ঢাকা ১১:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জিয়া হত্যাকাণ্ড তদন্তে ব্যক্তিগত সচিবের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, প্রকাশ্যে ৪৫ বছর আগের কমিশন প্রতিবেদন

বিশেষ প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৪:০৭:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬ ১৯ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর গঠিত তদন্ত কমিশনের দীর্ঘদিন গোপন থাকা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ্যে এসেছে। ১৯৮১ সালের ওই তদন্ত প্রতিবেদনের একটি মুদ্রিত কপি হাতে পাওয়ার দাবি করেছে ডেইলি স্টার। প্রতিবেদনে জিয়ার ব্যক্তিগত সচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু ইউসুফ মো. মাহফুজুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নিহত হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। হত্যাকাণ্ডের পর গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সার্কিট হাউসে অবস্থানকালে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত স্টাফদের একজন বা একাধিক সদস্যের কারণে তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছিল বলে বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিশেষ করে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজুর রহমানের কর্মকাণ্ডকে সন্দেহজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার সময় মাহফুজুর রহমান অক্ষত থাকলেও রাষ্ট্রপতির প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল এএফএম মইনুল আহসান এবং প্রেসিডেন্টস গার্ড রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খান ঘটনাস্থলেই নিহত হন। প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়, একই পরিস্থিতিতে অন্য দুই কর্মকর্তা নিহত হলেও মাহফুজুর রহমান কীভাবে সম্পূর্ণ অক্ষত থাকলেন।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, মাহফুজুর রহমানের কক্ষের দেয়ালে পাওয়া গুলির চিহ্ন নিয়ে তার দেওয়া ব্যাখ্যার সঙ্গে তদন্তকারীদের পর্যবেক্ষণের মিল পাওয়া যায়নি। পুলিশের বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে কমিশনের ধারণা, ওই গুলির চিহ্ন বাইরে থেকে সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম এবং সেগুলো মনগড়া হতে পারে।

রাষ্ট্রপতির এইড-ডি-ক্যাম্প (এডিসি) ক্যাপ্টেন মাজহারুল হকের ভূমিকাও প্রতিবেদনে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। কমিশনের মতে, তার কক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির কক্ষে যাওয়ার একটি সংযোগকারী দরজা থাকা সত্ত্বেও তিনি সেটি ব্যবহারের চেষ্টা করেননি। এমনকি ওই দরজার অস্তিত্ব সম্পর্কেও তিনি অবগত ছিলেন না বলে জানান, যা তদন্তকারীদের বিস্মিত করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার সময় মাহফুজুর রহমান ও ক্যাপ্টেন মাজহার দুজনই নিজ নিজ কক্ষে অবস্থান করেন এবং দীর্ঘ সময় বাইরে বের হওয়ার কোনো চেষ্টা করেননি। কমিশনের মতে, রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের এমন আচরণ তাদের দায়িত্ববোধ ও আনুগত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

তদন্তে আরও উঠে আসে, ঘটনার আগের রাতে মাহফুজুর রহমান সার্কিট হাউসে কে কোন কক্ষে অবস্থান করছেন তার একটি টাইপ করা তালিকা সংগ্রহ করেন, যা অতীতে কখনো করেননি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির কক্ষের সামনে মোতায়েন থাকা দুই হাউস গার্ডকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির মরদেহ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তোলে কমিশন। প্রতিবেদনে বলা হয়, হত্যাকাণ্ডের পর বিদ্রোহী সেনারা রাষ্ট্রপতির মরদেহ ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়, অথচ দীর্ঘ সময় তা কার্যত অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে ছিল। এ সময় সেনা সদর দপ্তরের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ কিংবা দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও মাহফুজুর রহমানের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করা হয়।

প্রতিবেদনে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মেজর মুজিবুর রহমানের ভূমিকাও সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছে। কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ঘটনার আগে সার্কিট হাউসে তার উপস্থিতির কোনো যৌক্তিক কারণ ছিল না এবং সেটিকে সম্ভাব্য গোয়েন্দা তৎপরতা বা রেকির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

প্রতিবেদনটি জমা দেওয়ার আগেই সামরিক আদালতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজুর রহমান ও মেজর মুজিবুর রহমান দোষী সাব্যস্ত হন। পরে ১৯৮১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

