ঢাকা ১২:২৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
শিশু মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল এমডি জেলে ‘নাগরিক সমন্বয়’ প্রকল্প বদলে দিল চা-শ্রমিক যুবতীর জীবন ডিসেম্বরে ফিরছেন না শেখ হাসিনা, বাড়ছে অনিশ্চয়তা ৮২৯ স্লিপার বাসই অনুমোদনহীন, বড় ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকি সন্তানকে দানের পরও সম্পত্তিতে বাবা-মার অধিকার, আইন পাস খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি আব্দুস সালাম পিন্টু স্কুল ফিডিংয়ের রুটি-ডিম খেয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১২ শিশু অসুস্থ ভিমরুলীর ভাসমান পেয়ারা বাগানে রেস্ট হাউজ, পরিবেশ সুরক্ষায় ডাস্টবিন বিতরণ আগের সরকারের ১,৩০০ প্রকল্পে চলছে যাচাই-বাছাই: অর্থমন্ত্রী প্রয়োজনে জীবন দেব, তবু দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে আপস নয়: মির্জা ফখরুল

‘নাগরিক সমন্বয়’ প্রকল্প বদলে দিল চা-শ্রমিক যুবতীর জীবন

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:২০:৪৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত চাম্পারাই চা বাগান। প্রতিদিনের সকাল এখানে শুরু হয় সারি সারি সবুজ চা-গাছ, পিঠে ঝুড়ি আর জীবিকা নির্বাহের নিরন্তর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। বাগানের শ্রমিক পরিবারগুলোর জন্য চা-পাতা তোলাই যেখানে যুগ যুগ ধরে চলে আসা প্রধান জীবিকার পথ বলে নির্ধারিত, নতুন প্রজন্মের জন্য সেখানে এর বাইরে গিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ খুবই সীমিত। এই বাস্তবতার মধ্যেই বেড়ে উঠেছেন ২৪ বছর বয়সী পল্লী চৌহান।

ছোটবেলা থেকেই পল্লী দেখেছেন চা-বাগানের নারীদের কঠোর পরিশ্রম ও কর্মনিষ্ঠা। তাঁদের অনেকেরই বিভিন্ন কাজের দক্ষতা রয়েছে, কিন্তু সেই দক্ষতাকে আয় ও আত্মনির্ভরতার পথে কাজে লাগানোর সুযোগ সীমিত। বাগানের ভেতরের জীবন, সীমিত যোগাযোগ এবং তথ্যের অপ্রতুলতা অনেক সময় তাদের সম্ভাবনাকে নিজেদের ঘর ও কর্মস্থলের গণ্ডির মধ্যেই আটকে রাখে। ফলে স্বপ্ন থাকলেও সেই স্বপ্নকে বাস্তব উদ্যোগে পরিণত করার পথটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে না।

চা-শ্রমিক বসতির বাকি কিশোরী মেয়েদের মত পল্লী চৌহানও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতেন, তবে সেই স্বপ্নের সঙ্গে ছিল নিজের পায়ে দাঁড়ানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা। সে আকাঙ্ক্ষা পুরোনের অংশ হিসেবেই হাতে-কলমে শেখা সামান্য সেলাইয়ের কাজ দিয়ে তিনি প্রতিবেশীদের ছোটখাটো অর্ডার নিতেন। ছোট সেলাই কাজ করে প্রায় ৫০০ টাকা আয় হতো, তবে তা নিয়মিত ছিল না। এই সামান্য আয় দিয়ে নিজের প্রয়োজন মেটানো কিংবা পরিবারের জন্য বড় কোনো পরিবর্তন আনাও সম্ভব ছিল না। উপজেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন চা-বাগানে বসবাসের কারণে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা নতুন কাজ শেখার সুযোগও তাঁর নাগালের বাইরে ছিল। সরকারি ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ থাকলেও সেগুলোর তথ্য ও বাস্তব অংশগ্রহণের সুযোগ স্থানীয় পর্যায়ে পৌঁছানো ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে পল্লীর মতো অনেক তরুণীর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তা বিকাশের অনুকূল পরিবেশ ছিল না।

