ঢাকা ০৩:১৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকার বিদ্যুৎ যাবে গ্রামে

জয়নাল আবেদিন
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:১৬:৫৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

শহর-গ্রামের বৈষম্য কমাতে রাজধানী ঢাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ আংশিক কমিয়ে তা গ্রামাঞ্চলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার বলছে, বিদ্যুৎ বণ্টনে সমতা আনতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের ঘাটতি মেটাতে রাজধানীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ লোডশেডিং করে সেই বিদ্যুৎ গ্রামে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ঢাকার কিছু এলাকায় সাময়িক বিদ্যুৎ বিভ্রাট বাড়তে পারে, তবে গ্রামে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে জাতীয় ঐক্যের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে জাতীয় সংসদে। একই সঙ্গে রাজধানী ঢাকায় পরীক্ষামূলক লোডশেডিং করে সেই বিদ্যুৎ গ্রামীণ কৃষি খাতে সরবরাহ এবং শিক্ষা খাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শ্বেতপত্র প্রকাশের ঘোষণা অধিবেশনটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২০তম দিনের বৈঠকে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। স্পিকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে সরকার ও বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ সংসদীয় কার্যক্রমে নতুন মাত্রা যোগ করে।

জ্বালানি সংকটে যৌথ কমিটি

অধিবেশনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বিদ্যমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতিকে “জাতীয় সংকট” হিসেবে উল্লেখ করেন। এ সংকট মোকাবিলায় সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। বিরোধী দলও এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। কমিটি দ্রুত সুপারিশ দেবে এবং তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের কথা জানানো হয়।

ঢাকায় লোডশেডিং, গ্রামে সেচে বিদ্যুৎ

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বৈষম্য কমাতে রাজধানী ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হবে। এ বিদ্যুৎ বোরো মৌসুমে কৃষকদের সেচ কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের মতে, উৎপাদনশীল খাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে এটি একটি বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ।

গ্যাস সংকটের চিত্র

প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট, বিপরীতে সরবরাহ রয়েছে প্রায় ২৬৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে দ্রুত আমদানি বাড়ানো সম্ভব না হলেও আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে দৃশ্যমান উন্নয়ন হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।

শিক্ষা খাতে শুদ্ধি অভিযান

শিক্ষামন্ত্রী জানান, গত ১৬ বছরের শিক্ষা খাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম তদন্তে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে। ইতোমধ্যে জাল সনদের অভিযোগে ২০২ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শূন্য পদ পূরণে দ্রুত নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করার কথাও জানান তিনি। পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষায় কারিগরি কোর্স চালুর মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়।

আঞ্চলিক দাবি ও উন্নয়ন

সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকার বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন। এর মধ্যে স্থানীয় গ্যাস সরবরাহে অগ্রাধিকার, উত্তরবঙ্গে সরাসরি রেল সংযোগ, শিল্প প্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়ন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের দাবি উঠে আসে। এসব বিষয়ে সরকার ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে।

সংসদীয় শৃঙ্খলায় কড়াকড়ি

অধিবেশনের শেষ দিকে স্পিকার সংসদ সদস্যদের আচরণ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সংসদের শৃঙ্খলা বজায় রাখা, মোবাইল ফোন ব্যবহার সীমিত করা এবং কার্যপ্রণালী বিধি মেনে চলার নির্দেশনা দেন তিনি।

সার্বিক চিত্র

দিনভর আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে, বড় জাতীয় সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে গিয়ে সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা সংস্কার এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন কৌশলের ইঙ্গিত মিলেছে। অনেকের মতে, এই অধিবেশন রাজনৈতিক সহাবস্থান ও বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণের নতুন সূচনা।

নীতিনির্ধারকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে শহরভিত্তিক সুবিধা বেশি পাওয়ায় গ্রামাঞ্চল তুলনামূলকভাবে বঞ্চিত ছিল। এই বৈষম্য দূর করতে বিদ্যুৎ বণ্টনে নতুন করে ভারসাম্য আনার চেষ্টা চলছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের সময় শিল্প, বাণিজ্য ও নগরজীবনের ওপর প্রভাব বিবেচনায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এ ধরনের লোড ম্যানেজমেন্ট কমিয়ে আনা হবে। আপাতত সংকট মোকাবিলায় এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

