আয় বাড়ে না, খরচ থামে না—সংসার চালাতে সঞ্চয় ভাঙছেন মানুষ

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০১:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৫ বার পড়া হয়েছে
আয় বাড়ার গতি থমকে আছে, অথচ প্রতিদিনই বাড়ছে সংসারের খরচ। জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ার পর পরিবহন ও নিত্যপণ্যের বাজারে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদ্যুতের বাড়তি বিল, গ্যাস-সংকট, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয়। উৎপাদন খাতেও দেখা দিয়েছে চাপ; বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। ফলে সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জন্য সংসার চালানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
২০ সেপ্টেম্বর রাতে সরকার ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। এরপরই বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল কৃষি, পণ্য পরিবহন ও গণপরিবহনে এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব কেবল পরিবহন ব্যয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। উৎপাদন, সরবরাহ, আমদানি, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে খরচ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয়ের চাপ গিয়ে পড়ে ভোক্তার ওপর।
ভাড়া বাড়ার আগেই বাড়তি আদায়
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর দাবি উঠেছে। সরকারি সিদ্ধান্ত না এলেও কোথাও কোথাও বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
ডেমরার স্টাফ কোয়ার্টার থেকে মিরপুর-১০ রুটে চলাচলকারী আলিফ পরিবহনে সোমবার সন্ধ্যায় যাত্রীদের কাছ থেকে ১০ টাকা বেশি নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। একইভাবে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে উত্তরা (আব্দুল্লাহপুর) রুটে চলাচলকারী ইকবাল এন্টারপ্রাইজের এসি বাসে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।
বাড্ডা লিংক রোড কাউন্টার থেকে উত্তরা পর্যন্ত আগে যেখানে ৯০ টাকা নেওয়া হতো, সেখানে সোমবার থেকে ১১০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এসি বাসের ভাড়া বিআরটিএ নির্ধারণ করে না।
উত্তরা হাউজ বিল্ডিংয়ে ইকবাল পরিবহনের টিকিট বিক্রেতা শাকিব জানান, তাদের কোম্পানি সোমবার থেকে সব গন্তব্যে ২০ টাকা করে ভাড়া বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। তবে নতুন বাজার থেকে উত্তরা বা সাইনবোর্ড পর্যন্ত ১০ টাকা বাড়ানো হয়েছে।
গ্যাস-সংকটে বাড়ছে শিল্পের ব্যয়
পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কম থাকায় শিল্পকারখানাগুলোতেও বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। উৎপাদন সচল রাখতে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, সিরামিকসহ বিভিন্ন খাতের কিছু প্রতিষ্ঠান সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে গ্যাস নিয়ে কারখানায় ব্যবহার করছে।
এভাবে সিলিন্ডারে গ্যাস পরিবহন গ্যাস আইন-২০১০ ও গ্যাস বিতরণ বিধিমালা-২০১৬ অনুযায়ী নিষিদ্ধ। তবে দীর্ঘদিন ধরে এমন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে এবং সাম্প্রতিক গ্যাস-সংকটে তা আরও বেড়েছে।
গ্যাসসহ বিভিন্ন সংকটে ছোট ও উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের একটি অংশ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থান নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। একই সময়ে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহও কমে এসেছে। ফলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতি যেমন কমেছে, তেমনি বিদ্যমান কর্মীদের ধরে রাখাও অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাজারে বাড়ছে পণ্যের দাম
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যে রাজধানীর খুচরা বাজারেও দেখা যাচ্ছে। কয়েক ধরনের সবজির দাম কেজিতে প্রায় সাত টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বেশির ভাগ সবজি এখন ৮০ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে; কিছু পণ্যের দাম ছাড়িয়েছে ১০০ টাকা।
এর পাশাপাশি ভোজ্য তেলের সরবরাহও কমে গেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর কোম্পানিগুলো ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
জ্বালানির বাড়তি খরচ কৃষিতেও প্রভাব ফেলছে। ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের ব্যয় বাড়ায় কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে জেনারেটরনির্ভর বিভিন্ন কার্যক্রমেও বাড়ছে জ্বালানি ব্যয়।
গ্রামমুখী মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে
আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রভাব শুধু শহুরে জীবনেই সীমাবদ্ধ নেই। সরকারি পরিসংখ্যানের বরাতে জানা গেছে, গত পাঁচ বছরে শহর থেকে গ্রামে ফিরে যাওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
অর্থনৈতিক সংকটে একসময় মানুষ কাজের সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে শহরে আসতেন। এখন বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয় এবং আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনতার কারণে সেই প্রবণতায় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
চিকিৎসা-শিক্ষাতেও বাড়তি চাপ
সংসারের বড় ব্যয়ের দুটি খাত চিকিৎসা ও শিক্ষা। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ আর্থিক সংকটে পড়ছেন। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে দরিদ্র হয়ে পড়ছেন। অনেকে ঋণ করে বা সুদের টাকায় চিকিৎসা চালানোর পর তা পরিশোধ করতে সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই ধরনের চাপ রয়েছে। স্কুলের বেতন, কোচিং, প্রাইভেট টিউটর ও বইসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেড়েছে। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষা ব্যয় ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে নিম্নআয়ের অনেক পরিবার সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হিমশিম খাচ্ছে।
ইউনেসকোর তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, শিক্ষার পেছনে গড় ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং কিছু পরিবার সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটাতে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে।
সঞ্চয় ভেঙে চলছে সংসার
বাসাভাড়া, যাতায়াত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি খরচের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ। বিশেষ করে বেসরকারি চাকরিজীবীদের একটি অংশের আয় তুলনামূলকভাবে স্থির থাকলেও মাসিক ব্যয় বেড়েই চলেছে।
ফলে কেউ সঞ্চয় ভাঙছেন, কেউ ধারদেনা করছেন। মাসের আয় থেকে প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর হাতে থাকছে না তেমন কোনো অর্থ।
অন্যদিকে নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনও ধাপে ধাপে বাড়ছে। চলতি ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা নতুন কাঠামোয় নির্ধারিত বাড়তি মূল বেতনের ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ পাওয়ার কথা রয়েছে। এই অতিরিক্ত অর্থের একটি অংশ বাজারে প্রবাহিত হওয়ায় চাহিদার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থনীতিতে বহুমুখী চাপ
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে বাড়বে পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন খরচ। আমদানি ব্যয়ের পাশাপাশি জাহাজ ভাড়াও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি তেলের ব্যবহার বাড়ায় সেখানেও অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হবে।
তাদের মতে, ডিজেলনির্ভর কার্যক্রমে প্রভাব তুলনামূলক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি, গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে বিভিন্ন উৎপাদন কার্যক্রমে ডিজেলের ব্যবহার থাকায় এর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে আয় বাড়ার তুলনায় ব্যয়ের চাপ দ্রুত বাড়ছে। একদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত, অন্যদিকে খাদ্য, যাতায়াত, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মৌলিক খাতে বাড়ছে ব্যয়। ফলে অনেক পরিবারের কাছে এখন মাসের আয় দিয়ে মাস পার করাই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।























