বিধি বদলালেই বাজেয়াপ্ত হবে শেখ হাসিনাদের সম্পদ, নজর জুলাই শহীদ পরিবারে

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৯:১৭:১৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৭ বার পড়া হয়েছে
মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিতদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ রয়েছে, কিন্তু সেই আদেশ কার্যকর করার পথই স্পষ্ট নয়। এবার সেই আইনি জট খুলতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিসি) আইনের কার্যপ্রণালি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিধি সংশোধন হলেই পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ দণ্ডিত আসামিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তা বিক্রি করার প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে। বিক্রিলব্ধ অর্থ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবারের মধ্যে বণ্টনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ লক্ষ্যে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনও কাজ শুরু করেছে।
আদেশ আছে, বাস্তবায়নের নিয়ম নেই
দণ্ডিত আসামির সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ দিতে পারলেও সেটি বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, কোন সংস্থা সম্পদ জব্দ বা বিক্রি করবে এবং পরে অর্থ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পৌঁছাবে—এসব বিষয়ে বর্তমান কার্যপ্রণালিতে স্পষ্ট কোনো বিধান নেই।
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, দণ্ডিত ব্যক্তিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের কার্যপ্রণালি সংশোধন করতে হবে। কোন প্রক্রিয়ায় সম্পদ আদায় করা হবে, সে বিষয়ে সংশোধনী প্রয়োজন।
এ বিষয়ে সেমিনার আয়োজন করে ট্রাইব্যুনালকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার কথাও জানান তিনি। তার ভাষ্য, কার্যপ্রণালি সংশোধন করবে ট্রাইব্যুনাল। এর আগে কোনো দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়নি।
১২ আগস্ট সামনে আসে আইনি জট
সম্পদ বাজেয়াপ্তের পর তা কীভাবে ভুক্তভোগীদের মধ্যে বণ্টন করা হবে—এ বিষয়ে গত ১২ আগস্ট ট্রাইব্যুনাল-২-এর কাছে নির্দেশনা চান চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
শুনানিতে তিনি জানান, ট্রাইব্যুনালের কার্যপ্রণালিতেও এ বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই। ফলে আদালত সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ দিলেও তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।
জবাবে ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এ বিষয়ে প্রসিকিউশন কাজ করতে পারে। ট্রাইব্যুনাল-১, ট্রাইব্যুনাল-২ এবং চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় একসঙ্গে বসে সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও বণ্টনের বিষয়ে কার্যপ্রণালি নির্ধারণ করতে পারে।
এরপর চিফ প্রসিকিউটর জানান, ট্রাইব্যুনাল-১-এর সঙ্গে এ বিষয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে।
ছয় মামলায় বাজেয়াপ্তের আদেশ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয়টি মামলার রায়ে শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খানসহ একাধিক দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যতে মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্য মামলাগুলোর রায়েও সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ আসতে পারে। ফলে বিধি সংশোধনের বিষয়টি শুধু বর্তমান মামলাগুলোর জন্য নয়, পরবর্তী রায়গুলোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিক্রি করে অর্থ যাবে শহীদ পরিবারের কাছে
গত ৪ আগস্ট চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছিলেন, ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত পলাতক আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের পর তা বিক্রি করে পাওয়া অর্থ শহীদদের পরিবারের মধ্যে বিতরণের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।
তবে এ ধরনের কোনো নজির ট্রাইব্যুনালে নেই। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এবারই প্রথমবারের মতো এমন প্রক্রিয়ায় যাচ্ছে প্রসিকিউশন।
অর্থাৎ, আদালতের রায়ে সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়ার পর সেই সম্পদ বাস্তবে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, বিক্রি করা এবং বিক্রিলব্ধ অর্থ ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো তৈরি করতে হবে।
রায়ে ক্ষতিপূরণের নির্দেশও ছিল
২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই রায়ে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে দেওয়া হয় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড।
ওই রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি জুলাই শহীদদের ‘কনসিডারেবল অ্যামাউন্ট অব কম্পেনসেশন’ বা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে রায়ের কপি দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
হলফনামায় শেখ হাসিনার সম্পদ ৪ কোটি ৩৪ লাখ
আদালতের রায়ের পর শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গোপালগঞ্জ-৩ আসনের প্রার্থী হিসেবে শেখ হাসিনা যে হলফনামা দিয়েছিলেন, সেখানে নিজের নামে চার কোটি ৩৪ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ দেখিয়েছিলেন।
তবে এর বাইরে শেখ হাসিনার বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
আসাদুজ্জামানের ঘোষিত সম্পদ
ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী হিসেবে দেওয়া হলফনামায় আসাদুজ্জামান খান হাতে নগদ ৮৪ লাখ টাকার কিছু বেশি দেখিয়েছিলেন।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা ছিল প্রায় ৮২ লাখ টাকা। বন্ড ও শেয়ারে ছিল প্রায় ২৪ লাখ টাকা। আর ডাকঘর, সঞ্চয়পত্র অথবা স্থায়ী আমানত হিসেবে দেখিয়েছিলেন প্রায় ২ কোটি ১ লাখ টাকা।
এর বাইরে অপ্রদর্শিত বিপুল সম্পদের অভিযোগেও দুদকের অনুসন্ধান চলছে।
ভবিষ্যৎ রায়েও প্রক্রিয়া স্পষ্ট করার আবেদন
সম্পদ বাজেয়াপ্তের পদ্ধতি নিয়ে প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী বলেন, বিচারাধীন মামলাগুলোর চূড়ান্ত যুক্তিতর্কের সময় আদালতের কাছে এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
তার বক্তব্য, কোনো আসামির অপরাধ প্রমাণিত হলে এবং রায়ে সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ দেওয়া হলে, সেই সম্পদ কীভাবে বাজেয়াপ্ত হবে—রায়েই যেন তার বিস্তারিত প্রক্রিয়া উল্লেখ থাকে।
ফলে এখন ট্রাইব্যুনালের সামনে শুধু অপরাধের বিচার বা সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ দেওয়ার বিষয়টি নয়; সেই আদেশ কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে ক্ষতিপূরণ কীভাবে পৌঁছাবে, সেটিও আইনি কাঠামোয় আনার প্রশ্নটি সামনে এসেছে।
























