রাষ্ট্রপতি চাই আনুগত্যের নয়, যোগ্যতার প্রতীক

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৫:৫৩:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬ ১৪ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাতীয় সংসদে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
জাতীয় সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটি যাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেবে, তিনিই পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দলটির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা ও সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে।
এদিকে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, জাতীয় সংসদের পরবর্তী অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সঙ্গে বৈঠক করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে প্রজাতন্ত্রের প্রধান এবং দেশের প্রথম নাগরিক হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ৪৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের অন্য সব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রপতির স্থান।
তবে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে রাষ্ট্রপতির পদটি কখনোই প্রত্যাশিত মর্যাদা ও কার্যকর ভূমিকা পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি। সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান ও প্রধান নির্বাহী হওয়ায় রাষ্ট্রপতির পদটি অনেকটা আনুষ্ঠানিক ও প্রতীকী হয়ে পড়েছে। বর্তমান সংবিধানেও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে প্রায় সব বিষয়েই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে হয়। বাস্তবেও এই দুই ক্ষেত্রেও কোনো রাষ্ট্রপতি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দৃষ্টান্ত খুব বেশি নেই।
সাবেক রাষ্ট্রপতি ও দেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান বিচারপতি মো. সাহাবুদ্দীন আহমদ একবার রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘কবর জিয়ারত ছাড়া রাষ্ট্রপতির কোনো কাজ নেই।’ কথাটির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি পদের আনুষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার একটি বাস্তব চিত্রই ফুটে ওঠে। সংসদে ভাষণ দেওয়া থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতির অধিকাংশ সাংবিধানিক ও আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমই সরকারের সিদ্ধান্ত ও পরামর্শের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
কিন্তু রাষ্ট্রপতিকে শুধু ক্ষমতাহীন আনুষ্ঠানিক পদ হিসেবে দেখলে বিষয়টির পুরোটা বোঝা যায় না। সংবিধানের কাঠামো ও রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ও সাংবিধানিক ভূমিকা রয়েছে। তিনি রাষ্ট্রের ঐক্য, সংহতি ও ধারাবাহিকতার প্রতীক। বিশেষ করে রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক সংকটের মুহূর্তে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিত্ব, বিচক্ষণতা ও গ্রহণযোগ্যতা বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে। একজন দৃঢ়চেতা, দায়িত্বশীল ও প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্রপতি গণতন্ত্র এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার অন্যতম রক্ষাকবচ হয়ে উঠতে পারেন।
এ কারণেই রাষ্ট্রপতি পদে আমরা এমন কাউকে দেখতে চাই না, যিনি কেবল ক্ষমতাসীনদের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেই এই পদে আসীন হবেন। চাই না কোনো মেরুদণ্ডহীন, আজ্ঞাবহ বা স্তাবককে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসানো হোক। জনগণ এমন একজন রাষ্ট্রপতি প্রত্যাশা করে, যিনি আদর্শবান, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, অভিজ্ঞ এবং সর্বমহলে সম্মানিত। দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে যিনি জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে পারবেন এবং সংকটের সময়ে সবার আস্থার জায়গা হয়ে উঠবেন।
এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন তাই বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। এর অন্যতম কারণ, দেশে আবারও নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থা ফিরে এসেছে। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হওয়ার কথা। একটি নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে উঠতে পারে। এ সময় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য, অবিশ্বাস ও সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