দীর্ঘদিনের এই সীমাবদ্ধতার মধ্যে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে পল্লীর সামনে খুলে যায় নতুন একটি সম্ভাবনার দুয়ার। ‘নাগরিক সমন্বয়’ প্রকল্পের উদ্যোগে স্থানীয় সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে চাম্পারাই চা-বাগানের মানুষের জন্য দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরির বিষয়টি সামনে আসে। এর ফলশ্রুতিতে বাগানের ভেতরেই ছয় দিনব্যাপী ‘বাটিক ও ব্লক প্রিন্টিং’ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। চা-বাগানের বাইরে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার যে সুযোগ অনেকের জন্য প্রায় অসম্ভব ছিল, সেই প্রশিক্ষণই এবার পৌঁছে যায় তাদের বাড়ির উঠানে। প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া ৩০ জন নারীর একজন পল্লী।

প্রশিক্ষণটি পল্লীর কাছে শুধুই নতুন একটি কাজ শেখার সুযোগ ছিল না; এটি ছিল নিজের সক্ষমতাকে নতুন করে দেখার একটি অভিজ্ঞতা। বাটিক ও ব্লক প্রিন্টিংয়ের বিভিন্ন কৌশল শেখার পাশাপাশি তিনি নিজের দক্ষতাকে কিভাবে আয়ের পথ হিসেবে কাজে লাগানো যায় সে পরিকল্পনা করেন। প্রশিক্ষণটি তাকে শিখিয়েছে কিভাবে অর্ডার নিতে হয় এবং নিজের দক্ষতাকে আয়ের সম্ভাবনায় রূপ দিতে কিভাবে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠতে হয়। প্রশিক্ষণ শেষে তাই আর অপেক্ষা করেননি পল্লী। ঘরেই কাজ শুরু করেন। আশপাশের চা-বাগান এবং শ্রীমঙ্গলসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের কাছ থেকে অর্ডার নিয়ে তৈরি করতে থাকেন ব্লক প্রিন্টের বিভিন্ন সামগ্রী।

শুরুটা ছিল ছোট, কিন্তু পরিবর্তনটি ছিল দৃশ্যমান। পল্লী সফলভাবে অসংখ্য অর্ডার সম্পন্ন করেছেন। দৈনিক আয় প্রায় ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে এখন প্রায় ২,০০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অঙ্কের হিসাবে এই বৃদ্ধি হয়তো খুব বড় নয়, কিন্তু পল্লীর মতো একজন তরুণীর জন্য এটি নিজের শ্রমের মূল্য পাওয়ার, সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। যে দক্ষতা একসময় ঘরের কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, সেটিই এখন তার আয়ের পথ তৈরি করছে। পল্লীর পরিবর্তনের প্রভাব শুধু তার নিজের জীবনে থেমে থাকেনি। একই প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া অন্য নারীরাও তার অগ্রগতি দেখে উৎসাহিত হচ্ছেন। কেউ আয় শুরু করেছেন, কেউ নিজের উদ্যোগ শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একজনের অগ্রগতি যেন অন্যদের জন্য সম্ভাবনার একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছে। এতে চা-বাগানের নারীদের মধ্যে দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও ছোট পরিসরে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। এভাবেই একটি প্রশিক্ষণ ব্যক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি সামাজিক অনুপ্রেরণারও জায়গা তৈরি করছে।

তবে এখানেই থেমে থাকতে চান না পল্লী। নিজের দক্ষতাকে আরও বিস্তৃত করতে বর্তমানে তিনি Skills for Industry Competitiveness and Innovation Program (SICIP)-এর আওতায় ফ্যাশন গার্মেন্টস বিষয়ে উন্নত প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। নতুন দক্ষতা অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের কাজকে আরও বড় পরিসরে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার স্বপ্ন এখন শুধু নিজের আয় বাড়ানো নয়; ভবিষ্যতে নিজের একটি উদ্যোগ গড়ে তোলা এবং তাঁর মাধ্যমে চা-বাগানের আরও নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।

পল্লীর গল্প তাই শুধু একটি প্রশিক্ষণ শেষে আয় বৃদ্ধির গল্প নয়। এটি একজন প্রান্তিক নারীর নিজ সক্ষমতায় বিনিয়োগ, স্থানীয় পর্যায়ে সুযোগ পৌঁছে দেওয়া এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরির গল্পও। চা-বাগানের যে তরুণী একসময় মাসে ৫০০ টাকার অনিয়মিত আয়ে সীমাবদ্ধ ছিলেন, তিনি এখন নিজের শ্রমকে পণ্যে, দক্ষতাকে আয়ে এবং স্বপ্নকে উদ্যোগে রূপ দেওয়ার পথে হাঁটছেন। তাঁর পথচলা দেখিয়ে দেয়, সুযোগের দরজা অনেক সময় মানুষের সামর্থ্যের অভাবেই বন্ধ থাকে না; দরকার হয় সেই দরজায় পৌঁছানোর একটি কার্যকর পথ। পল্লী সেই পথের সন্ধান পেয়েছেন। এখন তার সামনে সম্ভাবনার পথ আরও বিস্তৃত করার পালা- নিজের জন্য, এবং ‘নাগরিক সমন্বয়’ প্রকল্পের মাধ্যমে অন্য নারীদের জন্যও।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

