ঢাকা ১২:০৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ডিসেম্বরে ফিরছেন না শেখ হাসিনা, বাড়ছে অনিশ্চয়তা ৮২৯ স্লিপার বাসই অনুমোদনহীন, বড় ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকি সন্তানকে দানের পরও সম্পত্তিতে বাবা-মার অধিকার, আইন পাস খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি আব্দুস সালাম পিন্টু স্কুল ফিডিংয়ের রুটি-ডিম খেয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১২ শিশু অসুস্থ ভিমরুলীর ভাসমান পেয়ারা বাগানে রেস্ট হাউজ, পরিবেশ সুরক্ষায় ডাস্টবিন বিতরণ আগের সরকারের ১,৩০০ প্রকল্পে চলছে যাচাই-বাছাই: অর্থমন্ত্রী প্রয়োজনে জীবন দেব, তবু দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে আপস নয়: মির্জা ফখরুল গোসল করতে নেমে পুকুরে ডুবে নাতি-নাতনিসহ বৃদ্ধের মৃত্যু দুই মামলায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিন, মিলছে না কারামুক্তি

৮২৯ স্লিপার বাসই অনুমোদনহীন, বড় ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকি

সুপন রায়
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০২:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

চোখ ধাঁধানো সাজসজ্জা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিন আর শুয়ে যাতায়াতের সুবিধা—দূরপাল্লার যাত্রীদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে স্লিপার কোচ। তবে আরামের এই যাত্রার আড়ালেই রয়েছে বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি। দেশে চলাচলকারী বিপুলসংখ্যক স্লিপার কোচেরই সংশ্লিষ্ট শ্রেণিতে অনুমোদন নেই। সাধারণ বাসের কাঠামো পরিবর্তন করে তৈরি এসব কোচ যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাম্প্রতিক সময়ে স্লিপার বাসে অগ্নিকাণ্ড ও দুর্ঘটনার কয়েকটি ঘটনা সেই আশঙ্কাকে আরও সামনে এনেছে। গত ২১ আগস্ট একটি চলন্ত স্লিপার বাসে আগুন লাগার পর স্থানীয় লোকজন জানালার কাচ ভেঙে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ যাত্রীকে বের করে আনেন। বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো গেলেও ওই ঘটনা স্লিপার কোচের জরুরি নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

৮২৯ স্লিপার বাসই অনুমোদনহীন

স্লিপার কোচের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন এখন গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। সাম্প্রতিক শুনানিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) আদালতকে জানিয়েছে, দেশের সড়কে ৮২৯টি অনুমোদনহীন স্লিপার বাস চলাচল করছে। এসব বাসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে অভিযানও চালানো হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ চেয়ার কোচের কাঠামো পরিবর্তন করে দেশীয় গ্যারেজে তৈরি করা হচ্ছে স্লিপার কোচ। কোথাও বাসের উচ্চতা বাড়ানো হচ্ছে, আবার বসার আসনের পরিবর্তে তৈরি করা হচ্ছে একাধিক শোয়ার আসন। এসব কাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রকৌশলগত অনুমোদন ও নিরাপত্তা যাচাই হয়েছে কি না, তা নিয়েও রয়েছে বড় প্রশ্ন।

কাঠামো বদলেই বাড়ছে ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ বাসের চেসিস যে ধরনের ওজন বহনের জন্য তৈরি, কাঠামো পরিবর্তন করে তার ওপর অতিরিক্ত ওজন যুক্ত করলে বাসের ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে বাসের উচ্চতা বাড়ানো হলে তীব্র বাঁক, হঠাৎ ব্রেক কিংবা দুর্ঘটনার সময় ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।

অনেক স্লিপার কোচের কাঠামো দেশীয় মিস্ত্রিদের মাধ্যমে পরিবর্তন করা হচ্ছে এবং চেসিস নির্মাতার নির্ধারিত নকশা ও কারিগরি নির্দেশনা অনুসরণ করা হচ্ছে না—এমন অভিযোগও রয়েছে। এতে দুর্ঘটনার সময় যাত্রীদের নিরাপদে বের হওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে যেতে পারে।

আগুন লাগলে বের হওয়ার পথ কতটা নিরাপদ?

