ইউএনওর কাছে বৃদ্ধা মায়ের আকুতি
‘নুন-পান্তা খেয়েও ছেলের সঙ্গে থাকতে চাই’
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৩৬:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে
ছেলের কাছে টাকা নয়, চেয়েছিলেন একটু আশ্রয় ও দেখাশোনা; মাকে সঙ্গে রাখলে আত্মহত্যার কথা জানালেন ছেলে
‘আমি ছেলের কাছে টাকা-পয়সা চাই না। নুন-পান্তা খেয়ে হলেও ছেলের সঙ্গে থাকতে পারলে বাকি জীবনটা পার করে দিতে পারব।’
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া, হৃদ্রোগে আক্রান্ত পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার মুন্নি খাতুনের কণ্ঠে ছিল শুধু একটু আশ্রয়ের আকুতি। স্বামী মারা গেছেন অনেক আগেই, মেয়েরও বিয়ে হয়েছে। শেষ বয়সে নিজের ছেলের কাছেই একটু ঠাঁই চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই চাওয়াতেও সাড়া দিতে রাজি নন ছেলে সাগর হোসেন।
বিষয়টি গড়ায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় পর্যন্ত। সেখানে শুনানির সময় মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে অস্বীকৃতি জানিয়ে সাগর বলেন, ‘মাকে আমার সঙ্গে দিলে আমি সুইসাইড করব। আমি মাকে সঙ্গে রাখতে পারব না। স্যার, আপনি বলে দেন, আমি মাকে মাসে কত টাকা দেব।’
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে মুন্নি খাতুনের লিখিত অভিযোগের শুনানিতে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় সালিসে সমাধান হয়নি, শেষ ভরসা ইউএনও
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাঁথিয়া উপজেলার সোনাতলা গ্রামের মৃত সিরাজুল ইসলাম ও মুন্নি খাতুন দম্পতির দুই সন্তান। মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় অসুস্থ মুন্নি খাতুনের একমাত্র ভরসা ছেলে সাগর।
তবে ছেলের বিয়ের পর থেকেই মা-ছেলের মধ্যে পারিবারিক বিরোধ শুরু হয় বলে জানা গেছে। একপর্যায়ে মাকে ভরণপোষণ দেওয়া বন্ধ করে দেন সাগর। মাকে নিজের সঙ্গে রাখতেও অনীহা প্রকাশ করেন তিনি।
মুন্নি খাতুন জানান, ছেলের কাছ থেকে আশ্রয় ও দেখাশোনা পাওয়ার আশায় একাধিকবার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে গেছেন তিনি। স্থানীয়ভাবে সালিস-বৈঠকের মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর চেষ্টা হলেও ছেলের অনাগ্রহে তা সফল হয়নি। পরে বাধ্য হয়ে ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ করেন তিনি।
মাকে রাখতে নারাজ ছেলে, চাইলেন মাসিক খরচ নির্ধারণ
বৃহস্পতিবার বিকেলে অভিযোগের শুনানিতে ইউএনও সেলিম আহমেদ মা-ছেলে দুজনের বক্তব্য শোনেন। এ সময় তিনি সাগরকে তাঁর বৃদ্ধ ও অসুস্থ মাকে সঙ্গে রেখে দেখাশোনা করার অনুরোধ জানান। মায়ের শেষ বয়সের নিরাপত্তা ও মানবিক দিক বিবেচনায় নিয়ে বিরোধের সম্মানজনক সমাধানের পরামর্শ দেন।
তবে মাকে নিজের কাছে রাখার বিষয়ে অনড় থাকেন সাগর। একপর্যায়ে তিনি মাকে সঙ্গে রাখলে আত্মহত্যা করবেন বলে জানান। একই সঙ্গে মাকে মাসে কত টাকা দিতে হবে, তা নির্ধারণ করে দেওয়ার অনুরোধ করেন ইউএনওকে।
উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর সাগরকে চিন্তা-ভাবনার জন্য কয়েক দিন সময় দেন ইউএনও। এ সময়ের মধ্যে মায়ের আশ্রয় ও ভরণপোষণের বিষয়ে সম্মানজনক সমাধানে আসতে তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
‘ছেলেকে ছাড়া আমার আর কে আছে?’
নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে মুন্নি খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী অনেক আগেই মারা গেছেন, মেয়েরও বিয়ে হয়ে গেছে। আমি একজন হার্টের রোগী। এই অবস্থায় ছেলেকে ছাড়া আমার আর কে আছে? আমি তো টাকা-পয়সা চাই না। নুন-পান্তা খেয়ে হলেও ছেলের সঙ্গে বাকি জীবনটা পার করে দিতে চাই।’
তিনি আরও বলেন, মায়ের অধিকার নিয়ে ছেলের ঘরে একটু আশ্রয় চেয়েছেন তিনি। এর বেশি কিছু তাঁর চাওয়ার নেই।
সমাধানের আশ্বাস প্রশাসনের
নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান বলেন, মা-ছেলের বিরোধ মেটাতে শুরু থেকেই চেষ্টা করেছেন তিনি। কিন্তু ছেলে রাজি না হওয়ায় স্থানীয়ভাবে বিষয়টির সমাধান করা সম্ভব হয়নি। এরপরই মুন্নি খাতুন ইউএনওর কাছে অভিযোগ করেন।
সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর উভয় পক্ষকে ডেকে শুনানি করা হয়েছে। একজন বৃদ্ধ ও অসুস্থ মা ছেলের কাছে আশ্রয় ও ভরণপোষণ প্রত্যাশা করছেন। বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতে ছেলেকে বোঝানো হয়েছে এবং কয়েক দিনের সময় দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিষয়টি কীভাবে সমাধান করা যায়, তা বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পারিবারিক বিরোধ যেন আরও জটিল না হয় এবং বৃদ্ধা মাকে যেন কষ্টের মধ্যে থাকতে না হয়, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।





