‘নাগরিক সমন্বয়’ প্রকল্প বদলে দিল চা-শ্রমিক যুবতীর জীবন

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:২০:৪৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত চাম্পারাই চা বাগান। প্রতিদিনের সকাল এখানে শুরু হয় সারি সারি সবুজ চা-গাছ, পিঠে ঝুড়ি আর জীবিকা নির্বাহের নিরন্তর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। বাগানের শ্রমিক পরিবারগুলোর জন্য চা-পাতা তোলাই যেখানে যুগ যুগ ধরে চলে আসা প্রধান জীবিকার পথ বলে নির্ধারিত, নতুন প্রজন্মের জন্য সেখানে এর বাইরে গিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ খুবই সীমিত। এই বাস্তবতার মধ্যেই বেড়ে উঠেছেন ২৪ বছর বয়সী পল্লী চৌহান।

ছোটবেলা থেকেই পল্লী দেখেছেন চা-বাগানের নারীদের কঠোর পরিশ্রম ও কর্মনিষ্ঠা। তাঁদের অনেকেরই বিভিন্ন কাজের দক্ষতা রয়েছে, কিন্তু সেই দক্ষতাকে আয় ও আত্মনির্ভরতার পথে কাজে লাগানোর সুযোগ সীমিত। বাগানের ভেতরের জীবন, সীমিত যোগাযোগ এবং তথ্যের অপ্রতুলতা অনেক সময় তাদের সম্ভাবনাকে নিজেদের ঘর ও কর্মস্থলের গণ্ডির মধ্যেই আটকে রাখে। ফলে স্বপ্ন থাকলেও সেই স্বপ্নকে বাস্তব উদ্যোগে পরিণত করার পথটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে না।

চা-শ্রমিক বসতির বাকি কিশোরী মেয়েদের মত পল্লী চৌহানও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতেন, তবে সেই স্বপ্নের সঙ্গে ছিল নিজের পায়ে দাঁড়ানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা। সে আকাঙ্ক্ষা পুরোনের অংশ হিসেবেই হাতে-কলমে শেখা সামান্য সেলাইয়ের কাজ দিয়ে তিনি প্রতিবেশীদের ছোটখাটো অর্ডার নিতেন। ছোট সেলাই কাজ করে প্রায় ৫০০ টাকা আয় হতো, তবে তা নিয়মিত ছিল না। এই সামান্য আয় দিয়ে নিজের প্রয়োজন মেটানো কিংবা পরিবারের জন্য বড় কোনো পরিবর্তন আনাও সম্ভব ছিল না। উপজেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন চা-বাগানে বসবাসের কারণে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা নতুন কাজ শেখার সুযোগও তাঁর নাগালের বাইরে ছিল। সরকারি ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ থাকলেও সেগুলোর তথ্য ও বাস্তব অংশগ্রহণের সুযোগ স্থানীয় পর্যায়ে পৌঁছানো ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে পল্লীর মতো অনেক তরুণীর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তা বিকাশের অনুকূল পরিবেশ ছিল না।

দীর্ঘদিনের এই সীমাবদ্ধতার মধ্যে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে পল্লীর সামনে খুলে যায় নতুন একটি সম্ভাবনার দুয়ার। ‘নাগরিক সমন্বয়’ প্রকল্পের উদ্যোগে স্থানীয় সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে চাম্পারাই চা-বাগানের মানুষের জন্য দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরির বিষয়টি সামনে আসে। এর ফলশ্রুতিতে বাগানের ভেতরেই ছয় দিনব্যাপী ‘বাটিক ও ব্লক প্রিন্টিং’ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। চা-বাগানের বাইরে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার যে সুযোগ অনেকের জন্য প্রায় অসম্ভব ছিল, সেই প্রশিক্ষণই এবার পৌঁছে যায় তাদের বাড়ির উঠানে। প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া ৩০ জন নারীর একজন পল্লী।

