ঢাকা ০১:০৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
স্ত্রীর মান ভাঙাতে শাহজালালের দানবাক্সে চিঠি, মিলল চাকরির আবেদনও ঝুঁকির পাহাড়ে অনিশ্চিত জীবন, তবু ছাড়তে পারছেন না বসতি বিশ্বকাপ ফাইনালের মাঠের ঘাস বিক্রি! এক টুকরোর দাম ৪৩ হাজার টাকা ভাঙ্গায় বাসচাপায় নিহত ৫, বিক্ষুব্ধ জনতার আগুনে পুড়ল ৪ বাস বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনই বড় চ্যালেঞ্জ: অনিন্দ্য ইসলাম অমিত টাঙ্গাইলে জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অভিযান, সাত দালালের কারাদণ্ড বন্যা মোকাবিলায় সমন্বিত পরিকল্পনা, উদ্ধারকাজে সেনাবাহিনী-বিজিবি মোতায়েন ৫ জেলার এইচএসসি পরীক্ষা ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত সীমান্তে ফের পুশইনের চেষ্টা, গ্রামবাসী-বিজিবির বাধায় শূন্যরেখায় ৩ জন

ঝুঁকির পাহাড়ে অনিশ্চিত জীবন, তবু ছাড়তে পারছেন না বসতি

চট্টগ্রাম ব্যুরো
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৫৬:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

প্রতি বর্ষায় একই দৃশ্য—পাহাড়ধস, মৃত্যু, উচ্ছেদ আর নতুন করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। প্রশাসনের সতর্কতা, আশ্রয়কেন্দ্র খোলা ও উদ্ধার তৎপরতা সত্ত্বেও কেন মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ছাড়তে চায় না? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর উত্তর শুধু প্রকৃতির মধ্যে নয়; দারিদ্র্য, ভূমিহীনতা, মানুষের আচরণ, আশ্রয়কেন্দ্রের সীমাবদ্ধতা এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সংকটও সমানভাবে দায়ী।

ফায়ার সার্ভিস জনসচেতনতা বাড়াতে নতুন প্রচারণা শুরু করতে যাচ্ছে। অন্যদিকে প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে মাঠপর্যায়ে সমন্বিত কার্যক্রম চালাচ্ছে।

মৃত্যুঝুঁকিই যখন একমাত্র ঠিকানা

কক্সবাজার শহরের বাঘঘোনা এলাকার পাহাড়চূড়ায় প্রায় ২০ বছর ধরে বসবাস করছেন ৫০ বছর বয়সী ছৈয়দা খাতুন। অসুস্থ স্বামীসহ ১৬ সদস্যের পরিবার নিয়ে পাহাড়ের চূড়ার ছোট্ট ঘরটিই তাদের একমাত্র আশ্রয়।

তিনি বলেন, প্রতি বর্ষায় কয়েকবার করে ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয়। অতীতে পাহাড়ধসে ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে, আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার সময় ফিরে এসে ঘরের সবকিছু চুরি যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। একবার পাহাড়ধসে আহতও হয়েছেন তিনি।

ছৈয়দা খাতুনের ভাষায়, “মৃত্যুর ঝুঁকি জেনেও পাহাড় ছাড়তে পারছি না। যাওয়ার মতো আমাদের আর কোনো জায়গা নেই।”

তার অভিযোগ, এত বছরেও সরকারি কোনো স্থায়ী সহায়তা পাননি। দিনমজুরির আয়ে কোনোমতে সংসার চলে। অসুস্থ স্বামী এখন আর কাজও করতে পারেন না।

হাজারো মানুষের একই বাস্তবতা

শুধু বাঘঘোনা নয়, কক্সবাজার শহরের লাইট হাউজ, পূর্ব ও পশ্চিম লারপাড়া, ডিককুল, গুচ্ছগ্রাম, শুকনো ছড়ি, দরিয়ানগরসহ ২০টির বেশি পাহাড়ে হাজারো মানুষ প্রতিদিন পাহাড়ধসের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন।

অনেক এলাকায় এখনো পাহাড় কেটে নতুন বসতি নির্মাণ হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, ভূমিহীনতা, দারিদ্র্য এবং বিকল্প বাসস্থানের অভাবই মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকতে বাধ্য করছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মাহিয়া আক্তার বলেন, নিজেদের জমি নেই, সামর্থ্যও নেই। তাই বাধ্য হয়েই পাহাড় কিনে সেখানে ঘর তুলেছেন। এখন ঝুঁকি থাকলেও অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই।

পশ্চিম লারপাড়ার বাসিন্দা সাবেকুন্নাহার বলেন, প্রশাসন পাহাড় ছাড়তে বললেও পরিবার নিয়ে কোথায় যাবেন, সেই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না।

শুধু প্রকৃতি নয়, দায় আছে ব্যবস্থাপনাতেও

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. নিগার সুলতানার মতে, পাহাড়ধসের প্রাণহানিকে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখলে সমস্যার পুরো চিত্র ধরা পড়ে না।

তিনি বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনাগ্রহী হন। কারণ সেখানে গোপনীয়তা, নারী-পুরুষের আলাদা ব্যবস্থা, শিশুদের প্রয়োজন, নিরাপত্তা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয় না।

তার মতে, আশ্রয়কেন্দ্রকে মানুষের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, মানবিক ও সংস্কৃতিসংবেদনশীল করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্যোগের আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসের ক্ষতি এবং পাহাড় কাটার ভয়াবহতা সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