স্লিপার কোচের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি হলো জরুরি পরিস্থিতিতে যাত্রীদের দ্রুত বের করে আনা। শুয়ে থাকা যাত্রীরা দুর্ঘটনা বা আগুন লাগার মুহূর্তে দ্রুত পরিস্থিতি বুঝে উঠতে পারেন না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সংকীর্ণ করিডোর, কেবিন বিভাজন ও পরিবর্তিত কাঠামো।

ফলে আগুন বা বড় ধরনের দুর্ঘটনার সময় বাসের জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা কতটা কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক একটি অগ্নিকাণ্ডে স্থানীয় লোকজনকে জানালার কাচ ভেঙে যাত্রীদের বের করে আনতে হয়েছিল। এতে স্পষ্ট হয়েছে, বিপদের মুহূর্তে বাসের নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর—সেটিও গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযান-জরিমানা চলছে, তবু থামছে না

অনুমোদনহীন স্লিপার কোচ ও এসব বাস তৈরির গ্যারেজের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে অভিযান জোরদার করেছে বিআরটিএ। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদনহীন স্লিপার কোচ তৈরি ও বাসের কাঠামো পরিবর্তনের অভিযোগে গ্যারেজগুলোকে জরিমানা করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যানবাহন জব্দ করে ডাম্পিংয়েও পাঠানো হয়েছে।

সুনামগঞ্জেও অনুমোদন ছাড়া সাধারণ বাসকে স্লিপার কোচে রূপান্তরের অভিযোগে চারটি বাসকে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

তবে জরিমানা ও সতর্কতার পরও সড়কে এসব বাসের চলাচল বন্ধ না হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে—যে বাসের কাঠামোই অনুমোদিত নয়, জরিমানা দেওয়ার পরও সেগুলো কীভাবে আবার মহাসড়কে যাত্রী নিয়ে চলছে?

সিলেট রুটে ফের ৩ স্লিপার কোচকে জরিমানা

বারবার জরিমানা ও সতর্ক করার পরও সিলেট রুটে অনুমোদনহীন স্লিপার কোচের চলাচল বন্ধ হয়নি। এবার সুনামগঞ্জে অভিযান চালিয়ে তিনটি পরিবহনকে মোট ৯০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিষয়টি জানায় র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখা। তারা জানায়, শনিবার রাত ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত সুনামগঞ্জের মল্লিকপুর নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অভিযান চালায় সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

অভিযানে অনুমোদনহীন স্লিপার কোচ পরিচালনার দায়ে বেঙ্গল পরিবহনের মালিককে ৩০ হাজার, শ্যামলী পরিবহনের মালিককে ৩০ হাজার এবং ইম্পেরিয়েল পরিবহনের মালিককে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এর আগে সিলেটের কদমতলী ও সুনামগঞ্জের ওই বাসস্ট্যান্ডে একই তিনটি প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের সতর্কও করা হয়েছিল। কিন্তু এরপরও এসব বাসের চলাচল অব্যাহত রয়েছে।

‘জরিমানা করে বন্ধ করা সম্ভব অইতোনায়’

মল্লিকপুর এলাকার এক পরিবহন শ্রমিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শুধু জরিমানা করে এসব বাসের চলাচল বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাঁর ভাষায়, ‘ইতা জরিমানা করিয়া বন্ধ করা সম্ভব অইতোনায়। লুকোচুরি খেলা চলতেউ থাকবো। ই জাতীয় বাসগুলো রাস্তা থাকি স্থায়ীভাবে তুলি দিওয়া জরুরী।’

এই বক্তব্যই মূলত সামনে আনছে সমস্যাটির গভীরতা। একদিকে প্রশাসনের অভিযান ও জরিমানা, অন্যদিকে একই পরিবহনের বাসের বারবার সড়কে ফিরে আসা—দুইয়ের মধ্যে যেন তৈরি হয়েছে এক ধরনের লুকোচুরি খেলা।

জরিমানা নয়, প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান

স্লিপার কোচে যাত্রীদের চাহিদা রয়েছে—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দীর্ঘপথে আরামদায়ক যাত্রার জন্য অনেকেই বাড়তি ভাড়া দিয়ে এসব বাসে ভ্রমণ করছেন। কিন্তু সেই আরামের বিনিময়ে যদি যাত্রীদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে, তাহলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, স্লিপার কোচের কাঠামো, চেসিস, ওজন, উচ্চতা, জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা ও ফিটনেস—সবকিছু কঠোরভাবে পরীক্ষা করে বৈধতার আওতায় আনা প্রয়োজন। নিরাপত্তার মানদণ্ড পূরণ না করলে এসব বাসের চলাচল বন্ধ করাই হতে পারে কার্যকর সমাধান।

