, বর্তমান বাস্তবতায় সেটি আর কার্যকর নয়।

তার মতে, নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন পরিবর্তনের কারণে যুগনি স্লুইস গেটের কার্যকারিতা নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। গেটটি রাখা হলে এর আধুনিকায়ন জরুরি বলেও তিনি মনে করেন।

টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মাহমুদুল হক সানু বলেন, নদী, মানুষ ও শহর—তিনটিকেই রক্ষা করতে হলে যুগনির স্লুইস গেট নিয়ে নতুন করে বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশবান্ধব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি

অভিযোগ ও প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাইন উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

রক্ষাকবচই কি এখন বোঝা?

টাঙ্গাইল শহর রক্ষা বাঁধ নিঃসন্দেহে শহরকে নদীভাঙন ও বন্যার ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু বাঁধের ভেতরের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের সঙ্গে এর সমন্বয় কতটা কার্যকর—সেই প্রশ্ন এখন সামনে।

৩৬ বছর আগে যে স্লুইস গেট নির্মিত হয়েছিল বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি ব্যবস্থাপনার জন্য, সময়ের সঙ্গে তার কার্যকারিতা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। নদীর নাব্যতা কমছে, জলাবদ্ধতা বাড়ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি ও মৎস্যসম্পদ—স্থানীয়দের অভিযোগ এমনই।

ফলে প্রশ্ন একটাই—টাঙ্গাইল শহরকে বাঁচানোর জন্য নির্মিত বাঁধ ও যুগনির স্লুইস গেট কি এখন নতুন করে ভাবার সময় হয়নি?

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

বন্যা ঠেকাতে নির্মাণ, এখন জলাবদ্ধতার কারণ—৩৬ বছরেও বদলায়নি ব্যবস্থাপনা

টাঙ্গাইল শহরের ‘মরণফাঁদ’ যুগনির স্লুইস গেট

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৫:৫৫:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বন্যার পানি নিয়ন্ত্রণে নির্মাণ করা হয়েছিল স্লুইস গেট। লক্ষ্য ছিল নদীর পানি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বাড়ানো এবং টাঙ্গাইল শহরকে বন্যার কবল থেকে রক্ষা করা। কিন্তু ৩৬ বছর পর সেই ব্যবস্থাপনাই যেন উল্টো বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, যুগনির স্লুইস গেটের ভুল ও অপরিকল্পিত পরিচালনায় একদিকে লৌহজং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে বর্ষায় পানি জমে সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।

স্থানীয়দের ভাষায়, টাঙ্গাইল শহর রক্ষা বাঁধের গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামো এখন অনেকটাই ‘মরণফাঁদ’।

১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পর ১৯৮৯ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশে প্রণয়ন করা হয় ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যান—ফ্যাপ-২০। এর অন্যতম উপাদান ছিল কম্পার্টমেন্টালাইজেশন পাইলট প্রজেক্ট (সিপিপি), টাঙ্গাইল। পরিকল্পনাটির উদ্দেশ্য ছিল যমুনার প্লাবনভূমিতে ছোট-বড় কম্পার্টমেন্ট বা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেষ্টনী তৈরি করে পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনের উন্নয়ন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে ওই প্রকল্পের অংশ হিসেবে টাঙ্গাইল শহর রক্ষা বাঁধের সঙ্গে নির্মাণ করা হয় যুগনির স্লুইস গেট।

২১ কিলোমিটার বাঁধ, একটিই প্রবেশপথ

স্থানীয়ভাবে সিলিমপুর-করটিয়া বাঁধ নামে পরিচিত প্রায় ২১ কিলোমিটার দীর্ঘ টাঙ্গাইল শহর রক্ষা বাঁধটি পৌরসভা ও আশপাশের এলাকাকে যমুনা, পুংলী, ধলেশ্বরী ও লৌহজং নদীর ভাঙন এবং বন্যার হাত থেকে রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এই বাঁধের ভেতরে বর্ষা ও বন্যার পানি প্রবেশের জন্য সদর উপজেলার বাঘিল ইউনিয়নের কাঠুয়া যুগনিতে লৌহজং নদীর ওপর নির্মাণ করা হয় স্লুইস গেটটি।

পরিকল্পনা ছিল—বর্ষায় প্রয়োজন অনুযায়ী গেট খুলে পানি প্রবেশ করানো হবে। শুষ্ক মৌসুমে তা বন্ধ রেখে বাঁধের ভেতরের জমি রক্ষা করা হবে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবে সেই পরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনা কার্যকর হয়নি।

দীর্ঘদিন ধরে গেটের সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় লৌহজং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। নদীর উৎস মুখে পলি জমে কমেছে নাব্যতা। একসময়কার প্রবাহমান নদীটি অনেক জায়গায় এখন মরা খালের চেহারা নিয়েছে।

নদীর পথ বন্ধ, কমছে মাছও

গেটের কারণে নদীর সঙ্গে বাঁধের ভেতরের জলাশয়গুলোর স্বাভাবিক যোগাযোগও ব্যাহত হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি। এতে মাছের চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিল-ঝিলে মাছের উৎপাদন কমেছে।

