ঢাকা ০৩:৩০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

মে দিবস: ইতিহাস ও প্রাসঙ্গিকতা

সুপন রায়
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১৬:২৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১ মে ২০২৬ ৭৯ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মানবসমাজে শ্রম বিভাজনের ধারণা গড়ে ওঠে। একদিকে কৃষিকাজ ও কায়িক শ্রমে নিয়োজিত শ্রমজীবী শ্রেণি, অন্যদিকে জমির মালিক ও সুবিধাভোগী শ্রেণি—এই বিভাজন থেকেই ধীরে ধীরে সমাজে শ্রেণি বৈষম্যের ভিত্তি তৈরি হয়। প্রাচীন মিশরসহ বিভিন্ন সভ্যতায় শ্রমকে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার দৃষ্টান্তও পাওয়া যায়।

শিল্পবিপ্লবের পর কলকারখানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। কিন্তু তাদের কাজের সময় নির্দিষ্ট ছিল না, শ্রমের মূল্যও ছিল অত্যন্ত কম। মালিকের ইচ্ছা অনুযায়ী দীর্ঘ সময় কাজ করতে হতো শ্রমিকদের। ফলে উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে সংগঠিত প্রতিবাদের সূচনা ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে গড়ে ওঠে ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রমিক সংগঠন।

১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেট স্কোয়ারে শ্রমিকরা আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে আন্দোলনে নামেন—“৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম, ৮ ঘণ্টা বিনোদন” এই দাবি তখন শ্রমিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের গুলিতে শ্রমিক হতাহতের ঘটনা ঘটে এবং পরবর্তীতে বহু নেতার শাস্তি হয়। এই ঘটনাই পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক শ্রম আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়।

এর ধারাবাহিকতায় ১৮৯০ সাল থেকে ১ মে বিশ্বজুড়ে শ্রমিক দিবস হিসেবে পালিত হতে শুরু করে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৮০টিরও বেশি দেশে মে দিবস শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দিন হিসেবে স্বীকৃত।

ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম মে দিবস পালিত হয় ১৯২৩ সালে চেন্নাইয়ের মেরিনা বিচে। এরপর ধীরে ধীরে এটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্য মজুরির দাবির প্রতীক হয়ে ওঠে।

তবে মে দিবস কেবল ইতিহাস নয়, বরং বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। আজও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশু শ্রম, নারী শ্রমিকের বৈষম্য, কম মজুরি ও অনিরাপদ কর্মপরিবেশ বিদ্যমান। বাংলাদেশেও বহু শ্রমজীবী মানুষ ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে ইতিহাসে দেখা যায়, শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন সময়ে নানা চিন্তাধারা ও আন্দোলন কাজ করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণে সমবায় ও আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে মহম্মদ ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ ধারণা দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে, যা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পায়।

শ্রেণিহীন ও সমতাভিত্তিক সমাজের ধারণা বিভিন্ন দার্শনিক ও ধর্মীয় চিন্তায়ও প্রতিফলিত হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, আজও পৃথিবীর বহু প্রান্তে শ্রমজীবী মানুষ বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার।

তাই মে দিবস শুধু একটি ঐতিহাসিক স্মরণ নয়, বরং শ্রমের মর্যাদা, ন্যায্য অধিকার এবং মানবিক সমাজ গঠনের এক চলমান সংগ্রামের প্রতীক।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

মে দিবস: ইতিহাস ও প্রাসঙ্গিকতা

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১৬:২৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১ মে ২০২৬

সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মানবসমাজে শ্রম বিভাজনের ধারণা গড়ে ওঠে। একদিকে কৃষিকাজ ও কায়িক শ্রমে নিয়োজিত শ্রমজীবী শ্রেণি, অন্যদিকে জমির মালিক ও সুবিধাভোগী শ্রেণি—এই বিভাজন থেকেই ধীরে ধীরে সমাজে শ্রেণি বৈষম্যের ভিত্তি তৈরি হয়। প্রাচীন মিশরসহ বিভিন্ন সভ্যতায় শ্রমকে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার দৃষ্টান্তও পাওয়া যায়।

শিল্পবিপ্লবের পর কলকারখানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। কিন্তু তাদের কাজের সময় নির্দিষ্ট ছিল না, শ্রমের মূল্যও ছিল অত্যন্ত কম। মালিকের ইচ্ছা অনুযায়ী দীর্ঘ সময় কাজ করতে হতো শ্রমিকদের। ফলে উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে সংগঠিত প্রতিবাদের সূচনা ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে গড়ে ওঠে ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রমিক সংগঠন।

১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেট স্কোয়ারে শ্রমিকরা আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে আন্দোলনে নামেন—“৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম, ৮ ঘণ্টা বিনোদন” এই দাবি তখন শ্রমিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের গুলিতে শ্রমিক হতাহতের ঘটনা ঘটে এবং পরবর্তীতে বহু নেতার শাস্তি হয়। এই ঘটনাই পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক শ্রম আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়।

এর ধারাবাহিকতায় ১৮৯০ সাল থেকে ১ মে বিশ্বজুড়ে শ্রমিক দিবস হিসেবে পালিত হতে শুরু করে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৮০টিরও বেশি দেশে মে দিবস শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দিন হিসেবে স্বীকৃত।

ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম মে দিবস পালিত হয় ১৯২৩ সালে চেন্নাইয়ের মেরিনা বিচে। এরপর ধীরে ধীরে এটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্য মজুরির দাবির প্রতীক হয়ে ওঠে।

তবে মে দিবস কেবল ইতিহাস নয়, বরং বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। আজও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশু শ্রম, নারী শ্রমিকের বৈষম্য, কম মজুরি ও অনিরাপদ কর্মপরিবেশ বিদ্যমান। বাংলাদেশেও বহু শ্রমজীবী মানুষ ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে ইতিহাসে দেখা যায়, শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন সময়ে নানা চিন্তাধারা ও আন্দোলন কাজ করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণে সমবায় ও আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে মহম্মদ ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ ধারণা দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে, যা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পায়।

শ্রেণিহীন ও সমতাভিত্তিক সমাজের ধারণা বিভিন্ন দার্শনিক ও ধর্মীয় চিন্তায়ও প্রতিফলিত হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, আজও পৃথিবীর বহু প্রান্তে শ্রমজীবী মানুষ বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার।

তাই মে দিবস শুধু একটি ঐতিহাসিক স্মরণ নয়, বরং শ্রমের মর্যাদা, ন্যায্য অধিকার এবং মানবিক সমাজ গঠনের এক চলমান সংগ্রামের প্রতীক।