ঢাকা ১২:৫২ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
জামায়াতের প্রদর্শনীতে মুক্তিযুদ্ধ আছে, নেই জামায়াত জঙ্গল ছেড়ে লোকালয়ে বিষধর সাপ, খাদ্যসংকট ও সংকুচিত আবাসস্থলই কি কারণ? এসএসসি ও সমমানের ফল সোমবার, জানা যাবে ৩ উপায়ে একই খাটে মা-ছেলের লাশ, শিশুর হাত-পা বাঁধা—যশোরে রহস্যজনক মৃত্যু মাকে খুঁজতে এসে মিলল পলিথিনে মোড়ানো মরদেহ, মেলেনি মাথা ও পা কম বয়সেই বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি? নারীদের ৩ লক্ষণে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ ইনফ্লুয়েঞ্জা ঠেকাতে নতুন আশার আলো, প্রবীণদের জন্য এমআরএনএ ফ্লু টিকা ব্যবহৃত রাখি ডাস্টবিনে ফেলেন? ভুলেও নয়, জেনে নিন কী করা উচিত বেসরকারি জ্বালানি তেল আমদানিতে বিশেষ সুবিধার অভিযোগ ভিত্তিহীন: জ্বালানি বিভাগ শেখ হাসিনা চাইলেই কি দেশে ফিরতে পারবেন?

জঙ্গল ছেড়ে লোকালয়ে বিষধর সাপ, খাদ্যসংকট ও সংকুচিত আবাসস্থলই কি কারণ?

আবুল কাশেম রুমন,সিলেট
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০৫:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

গভীর জঙ্গলে থাকার কথা যাদের, সেই অজগর এখন নিয়মিত ঢুকে পড়ছে মানুষের বসতবাড়ি, খামার, বাঁশঝাড় ও চা-বাগানে। সিলেট বিভাগের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে বিষধর সাপসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণীর লোকালয়ে চলে আসার ঘটনা বাড়লেও সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে মৌলভীবাজারের অজগর।

বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের বনসংলগ্ন এলাকায় ১২ থেকে ১৮ ফুট দীর্ঘ অজগরের ঘন ঘন উপস্থিতি স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। কখনো বাড়ির আঙিনায়, কখনো হাঁস-মুরগির খামারে, আবার কখনো চা-বাগান কিংবা হাইল হাওড়ের আশপাশে দেখা মিলছে বিশাল আকৃতির এসব সাপের।

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু সাপের লোকালয়ে ঢুকে পড়ার ঘটনা নয়; বরং বনাঞ্চলের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ, খাদ্যসংকট ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে যাওয়ার একটি সতর্ক সংকেত।

দুই মাসে উদ্ধার ১০ অজগর

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, বন বিভাগ ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন ও জুলাই—এই দুই মাসে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ১০টি অজগর উদ্ধার করা হয়েছে।

উদ্ধার হওয়া অজগরগুলোর দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১২ থেকে ১৮ ফুট। ওজন ছিল ২০ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত।

তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকা থেকে চারটি অজগর উদ্ধার করা হয়। এরপর ৯ জুলাই ভূরভূড়িছড়া চা-বাগান থেকে একটি, ১৬ জুলাই ভাড়াউড়া চা-বাগান ও সিন্দুরখান এলাকা থেকে দুটি, ২১ জুলাই উত্তর ভাড়াউড়া এলাকা থেকে একটি এবং ২৮ জুলাই কমলগঞ্জের ফুলবাড়ী চা-বাগান ও শ্রীমঙ্গলের জাগছড়া চা-বাগান থেকে আরও দুটি অজগর উদ্ধার করা হয়।

প্রতিবারই সাপের উপস্থিতি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে বন বিভাগ ও বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের উদ্ধারকর্মীরা সাপগুলো উদ্ধার করে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবমুক্ত করেন।

ভেঙে পড়ছে বনের খাদ্যশৃঙ্খল

বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবকদের মতে, একসময় লাউয়াছড়া ও আশপাশের বনাঞ্চলে হরিণসহ বিভিন্ন ছোট বন্যপ্রাণীর দেখা মিলত। এখন অনেক প্রজাতির প্রাণীই আগের মতো চোখে পড়ে না। অথচ লোকালয়ে প্রায়ই দেখা যাচ্ছে বিশাল আকৃতির অজগর।

ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য চঞ্চল গোয়ালা বলেন, বনের খাদ্যশৃঙ্খল ক্রমেই ভেঙে পড়ছে। অজগরের প্রধান খাদ্যের মধ্যে রয়েছে ইঁদুর, পাখি, বনমোরগ ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী। এসব প্রাণীর সংখ্যা কমে গেলে অজগর খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ের দিকে চলে আসতে বাধ্য হয়।

তিনি বলেন, লোকালয়ে অজগর সহজেই হাঁস-মুরগি কিংবা গৃহপালিত প্রাণীকে শিকার হিসেবে পেয়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন মানুষ আতঙ্কিত হচ্ছে, অন্যদিকে বন্যপ্রাণীও মানুষের হাতে প্রাণ হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে।

সংকুচিত হচ্ছে অজগরের আবাসস্থল

সিলেট বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোর একটি লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। জীববৈচিত্র্য ও বিরল বন্যপ্রাণীর জন্য পরিচিত এই বনাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে অজগর, বানর, মেছোবাঘ, গন্ধগোকুল, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ও পাখির গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল।

তবে স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, বনভূমি দখল, অবৈধ জনবসতি, বিভিন্ন বাণিজ্যিক বাগানের সম্প্রসারণ এবং মূল্যবান বৃক্ষ নিধনের কারণে বনের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

ফলে শুধু অজগর নয়, অন্যান্য বন্যপ্রাণীরও বিচরণক্ষেত্র ও খাদ্যের উৎস কমে যাচ্ছে। নিরাপদ আশ্রয় ও খাবারের সন্ধানে তারা লোকালয়, চা-বাগান এবং সড়কের কাছাকাছি চলে আসছে।

সড়ক-রেলপথেও বাড়ছে ঝুঁকি

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের সংযোগ সড়ক চলে গেছে। একইভাবে ঢাকা-সিলেট-চট্টগ্রাম রেললাইনও বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে গেছে।

বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের ভাষ্য, বনের এক অংশ থেকে অন্য অংশে যেতে গিয়ে প্রাণীগুলোকে প্রায়ই সড়ক ও রেললাইন পার হতে হয়। এ সময় যানবাহন কিংবা ট্রেনের ধাক্কায় সাপ, গন্ধগোকুল, বানরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে।

এতে বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।

বৃষ্টির পানিতেও আশ্রয় বদলাচ্ছে অজগর

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও বনের ছড়াগুলোতে পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়াও অজগরের লোকালয়ে চলে আসার একটি কারণ হতে পারে।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের মৌলভীবাজার রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় বনের ছড়াগুলোতে পানির প্রবাহ বেড়েছে। এ কারণে অজগর লোকালয়ের দিকে চলে আসছে। চা-বাগানও তাদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করছে।

তিনি জানান, অজগর বা কোনো বন্যপ্রাণী লোকালয়ে দেখা গেলে আতঙ্কিত না হয়ে বন বিভাগকে খবর দিতে হবে। জনসচেতনতা বাড়াতেও বন বিভাগের পক্ষ থেকে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

বন দখল নিয়ে উদ্বেগ

চলতি বছরের এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মজিবুর রহমান চৌধুরী লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও আশপাশের বনাঞ্চল পরিদর্শন করেন। এ সময় বনভূমি দখল করে অবৈধ বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ ও বন উজাড়ের ঘটনায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তিনি দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া, দখলকৃত বনভূমি উদ্ধার এবং লাউয়াছড়ার জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।

শুধু অজগর উদ্ধার করলেই কি সমাধান?

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই মাসে ১০টি অজগর উদ্ধার নিছক কয়েকটি উদ্ধার অভিযানের পরিসংখ্যান নয়। এটি লাউয়াছড়া ও আশপাশের বনাঞ্চলের পরিবেশগত পরিবর্তনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

লোকালয়ে চলে আসা অজগর উদ্ধার করে আবার বনে ছেড়ে দেওয়া প্রয়োজনীয় উদ্যোগ হলেও, এটিকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং কেন প্রাণীগুলো বারবার লোকালয়ে আসছে, সেই কারণগুলো চিহ্নিত করাই জরুরি।

বনভূমি দখল বন্ধ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, প্রাকৃতিক আবাসস্থল পুনরুদ্ধার, বন্যপ্রাণীর খাদ্যের উৎস সংরক্ষণ এবং সড়ক-রেলপথে প্রাণী চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

