কক্সবাজারে কেন বাড়ছে পাহাড় ধস? গবেষণায় উঠে এলো ভয়াবহ চিত্র

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৫৮:০৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে
কক্সবাজার দেশের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ জেলা। একসময় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস ছিল এ অঞ্চলের প্রধান প্রাকৃতিক ঝুঁকি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বর্ষা এলেই নতুন আতঙ্ক হয়ে উঠেছে পাহাড়ধস। প্রতি বছরই প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে, আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন—প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানুষের অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ডই এই ঝুঁকিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
গবেষণা যা বলছে
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত কক্সবাজারে ১২৪টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। ফলে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পর কক্সবাজারও এখন দেশের অন্যতম পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকায় পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. নিগার সুলতানার ২০২২ সালের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ১১টি পাহাড়ধস ঘটে। এতে গড়ে ৩৪ জন নিহত এবং ৫৪ জন আহত হন। জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়কে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মৌসুম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক দুর্যোগে বেড়েছে উদ্বেগ
জেলা প্রশাসন ও জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণে অন্তত ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১৫ জনই রোহিঙ্গা। একই সময়ে জেলার বিভিন্ন এলাকা ও আশ্রয়শিবিরে কমপক্ষে ১২০টি ভূমিধসের ঘটনা ঘটে।
কেন ধসে পড়ে পাহাড়?
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল সরোয়ার জানান, কক্সবাজারের পাহাড় মূলত টারশিয়ারি যুগের পাললিক শিলা ও বেলে মাটি দিয়ে গঠিত। বৃষ্টির পানি বেলেপাথরের স্তর ভেদ করে নিচের শেল স্তরে জমে গেলে সেই স্তর পিচ্ছিল হয়ে পড়ে। ফলে পাহাড়ের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে ধসের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
তার মতে, টানা দুই থেকে সাত দিন দৈনিক ৪০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হলে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে ফাটল দিয়ে পানি প্রবেশ করে অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়িয়ে দেয়। একপর্যায়ে পাহাড় ধসে পড়ে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, কক্সবাজারে বছরে প্রায় ৩ হাজার মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, যার বড় অংশ জুন ও জুলাই মাসে। পাশাপাশি পাহাড়ের ঢাল যত বেশি খাড়া, ধসের আশঙ্কাও তত বাড়ে।
ঝুঁকিতে হাজারো মানুষ
চবির গবেষণা অনুযায়ী, কক্সবাজারের ১০টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে প্রায় ১২ হাজার মানুষ বসবাস করছেন। মহেশখালীর ২২টি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রায় ৮ হাজার মানুষ এবং টেকনাফের ২৩টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ পরিবার, যার মধ্যে অন্তত ২৩০টি পরিবার অত্যন্ত ঝুঁকিতে।
বন বিভাগের তথ্য বলছে, জেলার অন্তত ২০ হাজার স্থানীয় পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢালে বসবাস করছে। পাশাপাশি উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসরত প্রায় এক লাখ মানুষ সরাসরি ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. অলক পাল বলেন, কক্সবাজারে দ্রুত নগরায়ণের ফলে পাহাড়ি এলাকায় ঘনবসতি গড়ে উঠেছে। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার অভাবেই ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।
নির্বিচারে পাহাড় কাটাই বড় কারণ
গবেষণায় উঠে এসেছে, আবাসন, সড়ক নির্মাণ ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য দীর্ঘদিন ধরে নির্বিচারে পাহাড় কাটা হচ্ছে। এতে পাহাড়ের স্বাভাবিক ঢাল নষ্ট হচ্ছে, মাটির দৃঢ়তা কমছে এবং বনাঞ্চল ধ্বংস হচ্ছে।
অধ্যাপক ইকবাল সরোয়ার বলেন, সাধারণত ৪০ ডিগ্রির বেশি ঢাল ঝুঁকিপূর্ণ হলেও কক্সবাজারের অনেক স্থানে পাহাড় প্রায় ৯০ ডিগ্রি কোণে কাটা হয়েছে, যা পাহাড়কে অত্যন্ত অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
এছাড়া কক্সবাজার ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের কাছাকাছি হওয়ায় ছোট ছোট ভূমিকম্পেও পাহাড়ের ভেতরে সূক্ষ্ম ফাটল তৈরি হতে পারে। বর্ষায় সেই ফাটল দিয়ে পানি ঢুকে ধসের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাব
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি করে উচ্ছেদের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এবং গত দুই বছরে পাহাড় কাটার অভিযোগে ২৫৩টি মামলা করা হয়েছে। তবে অনেক মানুষ সতর্কতা সত্ত্বেও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছাড়তে চান না।
অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, পাহাড় কাটা ও পাহাড়ধস ঠেকাতে অভিযান পরিচালনা করা হলেও এখনো সমন্বিত পাহাড় ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি।
কী করণীয়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ধসের ঝুঁকি কমাতে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন—
- অবৈধ পাহাড় কাটা ও বন উজাড় সম্পূর্ণ বন্ধ করা।
- ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি।
- পাহাড়ের পাদদেশে নতুন বসতি নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ।
- বর্ষার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া।
- পাহাড়ে কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
- স্থানীয় প্রজাতির গাছ লাগানো এবং প্রয়োজনীয় স্থানে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ।
- পরিবেশ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং ড্রোন বা সিসিটিভির মাধ্যমে পাহাড় কাটা পর্যবেক্ষণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু উদ্ধার তৎপরতা নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর পাহাড় ব্যবস্থাপনাই কক্সবাজারে প্রাণঘাতী পাহাড়ধসের ঝুঁকি কমানোর একমাত্র টেকসই সমাধান।





















