টাঙ্গাইল বাস টার্মিনাল
পাঁচ বছর আগে জমি বরাদ্দ, কাজের অগ্রগতি সীমিত

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৯:০৬:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে
টাঙ্গাইল শহরের কোদালিয়া এলাকায় আশির দশকে নির্মিত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই এখনও চলছে টাঙ্গাইল পৌর বাস টার্মিনালের কার্যক্রম। ২০১৩ সালে টার্মিনাল ভবনকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেও এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন টার্মিনাল নির্মাণ বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে প্রতিদিন হাজারো যাত্রী চরম ঝুঁকি ও ভোগান্তির মধ্যেই সেবা নিচ্ছেন।
অন্যদিকে আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণের জন্য প্রায় ৫ একর সরকারি খাস জমি ২০২২ সালে ৩০ বছরের লিজে বরাদ্দ পেলেও প্রকল্পটি এখনও মূল কাঠামো নির্মাণে পৌঁছাতে পারেনি। পাঁচ বছর পার হলেও জমিতে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই, বরং ধীরগতির মাটি ভরাট নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
পাঁচ বছর আগে জমি বরাদ্দ, কাজের অগ্রগতি সীমিত
টাঙ্গাইল পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ৪ জুলাই ১ লাখ ১ হাজার টাকা মূল্যের দলিলের মাধ্যমে সদর উপজেলার গালা ইউনিয়নের মাগুরাটা মৌজা ও পৌরসভার এনায়েতপুর মৌজায় ৪.৯৪ একর সরকারি খাস জমি ৩০ বছরের জন্য লিজ নেয় পৌরসভা। উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বাস টার্মিনাল নির্মাণ।
পৌরসভা আরও জানায়, ২০২৬ সালের ৩ মে জলাভূমি ভরাটের কাজ শুরু করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত কাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে এগিয়েছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, এখন পর্যন্ত মাত্র কয়েক ট্রাক মাটি ফেলা হয়েছে, বাকি অংশে ময়লা-আবর্জনা দিয়েই ভরাটের চেষ্টা চলছে।
নির্ধারিত দরপত্র শর্ত অনুযায়ী ৩০ জুন ২০২৬-এর মধ্যে মাটি ভরাট শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
মাঠপর্যায়ে বাস্তবতা: কাজ থমকে আছে, নেই সুনির্দিষ্ট সময়সীমা
সরেজমিনে দেখা গেছে, নির্ধারিত স্থানে আংশিক মাটি ফেলা হলেও বড় অংশ এখনো অসম্পূর্ণ। ড্রেনেজ ব্যবস্থার কাজও শুরু হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাটি ভরাটের কাজ শুরু হলেও দীর্ঘ সময় ধরে তা কার্যত স্থবির অবস্থায় রয়েছে।
একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, জমিটি জলাভূমি হওয়ায় প্রচুর মাটি প্রয়োজন। মাটি ভরাট শেষ না হলে ড্রেনেজ ও অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করা সম্ভব নয়। তবে কাজের নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারেননি তিনি।
স্থানীয়দের ক্ষোভ: “ঘোষণা আছে, কাজ নেই”
রাবনা এলাকার সুভাষ চন্দ্র দাস, মাজম মিয়া ও আকবর আলী তালুকদার জানান, ৫ বছর যাবত শুনছি এখানে আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে, তবে কাজির গরু যেমন খাতায় থাকে, গোয়ালে থাকে না, তেমনি টাঙ্গাইল পৌরসভা ঢাকঢোল পিটিয়ে বাস টার্মিনাল নির্মাণ এর ঘোষনা দিলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। মাত্র ৭ ট্রাক মাটি ফেলা হয়েছে। অবিলম্বে আধুনিক বাস টার্মিনালের মূল ভবনের নির্মাণের কাজ শুরু করার জোর দাবী জানাচ্ছি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাস শ্রমিক নেতার সাথে কথা হয় রাবনা এলাকায় তিনি বলেন “প্রতিদিন মাথার উপর ছাউনি ভেঙে পড়ার ভয় নিয়ে কাজ করি নতুন বাস স্ট্যান্ড ভবনে। যাত্রীরাও আতঙ্কে থাকে। রাবনা বাইপাসের কাছে নতুন টার্মিনালের কথা শুনে আসছি, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই দেখি না। টাঙ্গাইল শহরের প্রাণকেন্দ্র পুরাতন বাস টার্মিনালটি নির্মিত হয় আশির দশকে। ২০১৩ সালে তৎকালীন পৌর মেয়র টার্মিনালের ছাউনিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্ত’ ঘোষণা করেন। এরপর এক যুগ কেটে গেলেও নতুন ভবন হয়নি।
পুরোনো টার্মিনালেই চলছে কার্যক্রম, ঝুঁকি চরমে
টাঙ্গাইল শহরের কোদালিয়ায় নির্মিত পুরোনো টার্মিনাল ভবনটি ২০১৩ সালে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হলেও এখনও সেখানেই কার্যক্রম চলছে। ভাঙা টিন, ফাটল ধরা পিলার এবং জরাজীর্ণ অবকাঠামোর নিচে দাঁড়িয়ে থাকে দূরপাল্লার বাসগুলো।
বর্ষায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলে জানান যাত্রীরা। পর্যাপ্ত বসার জায়গা, পরিষ্কার টয়লেট ও পানির সংকটও নিয়মিত অভিযোগ।
একজন যাত্রী বলেন, “টার্মিনালে বসার জায়গা নেই, টয়লেট অস্বাস্থ্যকর, পানি নেই। দ্রুত নতুন টার্মিনাল হলে স্বস্তি মিলত।”
নারী যাত্রীদের ভোগান্তি বেশি
জামালপুরগামী সরকারি চাকুরে রাবেয়া খাতুন রাব্বানী বলেন, টার্মিনালে মহিলাদের জন্য কোন পৃথক টয়লেট নেই, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা তো অনেক দুরের কথা। ফলে মহিলা ও শিশুদের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টির গুরুত্ব সহকারে অনুধাবন করে প্রস্তাবিত আধুনিক বাস টার্মিনালিটির নির্মাণ কাজ দ্রুত সম্পন্ন করবেন।
যানজট ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় চাপ
টাঙ্গাইল সচেতন নাগরিক সমাজের সভাপতি অকিবুর রহমান ইকবাল জানান, টাঙ্গাইল জেলা সদর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন হাব। এখানে আধুনিক বাস টার্মিনাল না থাকায় শহরের যানজট বাড়ছে, পাশাপাশি যাত্রী নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে। তাই দ্রুত মাটি ভরাট শেষ করে আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণের কাজ শুরু করার দাবি জানাচ্ছি।
টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মাহমুদুল হক সানু বলেন, ১৯৮১ সালের ৩১ ডিসেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মরহুম বিচারপতি আব্দুর সাত্তার বর্তমান নতুন বাসস্ট্যান্ডের টার্মিনাল ভবনটি উদ্বোধন করেন। ভবনটি ২০১৩ সালে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে এই পরিত্যক্ত ভবনেই যাত্রী সেবা সহ টার্মিনালের যাবতীয় কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করা হচ্ছে। যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রশাসনের বক্তব্য: কাজ শেষ হলে পরের ধাপ
টাঙ্গাইল পৌর প্রশাসক ও উপ-পরিচালক (স্থানীয় সরকার) সঞ্জয় কুমার মহন্ত জানান, মাটি ভরাট ও ড্রেনেজ কাজের দরপত্র আহ্বান করা হলেও ঠিকাদারি জটিলতা ও সময়সীমা পার হওয়ায় কাজ নবায়নের আবেদন করা হয়েছে। এসব কাজ শেষ হলে মূল ভবনের নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হবে।
তিনি আরও জানান, প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে, তবে নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনই বলা যাচ্ছে না।



