কারণ, দুর্ঘটনার পর জরিমানা বা মামলা করে প্রাণহানির ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব নয়। বড় কোনো দুর্ঘটনায় কয়েক মিনিটের ব্যবধানই কেড়ে নিতে পারে বহু মানুষের জীবন। তাই অনুমোদনহীন স্লিপার কোচের বিরুদ্ধে শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন স্থায়ী ও কঠোর ব্যবস্থা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

৮২৯ স্লিপার বাসই অনুমোদনহীন, বড় ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকি

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০২:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চোখ ধাঁধানো সাজসজ্জা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিন আর শুয়ে যাতায়াতের সুবিধা—দূরপাল্লার যাত্রীদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে স্লিপার কোচ। তবে আরামের এই যাত্রার আড়ালেই রয়েছে বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি। দেশে চলাচলকারী বিপুলসংখ্যক স্লিপার কোচেরই সংশ্লিষ্ট শ্রেণিতে অনুমোদন নেই। সাধারণ বাসের কাঠামো পরিবর্তন করে তৈরি এসব কোচ যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাম্প্রতিক সময়ে স্লিপার বাসে অগ্নিকাণ্ড ও দুর্ঘটনার কয়েকটি ঘটনা সেই আশঙ্কাকে আরও সামনে এনেছে। গত ২১ আগস্ট একটি চলন্ত স্লিপার বাসে আগুন লাগার পর স্থানীয় লোকজন জানালার কাচ ভেঙে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ যাত্রীকে বের করে আনেন। বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো গেলেও ওই ঘটনা স্লিপার কোচের জরুরি নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

৮২৯ স্লিপার বাসই অনুমোদনহীন

স্লিপার কোচের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন এখন গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। সাম্প্রতিক শুনানিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) আদালতকে জানিয়েছে, দেশের সড়কে ৮২৯টি অনুমোদনহীন স্লিপার বাস চলাচল করছে। এসব বাসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে অভিযানও চালানো হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ চেয়ার কোচের কাঠামো পরিবর্তন করে দেশীয় গ্যারেজে তৈরি করা হচ্ছে স্লিপার কোচ। কোথাও বাসের উচ্চতা বাড়ানো হচ্ছে, আবার বসার আসনের পরিবর্তে তৈরি করা হচ্ছে একাধিক শোয়ার আসন। এসব কাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রকৌশলগত অনুমোদন ও নিরাপত্তা যাচাই হয়েছে কি না, তা নিয়েও রয়েছে বড় প্রশ্ন।

কাঠামো বদলেই বাড়ছে ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ বাসের চেসিস যে ধরনের ওজন বহনের জন্য তৈরি, কাঠামো পরিবর্তন করে তার ওপর অতিরিক্ত ওজন যুক্ত করলে বাসের ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে বাসের উচ্চতা বাড়ানো হলে তীব্র বাঁক, হঠাৎ ব্রেক কিংবা দুর্ঘটনার সময় ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।

অনেক স্লিপার কোচের কাঠামো দেশীয় মিস্ত্রিদের মাধ্যমে পরিবর্তন করা হচ্ছে এবং চেসিস নির্মাতার নির্ধারিত নকশা ও কারিগরি নির্দেশনা অনুসরণ করা হচ্ছে না—এমন অভিযোগও রয়েছে। এতে দুর্ঘটনার সময় যাত্রীদের নিরাপদে বের হওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে যেতে পারে।

আগুন লাগলে বের হওয়ার পথ কতটা নিরাপদ?

স্লিপার কোচের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি হলো জরুরি পরিস্থিতিতে যাত্রীদের দ্রুত বের করে আনা। শুয়ে থাকা যাত্রীরা দুর্ঘটনা বা আগুন লাগার মুহূর্তে দ্রুত পরিস্থিতি বুঝে উঠতে পারেন না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সংকীর্ণ করিডোর, কেবিন বিভাজন ও পরিবর্তিত কাঠামো।

ফলে আগুন বা বড় ধরনের দুর্ঘটনার সময় বাসের জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা কতটা কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক একটি অগ্নিকাণ্ডে স্থানীয় লোকজনকে জানালার কাচ ভেঙে যাত্রীদের বের করে আনতে হয়েছিল। এতে স্পষ্ট হয়েছে, বিপদের মুহূর্তে বাসের নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর—সেটিও গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযান-জরিমানা চলছে, তবু থামছে না