জিয়া হত্যাকাণ্ড তদন্তে ব্যক্তিগত সচিবের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, প্রকাশ্যে ৪৫ বছর আগের কমিশন প্রতিবেদন

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৪:০৭:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর গঠিত তদন্ত কমিশনের দীর্ঘদিন গোপন থাকা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ্যে এসেছে। ১৯৮১ সালের ওই তদন্ত প্রতিবেদনের একটি মুদ্রিত কপি হাতে পাওয়ার দাবি করেছে ডেইলি স্টার। প্রতিবেদনে জিয়ার ব্যক্তিগত সচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু ইউসুফ মো. মাহফুজুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নিহত হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। হত্যাকাণ্ডের পর গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সার্কিট হাউসে অবস্থানকালে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত স্টাফদের একজন বা একাধিক সদস্যের কারণে তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছিল বলে বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিশেষ করে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজুর রহমানের কর্মকাণ্ডকে সন্দেহজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার সময় মাহফুজুর রহমান অক্ষত থাকলেও রাষ্ট্রপতির প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল এএফএম মইনুল আহসান এবং প্রেসিডেন্টস গার্ড রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খান ঘটনাস্থলেই নিহত হন। প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়, একই পরিস্থিতিতে অন্য দুই কর্মকর্তা নিহত হলেও মাহফুজুর রহমান কীভাবে সম্পূর্ণ অক্ষত থাকলেন।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, মাহফুজুর রহমানের কক্ষের দেয়ালে পাওয়া গুলির চিহ্ন নিয়ে তার দেওয়া ব্যাখ্যার সঙ্গে তদন্তকারীদের পর্যবেক্ষণের মিল পাওয়া যায়নি। পুলিশের বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে কমিশনের ধারণা, ওই গুলির চিহ্ন বাইরে থেকে সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম এবং সেগুলো মনগড়া হতে পারে।

রাষ্ট্রপতির এইড-ডি-ক্যাম্প (এডিসি) ক্যাপ্টেন মাজহারুল হকের ভূমিকাও প্রতিবেদনে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। কমিশনের মতে, তার কক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির কক্ষে যাওয়ার একটি সংযোগকারী দরজা থাকা সত্ত্বেও তিনি সেটি ব্যবহারের চেষ্টা করেননি। এমনকি ওই দরজার অস্তিত্ব সম্পর্কেও তিনি অবগত ছিলেন না বলে জানান, যা তদন্তকারীদের বিস্মিত করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার সময় মাহফুজুর রহমান ও ক্যাপ্টেন মাজহার দুজনই নিজ নিজ কক্ষে অবস্থান করেন এবং দীর্ঘ সময় বাইরে বের হওয়ার কোনো চেষ্টা করেননি। কমিশনের মতে, রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের এমন আচরণ তাদের দায়িত্ববোধ ও আনুগত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

তদন্তে আরও উঠে আসে, ঘটনার আগের রাতে মাহফুজুর রহমান সার্কিট হাউসে কে কোন কক্ষে অবস্থান করছেন তার একটি টাইপ করা তালিকা সংগ্রহ করেন, যা অতীতে কখনো করেননি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির কক্ষের সামনে মোতায়েন থাকা দুই হাউস গার্ডকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির মরদেহ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তোলে কমিশন। প্রতিবেদনে বলা হয়, হত্যাকাণ্ডের পর বিদ্রোহী সেনারা রাষ্ট্রপতির মরদেহ ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়, অথচ দীর্ঘ সময় তা কার্যত অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে ছিল। এ সময় সেনা সদর দপ্তরের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ কিংবা দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও মাহফুজুর রহমানের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করা হয়।

প্রতিবেদনে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মেজর মুজিবুর রহমানের ভূমিকাও সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছে। কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ঘটনার আগে সার্কিট হাউসে তার উপস্থিতির কোনো যৌক্তিক কারণ ছিল না এবং সেটিকে সম্ভাব্য গোয়েন্দা তৎপরতা বা রেকির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

প্রতিবেদনটি জমা দেওয়ার আগেই সামরিক আদালতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজুর রহমান ও মেজর মুজিবুর রহমান দোষী সাব্যস্ত হন। পরে ১৯৮১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।