এমন একটি সময়ে যদি রাষ্ট্রপতির পদে এমন একজন ব্যক্তিত্ব থাকেন, যাঁর প্রতি সব রাজনৈতিক দলের আস্থা রয়েছে, তাহলে যেকোনো সংকট মোকাবিলা অনেক সহজ হতে পারে। রাষ্ট্রপতির কাছে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে পারে। পারস্পরিক সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের পথও খুঁজে বের করা সম্ভব। ফলে আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্যও এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা পুনর্বিন্যাসের সম্ভাবনা। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতামত উঠে এসেছে। বিএনপিও এ বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছে বলে জানা গেছে। ভবিষ্যতে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো হলে এই পদটি আর কেবল আনুষ্ঠানিক থাকবে না; রাষ্ট্রপতিকে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হতে পারে। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি পদে একজন অভিজ্ঞ, বিচক্ষণ, সৎ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তির প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে যাবে।
আমরা সাধারণ মানুষ এমন একজন রাষ্ট্রপতি চাই, যিনি সত্যিকার অর্থেই জাতির অভিভাবকের ভূমিকা পালন করবেন। কাউকে রাজনৈতিক পুরস্কার বা সান্ত্বনা হিসেবে বঙ্গভবনে পাঠিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি আমরা দেখতে চাই না। রাষ্ট্রপতি পদকে তিনি একটি পবিত্র সাংবিধানিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করবেন—এটাই প্রত্যাশা। সংবিধান, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও জনগণের অধিকার রক্ষায় তিনি সর্বদা সচেতন থাকবেন।
রাষ্ট্রপতির পদ যেন ব্যক্তিগত ভ্রমণ, আনুষ্ঠানিকতা কিংবা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগের উপলক্ষ না হয়ে ওঠে। জনগণের অর্থে পরিচালিত এই গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন একজনকে প্রয়োজন, যাঁর জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা রয়েছে এবং যিনি রাষ্ট্রের দায়িত্বকে ব্যক্তিগত মর্যাদা বা আরাম-আয়েশের চেয়ে বড় করে দেখবেন।
জনগণ এমন একজন রাষ্ট্রপতিও চায় না, যাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচিতি এতটাই অপ্রতুল যে তাঁর নাম ঘোষণার পর মানুষকে তাঁর পরিচয় খুঁজে বের করতে হবে। রাষ্ট্রপতি এমন একজন হবেন, যিনি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা জাতীয় জীবনের অবদানের মাধ্যমে নিজের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছেন। তাঁর পরিচিতি ও সম্মান যেন কেবল দলীয় আনুগত্যের কারণে নয়, নিজস্ব যোগ্যতা ও কর্মের মাধ্যমে অর্জিত হয়।
সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে এমন একজন সৎ, আদর্শবান ও বিতর্কমুক্ত ব্যক্তিকে নির্বাচিত করা উচিত, যাঁর প্রতি দেশের মানুষের আস্থা রয়েছে। অতীতে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে—এমন কাউকে রাষ্ট্রপতি পদে বিবেচনা করার আগে অবশ্যই বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
দেশের মানুষ এমন রাষ্ট্রপতি প্রত্যাশা করে, যিনি দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবেন। গণতন্ত্রের ওপর কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তির আঘাত এলে তিনি নীরব থাকবেন না। অসাংবিধানিক চাপ বা অন্যায়ের কাছে নতি স্বীকার না করে সংবিধান ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষায় দৃঢ় ভূমিকা রাখবেন।
এ দেশের মানুষ অতীতে তথাকথিত অরাজনৈতিক ও জনবিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর অভিজ্ঞতাও পেয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা সবসময় সুখকর হয়নি। তাই এবার জনগণের প্রত্যাশা, রাষ্ট্রপতি হবেন এমন একজন, যিনি জনগণের কাছ থেকে উঠে এসেছেন, রাজনীতির বাস্তবতা বোঝেন এবং গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘদিন সংগ্রাম করেছেন। তৃণমূল থেকে জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করা, জনগণের অধিকার ও আইনের শাসনের পক্ষে ভূমিকা রাখা এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ত্যাগ স্বীকার করা একজন রাজনীতিক এ পদে অধিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্রপতির পদটি আরও মর্যাদাপূর্ণ হবে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। অতীতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও রাষ্ট্রপতি পদের অভিজ্ঞতা থেকে বিএনপির নিশ্চয়ই অনেক কিছু শেখার আছে। ক্ষমতাসীনদের সব সিদ্ধান্তে নিঃশর্ত সম্মতি দেওয়া এবং প্রশ্নহীন আনুগত্য দেখানো ব্যক্তির হাতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ গেলে সেই পদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হতে পারে—এ বাস্তবতা বিএনপির অজানা নয়।
যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্যকে প্রাধান্য দিয়ে কাউকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর পরিণতি অতীতে দেশের মানুষ বহুবার দেখেছে। সুবিধাবাদী ও চাটুকারদের দিয়ে সাময়িকভাবে রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে তা কোনো দল, জনগণ কিংবা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্যই কল্যাণকর নয়।
তাই এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিএনপি নিশ্চয়ই দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে। ধীরে-সুস্থে, যথেষ্ট যাচাই-বাছাই করে এমন একজন যোগ্য, সৎ, অভিজ্ঞ, ব্যক্তিত্ববান ও সর্বজনগ্রহণযোগ্য মানুষকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নেওয়া হবে—এটাই দেশের মানুষের প্রত্যাশা। কারণ এই দেশে যোগ্য মানুষের কোনো অভাব নেই; প্রয়োজন শুধু যোগ্য ব্যক্তিকে খুঁজে নেওয়ার সদিচ্ছা।





