সচেতনতায় নতুন উদ্যোগ

ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, এবার পাহাড়ধসের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রচারণা আরও জোরদার করা হচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স কক্সবাজারের উপপরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসাইন বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ব্যানার, হ্যান্ডবিল ও বিভিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে মানুষকে আগেভাগেই সতর্ক করা হবে, যাতে তারা সময়মতো নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে উৎসাহিত হন।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।

বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় দিনের ভারী বর্ষণে কক্সবাজারে পাহাড়ধসে অন্তত ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ১৬ জন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, নিরাপদ আবাসন এ

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

ঝুঁকির পাহাড়ে অনিশ্চিত জীবন, তবু ছাড়তে পারছেন না বসতি

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৫৬:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬

প্রতি বর্ষায় একই দৃশ্য—পাহাড়ধস, মৃত্যু, উচ্ছেদ আর নতুন করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। প্রশাসনের সতর্কতা, আশ্রয়কেন্দ্র খোলা ও উদ্ধার তৎপরতা সত্ত্বেও কেন মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ছাড়তে চায় না? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর উত্তর শুধু প্রকৃতির মধ্যে নয়; দারিদ্র্য, ভূমিহীনতা, মানুষের আচরণ, আশ্রয়কেন্দ্রের সীমাবদ্ধতা এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সংকটও সমানভাবে দায়ী।

ফায়ার সার্ভিস জনসচেতনতা বাড়াতে নতুন প্রচারণা শুরু করতে যাচ্ছে। অন্যদিকে প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে মাঠপর্যায়ে সমন্বিত কার্যক্রম চালাচ্ছে।

মৃত্যুঝুঁকিই যখন একমাত্র ঠিকানা

কক্সবাজার শহরের বাঘঘোনা এলাকার পাহাড়চূড়ায় প্রায় ২০ বছর ধরে বসবাস করছেন ৫০ বছর বয়সী ছৈয়দা খাতুন। অসুস্থ স্বামীসহ ১৬ সদস্যের পরিবার নিয়ে পাহাড়ের চূড়ার ছোট্ট ঘরটিই তাদের একমাত্র আশ্রয়।

তিনি বলেন, প্রতি বর্ষায় কয়েকবার করে ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয়। অতীতে পাহাড়ধসে ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে, আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার সময় ফিরে এসে ঘরের সবকিছু চুরি যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। একবার পাহাড়ধসে আহতও হয়েছেন তিনি।

ছৈয়দা খাতুনের ভাষায়, “মৃত্যুর ঝুঁকি জেনেও পাহাড় ছাড়তে পারছি না। যাওয়ার মতো আমাদের আর কোনো জায়গা নেই।”

তার অভিযোগ, এত বছরেও সরকারি কোনো স্থায়ী সহায়তা পাননি। দিনমজুরির আয়ে কোনোমতে সংসার চলে। অসুস্থ স্বামী এখন আর কাজও করতে পারেন না।

হাজারো মানুষের একই বাস্তবতা

শুধু বাঘঘোনা নয়, কক্সবাজার শহরের লাইট হাউজ, পূর্ব ও পশ্চিম লারপাড়া, ডিককুল, গুচ্ছগ্রাম, শুকনো ছড়ি, দরিয়ানগরসহ ২০টির বেশি পাহাড়ে হাজারো মানুষ প্রতিদিন পাহাড়ধসের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন।

অনেক এলাকায় এখনো পাহাড় কেটে নতুন বসতি নির্মাণ হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, ভূমিহীনতা, দারিদ্র্য এবং বিকল্প বাসস্থানের অভাবই মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকতে বাধ্য করছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মাহিয়া আক্তার বলেন, নিজেদের জমি নেই, সামর্থ্যও নেই। তাই বাধ্য হয়েই পাহাড় কিনে সেখানে ঘর তুলেছেন। এখন ঝুঁকি থাকলেও অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই।

পশ্চিম লারপাড়ার বাসিন্দা সাবেকুন্নাহার বলেন, প্রশাসন পাহাড় ছাড়তে বললেও পরিবার নিয়ে কোথায় যাবেন, সেই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না।

শুধু প্রকৃতি নয়, দায় আছে ব্যবস্থাপনাতেও

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. নিগার সুলতানার মতে, পাহাড়ধসের প্রাণহানিকে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখলে সমস্যার পুরো চিত্র ধরা পড়ে না।

তিনি বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনাগ্রহী হন। কারণ সেখানে গোপনীয়তা, নারী-পুরুষের আলাদা ব্যবস্থা, শিশুদের প্রয়োজন, নিরাপত্তা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয় না।

তার মতে, আশ্রয়কেন্দ্রকে মানুষের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, মানবিক ও সংস্কৃতিসংবেদনশীল করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্যোগের আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসের ক্ষতি এবং পাহাড় কাটার ভয়াবহতা সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

সচেতনতায় নতুন উদ্যোগ

ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, এবার পাহাড়ধসের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রচারণা আরও জোরদার করা হচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স কক্সবাজারের উপপরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসাইন বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ব্যানার, হ্যান্ডবিল ও বিভিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে মানুষকে আগেভাগেই সতর্ক করা হবে, যাতে তারা সময়মতো নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে উৎসাহিত হন।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।

বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় দিনের ভারী বর্ষণে কক্সবাজারে পাহাড়ধসে অন্তত ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ১৬ জন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, নিরাপদ আবাসন এ