তা না হলে একদিকে যেমন মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর সংঘাত বাড়বে, অন্যদিকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্যও আরও বড় সংকটের মুখে পড়বে।

লাউয়াছড়ার জঙ্গলে অজগরের জায়গা ছিল বনের গভীরে। সেই অজগর যখন মানুষের উঠানে এসে আশ্রয় খুঁজছে, তখন প্রশ্নটা শুধু ‘সাপ কেন লোকালয়ে?’—প্রশ্নটা আরও বড়: আমরা কি তাদের জন্য বনের ভেতর নিরাপদ কোনো জায়গা আদৌ রেখে দিচ্ছি?

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

জঙ্গল ছেড়ে লোকালয়ে বিষধর সাপ, খাদ্যসংকট ও সংকুচিত আবাসস্থলই কি কারণ?

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০৫:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

গভীর জঙ্গলে থাকার কথা যাদের, সেই অজগর এখন নিয়মিত ঢুকে পড়ছে মানুষের বসতবাড়ি, খামার, বাঁশঝাড় ও চা-বাগানে। সিলেট বিভাগের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে বিষধর সাপসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণীর লোকালয়ে চলে আসার ঘটনা বাড়লেও সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে মৌলভীবাজারের অজগর।

বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের বনসংলগ্ন এলাকায় ১২ থেকে ১৮ ফুট দীর্ঘ অজগরের ঘন ঘন উপস্থিতি স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। কখনো বাড়ির আঙিনায়, কখনো হাঁস-মুরগির খামারে, আবার কখনো চা-বাগান কিংবা হাইল হাওড়ের আশপাশে দেখা মিলছে বিশাল আকৃতির এসব সাপের।

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু সাপের লোকালয়ে ঢুকে পড়ার ঘটনা নয়; বরং বনাঞ্চলের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ, খাদ্যসংকট ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে যাওয়ার একটি সতর্ক সংকেত।

দুই মাসে উদ্ধার ১০ অজগর

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, বন বিভাগ ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন ও জুলাই—এই দুই মাসে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ১০টি অজগর উদ্ধার করা হয়েছে।

উদ্ধার হওয়া অজগরগুলোর দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১২ থেকে ১৮ ফুট। ওজন ছিল ২০ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত।

তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকা থেকে চারটি অজগর উদ্ধার করা হয়। এরপর ৯ জুলাই ভূরভূড়িছড়া চা-বাগান থেকে একটি, ১৬ জুলাই ভাড়াউড়া চা-বাগান ও সিন্দুরখান এলাকা থেকে দুটি, ২১ জুলাই উত্তর ভাড়াউড়া এলাকা থেকে একটি এবং ২৮ জুলাই কমলগঞ্জের ফুলবাড়ী চা-বাগান ও শ্রীমঙ্গলের জাগছড়া চা-বাগান থেকে আরও দুটি অজগর উদ্ধার করা হয়।

প্রতিবারই সাপের উপস্থিতি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে বন বিভাগ ও বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের উদ্ধারকর্মীরা সাপগুলো উদ্ধার করে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবমুক্ত করেন।

ভেঙে পড়ছে বনের খাদ্যশৃঙ্খল

বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবকদের মতে, একসময় লাউয়াছড়া ও আশপাশের বনাঞ্চলে হরিণসহ বিভিন্ন ছোট বন্যপ্রাণীর দেখা মিলত। এখন অনেক প্রজাতির প্রাণীই আগের মতো চোখে পড়ে না। অথচ লোকালয়ে প্রায়ই দেখা যাচ্ছে বিশাল আকৃতির অজগর।

ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য চঞ্চল গোয়ালা বলেন, বনের খাদ্যশৃঙ্খল ক্রমেই ভেঙে পড়ছে। অজগরের প্রধান খাদ্যের মধ্যে রয়েছে ইঁদুর, পাখি, বনমোরগ ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী। এসব প্রাণীর সংখ্যা কমে গেলে অজগর খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ের দিকে চলে আসতে বাধ্য হয়।

তিনি বলেন, লোকালয়ে অজগর সহজেই হাঁস-মুরগি কিংবা গৃহপালিত প্রাণীকে শিকার হিসেবে পেয়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন মানুষ আতঙ্কিত হচ্ছে, অন্যদিকে বন্যপ্রাণীও মানুষের হাতে প্রাণ হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে।