ঢাকার বিদ্যুৎ যাবে গ্রামে

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:১৬:৫৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

শহর-গ্রামের বৈষম্য কমাতে রাজধানী ঢাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ আংশিক কমিয়ে তা গ্রামাঞ্চলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার বলছে, বিদ্যুৎ বণ্টনে সমতা আনতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের ঘাটতি মেটাতে রাজধানীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ লোডশেডিং করে সেই বিদ্যুৎ গ্রামে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ঢাকার কিছু এলাকায় সাময়িক বিদ্যুৎ বিভ্রাট বাড়তে পারে, তবে গ্রামে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে জাতীয় ঐক্যের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে জাতীয় সংসদে। একই সঙ্গে রাজধানী ঢাকায় পরীক্ষামূলক লোডশেডিং করে সেই বিদ্যুৎ গ্রামীণ কৃষি খাতে সরবরাহ এবং শিক্ষা খাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শ্বেতপত্র প্রকাশের ঘোষণা অধিবেশনটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২০তম দিনের বৈঠকে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। স্পিকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে সরকার ও বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ সংসদীয় কার্যক্রমে নতুন মাত্রা যোগ করে।

জ্বালানি সংকটে যৌথ কমিটি

অধিবেশনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বিদ্যমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতিকে “জাতীয় সংকট” হিসেবে উল্লেখ করেন। এ সংকট মোকাবিলায় সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। বিরোধী দলও এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। কমিটি দ্রুত সুপারিশ দেবে এবং তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের কথা জানানো হয়।

ঢাকায় লোডশেডিং, গ্রামে সেচে বিদ্যুৎ

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বৈষম্য কমাতে রাজধানী ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হবে। এ বিদ্যুৎ বোরো মৌসুমে কৃষকদের সেচ কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের মতে, উৎপাদনশীল খাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে এটি একটি বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ।

গ্যাস সংকটের চিত্র

প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট, বিপরীতে সরবরাহ রয়েছে প্রায় ২৬৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে দ্রুত আমদানি বাড়ানো সম্ভব না হলেও আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে দৃশ্যমান উন্নয়ন হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।

শিক্ষা খাতে শুদ্ধি অভিযান

শিক্ষামন্ত্রী জানান, গত ১৬ বছরের শিক্ষা খাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম তদন্তে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে। ইতোমধ্যে জাল সনদের অভিযোগে ২০২ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শূন্য পদ পূরণে দ্রুত নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করার কথাও জানান তিনি। পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষায় কারিগরি কোর্স চালুর মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়।

আঞ্চলিক দাবি ও উন্নয়ন

সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকার বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন। এর মধ্যে স্থানীয় গ্যাস সরবরাহে অগ্রাধিকার, উত্তরবঙ্গে সরাসরি রেল সংযোগ, শিল্প প্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়ন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের দাবি উঠে আসে। এসব বিষয়ে সরকার ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে।

সংসদীয় শৃঙ্খলায় কড়াকড়ি

অধিবেশনের শেষ দিকে স্পিকার সংসদ সদস্যদের আচরণ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সংসদের শৃঙ্খলা বজায় রাখা, মোবাইল ফোন ব্যবহার সীমিত করা এবং কার্যপ্রণালী বিধি মেনে চলার নির্দেশনা দেন তিনি।

সার্বিক চিত্র

দিনভর আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে, বড় জাতীয় সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে গিয়ে সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা সংস্কার এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন কৌশলের ইঙ্গিত মিলেছে। অনেকের মতে, এই অধিবেশন রাজনৈতিক সহাবস্থান ও বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণের নতুন সূচনা।

নীতিনির্ধারকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে শহরভিত্তিক সুবিধা বেশি পাওয়ায় গ্রামাঞ্চল তুলনামূলকভাবে বঞ্চিত ছিল। এই বৈষম্য দূর করতে বিদ্যুৎ বণ্টনে নতুন করে ভারসাম্য আনার চেষ্টা চলছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের সময় শিল্প, বাণিজ্য ও নগরজীবনের ওপর প্রভাব বিবেচনায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এ ধরনের লোড ম্যানেজমেন্ট কমিয়ে আনা হবে। আপাতত সংকট মোকাবিলায় এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে।