ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ একসঙ্গে? কিডনি সুরক্ষায় খাদ্যতালিকায় রাখবেন যা

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:৫৯:১২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ—দুটির যেকোনো একটি থাকলেই কিডনির স্বাস্থ্যের দিকে বাড়তি নজর দেওয়া প্রয়োজন। আর একই ব্যক্তির শরীরে দুই সমস্যাই থাকলে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। উদ্বেগের বিষয়, কিডনির কার্যক্ষমতা অনেকটা কমে যাওয়ার আগ পর্যন্ত অনেক সময় স্পষ্ট কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে অজান্তেই বাড়তে থাকে কিডনির ক্ষতি।
প্রতিদিনের খাবারেও এমন কিছু অভ্যাস রয়েছে, যেগুলোকে অনেকে স্বাস্থ্যকর মনে করলেও ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনির সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য তা ঝুঁকির কারণ হতে পারে। যেমন—নিয়মিত আচার, পাঁপড়, নুন দেওয়া বাদাম কিংবা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া। এসব খাবারে থাকা বাড়তি সোডিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, যার প্রভাব পড়ে কিডনির ওপরও।
তবে কিডনি ভালো রাখতে পরিচিত খাবার একেবারে বাদ দেওয়া কিংবা কঠোর খাদ্যনিয়ম অনুসরণ করা জরুরি নয়। তেলঙ্গনার পুষ্টিবিদ অপেক্ষা একবটে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী খাদ্যতালিকা সাজানোই কিডনি সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
নুন কমানো কেন জরুরি?
শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য সোডিয়াম প্রয়োজন। কিন্তু অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ রক্তচাপ বাড়িয়ে দিতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে না থাকলে কিডনির সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ছেঁকে নেওয়ার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
রান্নায় নুন কম ব্যবহার করলেও প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় থাকা কিছু খাবার থেকে অজান্তেই শরীরে অতিরিক্ত সোডিয়াম প্রবেশ করে। আচার, পাঁপড়, নুন দেওয়া বাদাম এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবার এর অন্যতম উৎস।
অনেকে বিকেলের নাশতায় পাঁপড় বা নুন দেওয়া বাদামকে তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর বিকল্প মনে করেন। কিন্তু উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনির সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য নিয়মিত এসব খাবার খাওয়া ক্ষতিকর হতে পারে। তাই শুধু রান্নার নুন কমালেই হবে না, খাবারের সঙ্গে অতিরিক্ত নুন গ্রহণের অভ্যাসও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
প্রোটিন খেলেই কি কিডনির ক্ষতি হয়?
কিডনির সমস্যা থাকলে প্রোটিন খাওয়া কমিয়ে দিতে হবে—এমন ধারণা প্রচলিত। আবার শরীর সুস্থ রাখতে বেশি প্রোটিন খাওয়ার প্রবণতাও রয়েছে। তবে কোনটি সঠিক, তা নির্ভর করে ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা ও কিডনির কার্যক্ষমতার ওপর।
পুষ্টিবিদ অপেক্ষা একবটের মতে, সবার জন্য প্রোটিন গ্রহণের একই মাত্রা নির্ধারণ করা যায় না। কিডনির বর্তমান অবস্থা, শরীরের ওজন, বয়স, শারীরিক পরিশ্রম এবং পুষ্টির চাহিদা বিবেচনা করেই প্রোটিনের পরিমাণ ঠিক করতে হয়।
ডাল, মাছ ও মাংস প্রোটিনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু কিডনির সমস্যা থাকলে কোন উৎস থেকে কতটা প্রোটিন গ্রহণ করা যাবে, তা চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত। নিজের সিদ্ধান্তে প্রোটিন পুরোপুরি বাদ দেওয়া কিংবা অতিরিক্ত গ্রহণ—কোনোটিই ঠিক নয়।
ভাত, রুটি ও ডাল কতটা খাবেন?
ডায়াবেটিস থাকলে ভাত ও রুটির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। কারণ এসব খাবার রক্তে শর্করার মাত্রায় প্রভাব ফেলে। তবে কিডনির সমস্যা থাকলেই ভাত, রুটি বা ডাল পুরোপুরি বাদ দিতে হবে, এমন নয়।
পুষ্টিবিদের পরামর্শ, ব্যক্তির শর্করার মাত্রা, ওজন ও দৈনন্দিন প্রয়োজন অনুযায়ী ভাত-রুটির পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে। খাদ্যতালিকায় পরিমিত শর্করার পাশাপাশি উপযুক্ত পরিমাণে শাকসবজি ও সালাদ রাখা যেতে পারে।
একইভাবে ডাল, মাছ ও মাংস থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া সম্ভব। তবে কিডনির রোগের পর্যায় অনুযায়ী কিছু খাবারের পরিমাণ বা ধরনে পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে পটাশিয়াম, ফসফরাস, সোডিয়াম ও প্রোটিন গ্রহণের বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হয়।
উপসর্গ না থাকলেও কিডনি পরীক্ষা জরুরি
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘদিন ধরে কিডনির ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক রোগীর শরীরে কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। এ কারণে শুধু অসুস্থ বোধ করার পর পরীক্ষা করানো যথেষ্ট নয়।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত কিডনির কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে রক্তে সিরাম ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা এবং ইজিএফআর (এস্টিমেটেড গ্লোমেরুলার ফিল্ট্রেশন রেট) পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
সিরাম ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা থেকে কিডনির কার্যক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে বয়স, পেশির পরিমাণসহ বিভিন্ন কারণে এই মাত্রায় পরিবর্তন হতে পারে। তাই শুধু ক্রিয়েটিনিনের ফল দেখে কিডনির অবস্থা নির্ধারণ করা যথেষ্ট নয়।
ইজিএফআর পরীক্ষার মাধ্যমে কিডনি প্রতি মিনিটে কতটা রক্ত পরিশোধন করতে পারছে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। পাশাপাশি প্রস্রাবে অ্যালবুমিন বা প্রোটিনের উপস্থিতি পরীক্ষা করাও কিডনির ক্ষতি শনাক্ত করতে সহায়ক।
ভারতের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এক প্রতিবেদনে কিডনির রোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে নিয়মিত কিডনির কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কিডনি সুরক্ষায় কোন অভ্যাস জরুরি?
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসে কিছু পরিবর্তন কিডনির দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষায় সহায়ক হতে পারে। রান্নায় নুন কম ব্যবহার, আচার-পাঁপড় ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলা এবং পরিমিত ভাত-রুটি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
পাশাপাশি ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান এড়িয়ে চলতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত ব্যথানাশক ওষুধ সেবন থেকেও বিরত থাকা জরুরি। কিডনির রোগের ঝুঁকি থাকলে নিজের ইচ্ছায় খাদ্যতালিকা থেকে প্রোটিন, ফল বা শাকসবজি বাদ দেওয়া উচিত নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপকে অবহেলা না করা। নিয়মিত রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ, প্রয়োজনীয় রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা এবং ব্যক্তির কিডনির অবস্থা অনুযায়ী খাদ্যতালিকা নির্ধারণ—এই তিনটি বিষয়ই কিডনি সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।












