তৃণমূল থেকে বঙ্গভবনের পথে মির্জা ফখরুল, রাষ্ট্রপতি পদে নতুন অধ্যায়

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৩:৩৪:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
তৃণমূলের রাজনীতি দিয়ে শুরু, এরপর সংসদ, মন্ত্রিসভা ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব—দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে এবার দেশের রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়ন পেলেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকের পর তাকে রাষ্ট্রপতি পদে দলের প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। একই দিন তার পক্ষে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্রও জমা দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বর্তমান সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে মির্জা ফখরুলের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হলেও ভোট ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিশ্চিতভাবে অভিহিত করা যাবে না।
ছাত্ররাজনীতি থেকে শিক্ষকতা
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিক। পারিবারিকভাবে রাজনীতির পরিবেশে বেড়ে উঠলেও নিজের রাজনৈতিক সক্রিয়তার শুরু ছাত্রজীবনে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার আগে ঢাকা কলেজে পড়াশোনা করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলন ও ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানেও তার রাজনৈতিক সক্রিয়তা ছিল।
শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৭২ সালে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। একপর্যায়ে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনেও দায়িত্ব পালন করেন।
সরকারি চাকরি ছেড়ে রাজনীতির মাঠে
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে নামেন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি।
এরপর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে দায়িত্ব পান ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতির। স্থানীয় রাজনীতি থেকেই ধীরে ধীরে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন তিনি।
জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের নেতৃত্ব, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির বিভিন্ন দায়িত্ব এবং পরে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব—এভাবে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল।
সংসদ ও মন্ত্রিসভায়
২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। বিএনপি সরকার গঠন করলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
২০১৮ সালের নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকেও নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। তবে দলীয় সিদ্ধান্তে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় পরে আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়।
বিএনপির মহাসচিব
২০০৯ সালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন মির্জা ফখরুল। ২০১১ সালে খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। প্রায় পাঁচ বছর পর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ তিনি বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির সবচেয়ে দৃশ্যমান রাজনৈতিক মুখ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাস ও অসুস্থতা এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশের বাইরে অবস্থানের সময় দলীয় কর্মসূচি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
বিরোধী দলের রাজনীতির সময়ে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণও করতে হয়েছে তাকে। বিএনপির সরকারবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে সংবাদ সম্মেলন, কর্মসূচি ঘোষণা ও রাজনৈতিক আলোচনায় দলের প্রধান মুখ হিসেবে দেখা গেছে তাকে।
এবার রাষ্ট্রপতি ভবনের পথে
২০২৬ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। একই সময়ে তিনি দলের মহাসচিবের দায়িত্বও পালন করে আসছিলেন।
এবার রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর তার রাজনৈতিক জীবনে যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন এক অধ্যায়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র বাছাই, ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় এবং ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে ভোট হওয়ার কথা।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, পৌর রাজনীতি, বিএনপির তৃণমূল নেতৃত্ব, সংসদ ও মন্ত্রিসভা হয়ে দলের মহাসচিব—একাধিক ধাপ পেরিয়েছেন মির্জা ফখরুল।
এবার সেই পথচলা তাকে নিয়ে এসেছে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে। ২০ আগস্টের ভোট ও পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়াই ঠিক করবে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন কি না।






