প্রশিক্ষণটি পল্লীর কাছে শুধুই নতুন একটি কাজ শেখার সুযোগ ছিল না; এটি ছিল নিজের সক্ষমতাকে নতুন করে দেখার একটি অভিজ্ঞতা। বাটিক ও ব্লক প্রিন্টিংয়ের বিভিন্ন কৌশল শেখার পাশাপাশি তিনি নিজের দক্ষতাকে কিভাবে আয়ের পথ হিসেবে কাজে লাগানো যায় সে পরিকল্পনা করেন। প্রশিক্ষণটি তাকে শিখিয়েছে কিভাবে অর্ডার নিতে হয় এবং নিজের দক্ষতাকে আয়ের সম্ভাবনায় রূপ দিতে কিভাবে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠতে হয়। প্রশিক্ষণ শেষে তাই আর অপেক্ষা করেননি পল্লী। ঘরেই কাজ শুরু করেন। আশপাশের চা-বাগান এবং শ্রীমঙ্গলসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের কাছ থেকে অর্ডার নিয়ে তৈরি করতে থাকেন ব্লক প্রিন্টের বিভিন্ন সামগ্রী।

শুরুটা ছিল ছোট, কিন্তু পরিবর্তনটি ছিল দৃশ্যমান। পল্লী সফলভাবে অসংখ্য অর্ডার সম্পন্ন করেছেন। দৈনিক আয় প্রায় ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে এখন প্রায় ২,০০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অঙ্কের হিসাবে এই বৃদ্ধি হয়তো খুব বড় নয়, কিন্তু পল্লীর মতো একজন তরুণীর জন্য এটি নিজের শ্রমের মূল্য পাওয়ার, সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। যে দক্ষতা একসময় ঘরের কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, সেটিই এখন তার আয়ের পথ তৈরি করছে। পল্লীর পরিবর্তনের প্রভাব শুধু তার নিজের জীবনে থেমে থাকেনি। একই প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া অন্য নারীরাও তার অগ্রগতি দেখে উৎসাহিত হচ্ছেন। কেউ আয় শুরু করেছেন, কেউ নিজের উদ্যোগ শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একজনের অগ্রগতি যেন অন্যদের জন্য সম্ভাবনার একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছে। এতে চা-বাগানের নারীদের মধ্যে দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও ছোট পরিসরে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। এভাবেই একটি প্রশিক্ষণ ব্যক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি সামাজিক অনুপ্রেরণারও জায়গা তৈরি করছে।

তবে এখানেই থেমে থাকতে চান না পল্লী। নিজের দক্ষতাকে আরও বিস্তৃত করতে বর্তমানে তিনি Skills for Industry Competitiveness and Innovation Program (SICIP)-এর আওতায় ফ্যাশন গার্মেন্টস বিষয়ে উন্নত প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। নতুন দক্ষতা অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের কাজকে আরও বড় পরিসরে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার স্বপ্ন এখন শুধু নিজের আয় বাড়ানো নয়; ভবিষ্যতে নিজের একটি উদ্যোগ গড়ে তোলা এবং তাঁর মাধ্যমে চা-বাগানের আরও নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।

পল্লীর গল্প তাই শুধু একটি প্রশিক্ষণ শেষে আয় বৃদ্ধির গল্প নয়। এটি একজন প্রান্তিক নারীর নিজ সক্ষমতায় বিনিয়োগ, স্থানীয় পর্যায়ে সুযোগ পৌঁছে দেওয়া এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরির গল্পও। চা-বাগানের যে তরুণী একসময় মাসে ৫০০ টাকার অনিয়মিত আয়ে সীমাবদ্ধ ছিলেন, তিনি এখন নিজের শ্রমকে পণ্যে, দক্ষতাকে আয়ে এবং স্বপ্নকে উদ্যোগে রূপ দেওয়ার পথে হাঁটছেন। তাঁর পথচলা দেখিয়ে দেয়, সুযোগের দরজা অনেক সময় মানুষের সামর্থ্যের অভাবেই বন্ধ থাকে না; দরকার হয় সেই দরজায় পৌঁছানোর একটি কার্যকর পথ। পল্লী সেই পথের সন্ধান পেয়েছেন। এখন তার সামনে সম্ভাবনার পথ আরও বিস্তৃত করার পালা- নিজের জন্য, এবং ‘নাগরিক সমন্বয়’ প্রকল্পের মাধ্যমে অন্য নারীদের জন্যও।