সংকুচিত হচ্ছে অজগরের আবাসস্থল

সিলেট বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোর একটি লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। জীববৈচিত্র্য ও বিরল বন্যপ্রাণীর জন্য পরিচিত এই বনাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে অজগর, বানর, মেছোবাঘ, গন্ধগোকুল, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ও পাখির গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল।

তবে স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, বনভূমি দখল, অবৈধ জনবসতি, বিভিন্ন বাণিজ্যিক বাগানের সম্প্রসারণ এবং মূল্যবান বৃক্ষ নিধনের কারণে বনের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

ফলে শুধু অজগর নয়, অন্যান্য বন্যপ্রাণীরও বিচরণক্ষেত্র ও খাদ্যের উৎস কমে যাচ্ছে। নিরাপদ আশ্রয় ও খাবারের সন্ধানে তারা লোকালয়, চা-বাগান এবং সড়কের কাছাকাছি চলে আসছে।

সড়ক-রেলপথেও বাড়ছে ঝুঁকি

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের সংযোগ সড়ক চলে গেছে। একইভাবে ঢাকা-সিলেট-চট্টগ্রাম রেললাইনও বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে গেছে।

বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের ভাষ্য, বনের এক অংশ থেকে অন্য অংশে যেতে গিয়ে প্রাণীগুলোকে প্রায়ই সড়ক ও রেললাইন পার হতে হয়। এ সময় যানবাহন কিংবা ট্রেনের ধাক্কায় সাপ, গন্ধগোকুল, বানরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে।

এতে বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।

বৃষ্টির পানিতেও আশ্রয় বদলাচ্ছে অজগর

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও বনের ছড়াগুলোতে পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়াও অজগরের লোকালয়ে চলে আসার একটি কারণ হতে পারে।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের মৌলভীবাজার রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় বনের ছড়াগুলোতে পানির প্রবাহ বেড়েছে। এ কারণে অজগর লোকালয়ের দিকে চলে আসছে। চা-বাগানও তাদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করছে।

তিনি জানান, অজগর বা কোনো বন্যপ্রাণী লোকালয়ে দেখা গেলে আতঙ্কিত না হয়ে বন বিভাগকে খবর দিতে হবে। জনসচেতনতা বাড়াতেও বন বিভাগের পক্ষ থেকে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

বন দখল নিয়ে উদ্বেগ

চলতি বছরের এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মজিবুর রহমান চৌধুরী লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও আশপাশের বনাঞ্চল পরিদর্শন করেন। এ সময় বনভূমি দখল করে অবৈধ বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ ও বন উজাড়ের ঘটনায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তিনি দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া, দখলকৃত বনভূমি উদ্ধার এবং লাউয়াছড়ার জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।

শুধু অজগর উদ্ধার করলেই কি সমাধান?

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই মাসে ১০টি অজগর উদ্ধার নিছক কয়েকটি উদ্ধার অভিযানের পরিসংখ্যান নয়। এটি লাউয়াছড়া ও আশপাশের বনাঞ্চলের পরিবেশগত পরিবর্তনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

লোকালয়ে চলে আসা অজগর উদ্ধার করে আবার বনে ছেড়ে দেওয়া প্রয়োজনীয় উদ্যোগ হলেও, এটিকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং কেন প্রাণীগুলো বারবার লোকালয়ে আসছে, সেই কারণগুলো চিহ্নিত করাই জরুরি।

বনভূমি দখল বন্ধ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, প্রাকৃতিক আবাসস্থল পুনরুদ্ধার, বন্যপ্রাণীর খাদ্যের উৎস সংরক্ষণ এবং সড়ক-রেলপথে প্রাণী চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

তা না হলে একদিকে যেমন মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর সংঘাত বাড়বে, অন্যদিকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্যও আরও বড় সংকটের মুখে পড়বে।

লাউয়াছড়ার জঙ্গলে অজগরের জায়গা ছিল বনের গভীরে। সেই অজগর যখন মানুষের উঠানে এসে আশ্রয় খুঁজছে, তখন প্রশ্নটা শুধু ‘সাপ কেন লোকালয়ে?’—প্রশ্নটা আরও বড়: আমরা কি তাদের জন্য বনের ভেতর নিরাপদ কোনো জায়গা আদৌ রেখে দিচ্ছি?