অন্যদিকে নদী ও খালের অববাহিকায় পলি জমে ভরাট হচ্ছে বিভিন্ন জলাশয়। এতে শুধু মৎস্যসম্পদ নয়, পুরো এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাও সংকটে পড়ছে বলে অভিযোগ।

এরই মধ্যে প্রকল্পের আওতায় একসময়ের প্রবাহমান শ্যামা বাবুর খালকে ১৯৯৬ সালে ড্রেনে রূপান্তর করা হয়। কিন্তু পানি নিষ্কাশনের পথ কার্যকর না থাকায় বর্ষা এলেই টাঙ্গাইল শহর ও আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

বৃষ্টির পানি দ্রুত বের হতে না পেরে কোথাও ঘরবাড়ি, কোথাও সড়ক তলিয়ে যায়। অভ্যন্তরীণ এলাকায় দীর্ঘসময় পানি জমে থাকায় ব্যাহত হয় রবি ফসলের আবাদও। স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থির পানি ও জলাবদ্ধতার কারণে ডেঙ্গুসহ পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে।

‘একটি গেট দিয়ে ২১ কিলোমিটার এলাকার পানি ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়’

পানি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদ ড. মোবাশ্বেরার মতে, একটি মাত্র স্লুইস গেট দিয়ে ২১ কিলোমিটার বাঁধের ভেতরের পানি ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ফ্যাপ-২০ প্রণয়নের সময়কার বাস্তবতায় পরিকল্পনাটি কার্যকর হতে পারে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও দ্রুত নগরায়ণের কারণে সেই পুরোনো মডেল এখন আর আগের মতো কার্যকর নয়।

তার প্রস্তাব, যুগনির স্লুইস গেট আধুনিকায়নের পাশাপাশি বড় আকারের স্বয়ংক্রিয় গেট স্থাপন করতে হবে। জোয়ার, বৃষ্টি ও নদীর পানির স্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে গেট পরিচালনার ব্যবস্থা করতে হবে। বাঁধের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আরও দুই থেকে তিনটি স্লুইস বা কালভার্ট নির্মাণের কথাও বলেন তিনি।

একই সঙ্গে লৌহজং নদী ও শ্যামা বাবুর খাল খনন করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং গেট পরিচালনায় স্থানীয় পানি ব্যবহারকারী সমিতিকে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।

‘কখন গেট খোলা-বন্ধ হবে, নীতিমালা নেই’

স্থানীয় কাঠুয়া যুগনির বাসিন্দা রহিম শেখ ও কৃষক রইজ উদ্দিনের অভিযোগ, স্লুইস গেট পরিচালনায় স্বচ্ছতা নেই। কখন গেট খোলা হবে কিংবা কখন বন্ধ থাকবে—এ বিষয়ে স্থানীয়দের কাছে স্পষ্ট কোনো নীতিমালা নেই।

তাদের অভিযোগ, অনেক সময় রাজনৈতিক বিবেচনা বা ব্যক্তিস্বার্থে গেট খোলা-বন্ধ করা হয়। এতে সাধারণ মানুষের উপকারের বদলে ক্ষতি হচ্ছে।

টাঙ্গাইল জেলা সচেতন নাগরিক ফোরামের সভাপতি অকিবুর রহমান ইকবালের দাবি, ৩৬ বছর আগে যে বাস্তবতায় প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল, বর্তমান বাস্তবতায় সেটি আর কার্যকর নয়।

তার মতে, নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন পরিবর্তনের কারণে যুগনি স্লুইস গেটের কার্যকারিতা নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। গেটটি রাখা হলে এর আধুনিকায়ন জরুরি বলেও তিনি মনে করেন।

টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মাহমুদুল হক সানু বলেন, নদী, মানুষ ও শহর—তিনটিকেই রক্ষা করতে হলে যুগনির স্লুইস গেট নিয়ে নতুন করে বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশবান্ধব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি

অভিযোগ ও প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাইন উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

রক্ষাকবচই কি এখন বোঝা?

টাঙ্গাইল শহর রক্ষা বাঁধ নিঃসন্দেহে শহরকে নদীভাঙন ও বন্যার ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু বাঁধের ভেতরের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের সঙ্গে এর সমন্বয় কতটা কার্যকর—সেই প্রশ্ন এখন সামনে।

৩৬ বছর আগে যে স্লুইস গেট নির্মিত হয়েছিল বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি ব্যবস্থাপনার জন্য, সময়ের সঙ্গে তার কার্যকারিতা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। নদীর নাব্যতা কমছে, জলাবদ্ধতা বাড়ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি ও মৎস্যসম্পদ—স্থানীয়দের অভিযোগ এমনই।

ফলে প্রশ্ন একটাই—টাঙ্গাইল শহরকে বাঁচানোর জন্য নির্মিত বাঁধ ও যুগনির স্লুইস গেট কি এখন নতুন করে ভাবার সময় হয়নি?