তালাকের অজুহাতে সন্তানের ভরণপোষণ বন্ধ করা যাবে না: হাইকোর্ট

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০২:৪৯:৩২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে
আইন অনুযায়ী প্রমাণিত বা কার্যকর নয় এমন তালাকের অজুহাতে স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ কিংবা দেনমোহরের ডিক্রি বাস্তবায়ন বন্ধ করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আদালত বলেছেন, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ মা-বাবার তালাকসংক্রান্ত বিরোধের ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি শিশুর স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আইনগত অধিকার।
সম্প্রতি বিচারপতি আবদুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রায়ের অনুলিপি প্রকাশিত হয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১১ সালে এক দম্পতির বিয়ে হয়। পরে স্ত্রী ও তাদের নাবালক কন্যার পক্ষে দেনমোহর ও ভরণপোষণের দাবিতে পারিবারিক আদালতে মামলা করা হয়। স্বামী দাবি করেন, তিনি আগেই স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন। তবে তিনি আদালতে আইন অনুযায়ী তালাকের বৈধতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন।
ফলে ফ্যামিলি কোর্ট স্ত্রী ও সন্তানের পক্ষে দেনমোহর ও ভরণপোষণের ডিক্রি দেন। এরপর স্বামী নতুন করে ঘোষণামূলক মামলা করে তালাক কার্যকর হয়েছে দাবি জানিয়ে ওই ডিক্রির বাস্তবায়ন স্থগিতের আবেদন করেন। নিম্ন আদালত আবেদন খারিজ করলে বিষয়টি হাইকোর্টে গড়ায়।
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, কেবল নতুন মামলা দায়ের করা হয়েছে—এমন অজুহাতে আগে দেওয়া চূড়ান্ত ডিক্রির বাস্তবায়ন বন্ধ করা যাবে না। কোনো সক্ষম আদালত ডিক্রি স্থগিত না করা পর্যন্ত তা কার্যকর থাকবে এবং এক্সিকিউশন কোর্টের দায়িত্ব সেটি বাস্তবায়ন করা।
আদালত আরও বলেন, যে তালাক আইন অনুযায়ী প্রমাণিত বা কার্যকর নয়, তার কোনো আইনগত মূল্য নেই। এমন তালাক বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটায় না এবং ভরণপোষণ বা দেনমোহরের ডিক্রি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো বাধাও সৃষ্টি করতে পারে না।
রায়ে বলা হয়, বিবাহ, তালাক, দেনমোহর, ভরণপোষণ ও বৈবাহিক অধিকারসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির একমাত্র এখতিয়ার ফ্যামিলি কোর্টের।
নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ প্রসঙ্গে হাইকোর্ট বলেন, এটি শিশুর স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আইনগত অধিকার। মা-বাবার মধ্যে তালাক নিয়ে বিরোধ থাকলেও সন্তানের ভরণপোষণ বন্ধ করা যাবে না। কোনো পিতা তালাকের অজুহাতে সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না।
আদালত আরও বলেন, এক্সিকিউশন কোর্টের দায়িত্ব শুধু বিদ্যমান ডিক্রি বাস্তবায়ন করা। তালাক বৈধ কি না বা বৈবাহিক সম্পর্ক বিদ্যমান কি না—এসব নতুন প্রশ্ন বিচার করার এখতিয়ার তাদের নেই।
রায়ে আদালত পর্যবেক্ষণ দেন, যদি পূর্বে দাবি করা তালাক আইনগতভাবে অকার্যকর প্রমাণিত হয় এবং স্বামী সত্যিই বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটাতে চান, তবে তিনি আইন অনুযায়ী নতুন করে তালাক দিতে পারেন। তবে এতে আগের ডিক্রির অধীনে সৃষ্ট দেনমোহর ও ভরণপোষণের দায় থেকে তিনি মুক্ত হবেন না।
হাইকোর্ট রুল খারিজ করে নিম্ন আদালতের আদেশ বহাল রাখেন। একই সঙ্গে স্বামীকে বকেয়া দেনমোহর এবং স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের সব বকেয়া ভরণপোষণ পরিশোধের নির্দেশ দেন।
আইনজীবীদের মতে, এ রায় পারিবারিক আইনে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এতে তিনটি নীতি আরও সুস্পষ্ট হয়েছে—আইনসম্মতভাবে প্রমাণিত না হলে তালাক কার্যকর নয়, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ একটি স্বতন্ত্র আইনগত অধিকার এবং নতুন মামলা করে চূড়ান্ত ডিক্রির বাস্তবায়ন বিলম্বিত করা যাবে না।
মামলায় স্বামীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. শহিদুল ইসলাম। স্ত্রীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ইশরাত হাসান। তাঁকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী তানজিলা রহমান ও ইফাত হাসান শাম্মি।
আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, এই রায় নারী ও শিশুর অধিকার সুরক্ষা এবং আদালতের চূড়ান্ত রায়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।




