অনুমোদনহীন স্লিপার কোচ ও এসব বাস তৈরির গ্যারেজের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে অভিযান জোরদার করেছে বিআরটিএ। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদনহীন স্লিপার কোচ তৈরি ও বাসের কাঠামো পরিবর্তনের অভিযোগে গ্যারেজগুলোকে জরিমানা করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যানবাহন জব্দ করে ডাম্পিংয়েও পাঠানো হয়েছে।

সুনামগঞ্জেও অনুমোদন ছাড়া সাধারণ বাসকে স্লিপার কোচে রূপান্তরের অভিযোগে চারটি বাসকে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

তবে জরিমানা ও সতর্কতার পরও সড়কে এসব বাসের চলাচল বন্ধ না হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে—যে বাসের কাঠামোই অনুমোদিত নয়, জরিমানা দেওয়ার পরও সেগুলো কীভাবে আবার মহাসড়কে যাত্রী নিয়ে চলছে?

সিলেট রুটে ফের ৩ স্লিপার কোচকে জরিমানা

বারবার জরিমানা ও সতর্ক করার পরও সিলেট রুটে অনুমোদনহীন স্লিপার কোচের চলাচল বন্ধ হয়নি। এবার সুনামগঞ্জে অভিযান চালিয়ে তিনটি পরিবহনকে মোট ৯০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিষয়টি জানায় র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখা। তারা জানায়, শনিবার রাত ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত সুনামগঞ্জের মল্লিকপুর নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অভিযান চালায় সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

অভিযানে অনুমোদনহীন স্লিপার কোচ পরিচালনার দায়ে বেঙ্গল পরিবহনের মালিককে ৩০ হাজার, শ্যামলী পরিবহনের মালিককে ৩০ হাজার এবং ইম্পেরিয়েল পরিবহনের মালিককে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এর আগে সিলেটের কদমতলী ও সুনামগঞ্জের ওই বাসস্ট্যান্ডে একই তিনটি প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের সতর্কও করা হয়েছিল। কিন্তু এরপরও এসব বাসের চলাচল অব্যাহত রয়েছে।

‘জরিমানা করে বন্ধ করা সম্ভব অইতোনায়’

মল্লিকপুর এলাকার এক পরিবহন শ্রমিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শুধু জরিমানা করে এসব বাসের চলাচল বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাঁর ভাষায়, ‘ইতা জরিমানা করিয়া বন্ধ করা সম্ভব অইতোনায়। লুকোচুরি খেলা চলতেউ থাকবো। ই জাতীয় বাসগুলো রাস্তা থাকি স্থায়ীভাবে তুলি দিওয়া জরুরী।’

এই বক্তব্যই মূলত সামনে আনছে সমস্যাটির গভীরতা। একদিকে প্রশাসনের অভিযান ও জরিমানা, অন্যদিকে একই পরিবহনের বাসের বারবার সড়কে ফিরে আসা—দুইয়ের মধ্যে যেন তৈরি হয়েছে এক ধরনের লুকোচুরি খেলা।

জরিমানা নয়, প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান

স্লিপার কোচে যাত্রীদের চাহিদা রয়েছে—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দীর্ঘপথে আরামদায়ক যাত্রার জন্য অনেকেই বাড়তি ভাড়া দিয়ে এসব বাসে ভ্রমণ করছেন। কিন্তু সেই আরামের বিনিময়ে যদি যাত্রীদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে, তাহলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, স্লিপার কোচের কাঠামো, চেসিস, ওজন, উচ্চতা, জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা ও ফিটনেস—সবকিছু কঠোরভাবে পরীক্ষা করে বৈধতার আওতায় আনা প্রয়োজন। নিরাপত্তার মানদণ্ড পূরণ না করলে এসব বাসের চলাচল বন্ধ করাই হতে পারে কার্যকর সমাধান।

কারণ, দুর্ঘটনার পর জরিমানা বা মামলা করে প্রাণহানির ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব নয়। বড় কোনো দুর্ঘটনায় কয়েক মিনিটের ব্যবধানই কেড়ে নিতে পারে বহু মানুষের জীবন। তাই অনুমোদনহীন স্লিপার কোচের বিরুদ্ধে শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন স্থায়ী ও কঠোর ব্যবস্থা।