ঢাকা ০৪:৫৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
আর্জেন্টিনার ৭ মিনিটের ঝড় সামলাতে পারল না ইংল্যান্ড ব‍্যর্থ ইংল্যান্ড, ফের শেষ বেলায় বাজিমাত আর্জেন্টিনার মাসে তিনবারের বেশি টাকা তুললে দিতে হবে অতিরিক্ত ফি শিগগিরই ১০ হাজার পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ, জানালেন প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজারে কেন বাড়ছে পাহাড় ধস? গবেষণায় উঠে এলো ভয়াবহ চিত্র হত্যার পর ড্রেনে স্কুলছাত্রীর লাশ, যুবককে ফাঁসির দণ্ড আইসিসির ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগস কমিটির চেয়ারম্যান হলেন তামিম ইকবাল বিশ্বকাপ ফাইনালে হাফটাইম শো, দীর্ঘ বিরতিতে প্রশ্ন ফুটবলারদের প্রস্তুতি নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রেও আকাশছোঁয়া আয়, ফিফা সভাপতির বেতন কত? শাহবাগের অবরোধ প্রত্যাহার, শিক্ষার্থীদের আলটিমেটাম

নির্বাক চোখ খুঁজে বেড়ায়! মাকে এনে দেবে কে?

কুমিল্লা প্রতিনিধি
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:৫০:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ জুলাই ২০২৫ ১৩১ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাকশক্তিহীন জুনায়েদ। কুমিল্লার মুরাদনগর ৩ খুনের ঘটনায় নিহত জোনাকির ছেলে।কুমিল্লার চিপ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গনে আসে খালামনি রিক্তার সাথে। তখন রিক্তার কান্নায় আদালত প্রাঙ্গণ ভারি হয়ে উঠে। গণমাধ্যম কর্মীরা ক্যামেরা তাক করে রেখেছে তাদের দিকে।

জুনায়েদের অবুঝ মুখ যেনো কিছুই বুঝতে পারছে না। খালামনির গা জড়িয়ে ফেল ফেল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । নির্বাক ঠোঁট যেনো কিছু একটা বলতে চায়, তবে বলতে পারছেনা;কিভাবে বলবে সে যে কথা বলতে অক্ষম। কিন্তু তার টলটলে দু’ চোখ যেনো কিছু একটা টের পেয়েছে। আতঙ্কিত চোখের শব্দ যেনো স্পষ্ট ভাষায় তার মাকেই খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু মা কোথায়?

জুনায়েদ জানে তার মা আইসিওতে। এখনো বেঁচে আছে। চিকিৎসা নিচ্ছে। খালামনি ও আত্মীয় স্বজনরা তাকে তাই বুঝিয়েছে। কি নির্মমতার শিকার এই শিশুটিও! বয়স আট কি নয় হবে ছেলেটির।তার সামনেই গ্রামের মানুষ পিটিয়ে প্রিয় মা কে মেরে ফেললো। নানির চোখ তুলে নিলো, মামাকে কুপিয়ে হত্যা করলো। কতোটা ভয়ংকর চিত্রের সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে দিল সমাজ। কি ধারণা হবে তার এ সমাজের মানুষ সম্পর্কে?

অথচ শিশুটি আজ মায়ের কোলে গল্প করার কথা ছিল।মাকে জড়িয়ে তার আদর খাওয়ার সময় ছিলো। মায়ের হাত ধরে স্কুলে যেত, স্কুল থেকে ফিরে মা ঘুম পাড়ানি মাষি-পিষির গান গেয়ে মাথায় হাত ভুলিয়ে দিত! কিন্তু সবকিছুই যেনো আজ নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গেছে। সে বড় হবে,আলোকিত মানুষ করার স্বপ্ন হয়তো মা দেখেছিল। কারণ পৃথিবীর খারাপ মা-বাবারও স্বপ্ন থাকে তার সন্তান মানুষের মত মানুষ হবে,অনেক বড় হবে,সন্মান কামিয়ে দেশ ও পৃথিবীর মানুষকে জয় করবে!কিন্তু আজ সব ধূলিসাৎ হয়ে গেলো। মব যে কতোটা ভয়ংকর রূপ নেয় তা এ শিশুর মা-মামা-নানির নৃশংস মৃত্যু দিয়েই আলোড়ন হল।

জুনায়েদের খালামনি তাকে দু’হাতে জড়িয়ে রেখেছেন। অশ্রুপাত হওয়া দু’চোখ যেন রিক্তার থামছেইনা। মুঠোফোনের গ্যালারি থেকে ঘটনার দিনের ছবিগুলো দেখিয়ে দেখিয়ে বিবরণ দিচ্ছেন।কি বীভৎস মৃত্যু;কি জঘন্য মানুষের প্রতিচ্ছবি। কি মহাঘৃণ্য মানুষের কর্ম;মানুষের হাতেই মানুষ খুন!

রিক্তা আক্তারের আহাজারি কোন রকমই থামছেনা। চিৎকার করে বলছেন, আমার বোইন পুত এখনো জানে তার মা বেঁচে আছে। বোবা মুখে আকার ইজ্ঞিতে সে শুধু তার মাকেই খুঁজে। সারাক্ষণ মায়ের কথা জিজ্ঞেস করে । কিন্তু তাকে মিথ্যে বলে শান্তনা দিচ্ছি!তার মা’কে ছাড়া বোইন পুত কিভাবে বাঁচবে?বোইনপুত কাকে মা ডাকবে?

বিকেলের আকাশ ঘন মেঘে ঢেকে যাচ্ছে। সাদা মেঘের আনাগোনা দখল করে নিচ্ছে কালো মেঘ।এই বুঝি নামবে অঝোর বৃষ্টি!না নামবে না, কারণ আকাশের চোখে বৃষ্টি নেই। রিক্তা ৪ জুলাই থেকে কাঁদতে কাঁদতে চোখের অশ্রুও শুকিয়ে গেছে।

আমি চেয়ে আছি দু’হাতের আদরে জড়িয়ে থাকা জুনায়েদের মুখে। গভীরভাবে তাকেই দেখছি। হৃদয় দিকে তার সারা মুখ পড়ছি;তার কোমল চোখের অবুঝ ভাষা টলমল করছে;নির্বাক চোখ যে মাকেই খুঁজছে, সেটা উপলব্ধি করারও বাকি থাকলোনা! খুনিদের বিচার হবে,কেউ কেউ হয়তো ছাড়া পেয়ে যাবে,আবার হয়তো কেউ ফাঁসিতেও ঝুলবে। কিন্তু, জুনায়েদের মাকে এনে দেবে কে?

৮ আসামি রিমান্ডে

মুরাদনগরের বাঙ্গরাবাজার থানার করইবাড়ি এলাকায় গণপিটুনিতে মা-ছেলে-মেয়েকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার ৮ আসামির তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বুধবার (৯ জুলাই) কুমিল্লার ১১ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মমিনুল হক তাঁদের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এর আগে বাঙ্গরা বাজার থানা-পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা আবু তাহের আসামিদের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। রিমান্ড আবেদনের পরে মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে এটির তদন্ত কর্মকর্তা নয়ন কুমার চক্রবর্তী পরবর্তী আইনানুগ প্রক্রিয়া সম্পাদন করবেন। আদালতের ইন্সপেক্টর সাদেকুর রহমান এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

রিমান্ড পাওয়া আসামিরা হলেন- কড়ই বাড়ি গ্রামের বাসিন্দা মো. সবির আহমেদ (৪৮) ও মো. নাজিম উদ্দীন বাবুল (৫৬), বাচ্চু মিয়া, রবিউল আওয়াল (৫৫) ও দুলাল (৪৫), আতিকুর রহমান (৪২), বয়েজ মাস্টার (৪৩) ও আকাশ (২৪)। রিমান্ড শুনানির সময় আসামিরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

গত ৪ জুলাই বাঙ্গরাবাজার থানা এলাকার কড়ইবাড়িতে মাদক সম্পৃক্ততার অভিযোগ এনে নিজ বাড়ির সামনে রোখসানা বেগম রুবি, তার মেয়ে জোনাকি আক্তার ও ছেলে রাসেল মিয়াকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় রোকসানা বেগম রুবির মেয়ে রিক্তা আক্তার বাদী হয়ে ৩৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ২৫ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ পর্যন্ত এই মামলায় সেনাবাহিনী ও র‍্যাব মোট আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

নির্বাক চোখ খুঁজে বেড়ায়! মাকে এনে দেবে কে?

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:৫০:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ জুলাই ২০২৫

বাকশক্তিহীন জুনায়েদ। কুমিল্লার মুরাদনগর ৩ খুনের ঘটনায় নিহত জোনাকির ছেলে।কুমিল্লার চিপ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গনে আসে খালামনি রিক্তার সাথে। তখন রিক্তার কান্নায় আদালত প্রাঙ্গণ ভারি হয়ে উঠে। গণমাধ্যম কর্মীরা ক্যামেরা তাক করে রেখেছে তাদের দিকে।

জুনায়েদের অবুঝ মুখ যেনো কিছুই বুঝতে পারছে না। খালামনির গা জড়িয়ে ফেল ফেল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । নির্বাক ঠোঁট যেনো কিছু একটা বলতে চায়, তবে বলতে পারছেনা;কিভাবে বলবে সে যে কথা বলতে অক্ষম। কিন্তু তার টলটলে দু’ চোখ যেনো কিছু একটা টের পেয়েছে। আতঙ্কিত চোখের শব্দ যেনো স্পষ্ট ভাষায় তার মাকেই খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু মা কোথায়?

জুনায়েদ জানে তার মা আইসিওতে। এখনো বেঁচে আছে। চিকিৎসা নিচ্ছে। খালামনি ও আত্মীয় স্বজনরা তাকে তাই বুঝিয়েছে। কি নির্মমতার শিকার এই শিশুটিও! বয়স আট কি নয় হবে ছেলেটির।তার সামনেই গ্রামের মানুষ পিটিয়ে প্রিয় মা কে মেরে ফেললো। নানির চোখ তুলে নিলো, মামাকে কুপিয়ে হত্যা করলো। কতোটা ভয়ংকর চিত্রের সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে দিল সমাজ। কি ধারণা হবে তার এ সমাজের মানুষ সম্পর্কে?

অথচ শিশুটি আজ মায়ের কোলে গল্প করার কথা ছিল।মাকে জড়িয়ে তার আদর খাওয়ার সময় ছিলো। মায়ের হাত ধরে স্কুলে যেত, স্কুল থেকে ফিরে মা ঘুম পাড়ানি মাষি-পিষির গান গেয়ে মাথায় হাত ভুলিয়ে দিত! কিন্তু সবকিছুই যেনো আজ নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গেছে। সে বড় হবে,আলোকিত মানুষ করার স্বপ্ন হয়তো মা দেখেছিল। কারণ পৃথিবীর খারাপ মা-বাবারও স্বপ্ন থাকে তার সন্তান মানুষের মত মানুষ হবে,অনেক বড় হবে,সন্মান কামিয়ে দেশ ও পৃথিবীর মানুষকে জয় করবে!কিন্তু আজ সব ধূলিসাৎ হয়ে গেলো। মব যে কতোটা ভয়ংকর রূপ নেয় তা এ শিশুর মা-মামা-নানির নৃশংস মৃত্যু দিয়েই আলোড়ন হল।

জুনায়েদের খালামনি তাকে দু’হাতে জড়িয়ে রেখেছেন। অশ্রুপাত হওয়া দু’চোখ যেন রিক্তার থামছেইনা। মুঠোফোনের গ্যালারি থেকে ঘটনার দিনের ছবিগুলো দেখিয়ে দেখিয়ে বিবরণ দিচ্ছেন।কি বীভৎস মৃত্যু;কি জঘন্য মানুষের প্রতিচ্ছবি। কি মহাঘৃণ্য মানুষের কর্ম;মানুষের হাতেই মানুষ খুন!

রিক্তা আক্তারের আহাজারি কোন রকমই থামছেনা। চিৎকার করে বলছেন, আমার বোইন পুত এখনো জানে তার মা বেঁচে আছে। বোবা মুখে আকার ইজ্ঞিতে সে শুধু তার মাকেই খুঁজে। সারাক্ষণ মায়ের কথা জিজ্ঞেস করে । কিন্তু তাকে মিথ্যে বলে শান্তনা দিচ্ছি!তার মা’কে ছাড়া বোইন পুত কিভাবে বাঁচবে?বোইনপুত কাকে মা ডাকবে?

বিকেলের আকাশ ঘন মেঘে ঢেকে যাচ্ছে। সাদা মেঘের আনাগোনা দখল করে নিচ্ছে কালো মেঘ।এই বুঝি নামবে অঝোর বৃষ্টি!না নামবে না, কারণ আকাশের চোখে বৃষ্টি নেই। রিক্তা ৪ জুলাই থেকে কাঁদতে কাঁদতে চোখের অশ্রুও শুকিয়ে গেছে।

আমি চেয়ে আছি দু’হাতের আদরে জড়িয়ে থাকা জুনায়েদের মুখে। গভীরভাবে তাকেই দেখছি। হৃদয় দিকে তার সারা মুখ পড়ছি;তার কোমল চোখের অবুঝ ভাষা টলমল করছে;নির্বাক চোখ যে মাকেই খুঁজছে, সেটা উপলব্ধি করারও বাকি থাকলোনা! খুনিদের বিচার হবে,কেউ কেউ হয়তো ছাড়া পেয়ে যাবে,আবার হয়তো কেউ ফাঁসিতেও ঝুলবে। কিন্তু, জুনায়েদের মাকে এনে দেবে কে?

৮ আসামি রিমান্ডে

মুরাদনগরের বাঙ্গরাবাজার থানার করইবাড়ি এলাকায় গণপিটুনিতে মা-ছেলে-মেয়েকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার ৮ আসামির তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বুধবার (৯ জুলাই) কুমিল্লার ১১ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মমিনুল হক তাঁদের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এর আগে বাঙ্গরা বাজার থানা-পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা আবু তাহের আসামিদের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। রিমান্ড আবেদনের পরে মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে এটির তদন্ত কর্মকর্তা নয়ন কুমার চক্রবর্তী পরবর্তী আইনানুগ প্রক্রিয়া সম্পাদন করবেন। আদালতের ইন্সপেক্টর সাদেকুর রহমান এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

রিমান্ড পাওয়া আসামিরা হলেন- কড়ই বাড়ি গ্রামের বাসিন্দা মো. সবির আহমেদ (৪৮) ও মো. নাজিম উদ্দীন বাবুল (৫৬), বাচ্চু মিয়া, রবিউল আওয়াল (৫৫) ও দুলাল (৪৫), আতিকুর রহমান (৪২), বয়েজ মাস্টার (৪৩) ও আকাশ (২৪)। রিমান্ড শুনানির সময় আসামিরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

গত ৪ জুলাই বাঙ্গরাবাজার থানা এলাকার কড়ইবাড়িতে মাদক সম্পৃক্ততার অভিযোগ এনে নিজ বাড়ির সামনে রোখসানা বেগম রুবি, তার মেয়ে জোনাকি আক্তার ও ছেলে রাসেল মিয়াকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় রোকসানা বেগম রুবির মেয়ে রিক্তা আক্তার বাদী হয়ে ৩৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ২৫ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ পর্যন্ত এই মামলায় সেনাবাহিনী ও র‍্যাব মোট আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে।