পাসের হার নয়, শিক্ষার প্রকৃত মান যাচাইয়ে বছরভিত্তিক মূল্যায়নের প্রস্তাব

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৪৫:৫৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে
পাসের হার বাড়ানোর প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখনদক্ষতা ও শিক্ষার গুণগত মান যাচাইয়ে বছরভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর সুপারিশ করেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ মূল্যায়ন পদ্ধতি গড়ে তোলার পাশাপাশি তিন বা ছয় মাস অন্তর শিক্ষার্থীদের শিখনফল পরিমাপের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শুধু মূল্যায়ন পদ্ধতি নয়, শিক্ষার সামগ্রিক মানোন্নয়নে একগুচ্ছ প্রস্তাব দিয়েছে সংসদীয় কমিটি। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষা খাতের বরাদ্দের স্বচ্ছ ব্যবহার, শিক্ষাঙ্গনে অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ, মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে গবেষণা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বাড়ানো, কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং শর্ত পূরণকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দ্রুত এমপিওভুক্তি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকের কার্যবিবরণীতে এসব প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত উঠে এসেছে।
কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া বলেছেন, শিক্ষার প্রকৃত গুণগত মান নিশ্চিত করাই তাঁদের লক্ষ্য। এ বিষয়ে আগামী বৈঠকগুলোতেও পর্যায়ক্রমে সুপারিশ দেওয়া হবে। শিক্ষার রোডম্যাপ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত তুলে ধরার পরিকল্পনাও রয়েছে কমিটির।
পাসের হার দিয়ে শিক্ষার মান নির্ধারণ নয়
সংসদীয় কমিটির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, কেবল পরীক্ষায় পাসের হার বাড়লেই শিক্ষার মান নিশ্চিত হয় না। শিক্ষার্থীরা কতটা শিখছে, গণিত ও বিজ্ঞানের মতো মৌলিক বিষয়ে তাদের দক্ষতা কতটুকু এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তারা কোথায় দাঁড়িয়ে—এসব বিষয়কে মূল্যায়নের কেন্দ্রে আনার প্রয়োজন রয়েছে।
কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া বলেন, বিগত সরকার শিক্ষার ক্ষেত্রে সংখ্যাগত সাফল্য ও পাসের হারের কৃত্রিম প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত ছিল। বর্তমান সরকার এ ধরনের প্রতিযোগিতায় বিশ্বাসী নয়; বরং শিক্ষার প্রকৃত গুণগত মান নিশ্চিত করতে চায়।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে দেশের শিক্ষার্থীদের দক্ষতার তুলনা করতে হলে বছরভিত্তিক মূল্যায়ন ও আধুনিক শিক্ষাক্রমের বিকল্প নেই। শুধু বছর শেষে নয়, তিন বা ছয় মাস অন্তর শিক্ষার্থীদের শিখনফল মূল্যায়নের ব্যবস্থাও চালু হওয়া প্রয়োজন।
বৈঠকে কমিটির সদস্য রেজা কিবরিয়া বলেন, গণিত ও বিজ্ঞানের মতো মৌলিক বিষয়ে আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যাতে পিছিয়ে না পড়ে, সে জন্য সুনির্দিষ্ট বছরভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড প্রবর্তন জরুরি।
এ ছাড়া মালয়েশিয়ার মডেলের আদলে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী জাতীয় শিক্ষা-ভাবনা প্রণয়নের প্রস্তাব এসেছে। এর উদ্দেশ্য হলো, সরকার বা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তি পরিবর্তন হলেও শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তকের মৌলিক কাঠামো যেন বারবার পরিবর্তন না হয়।
৪০ হাজার শিক্ষার্থী পাবে ল্যাপটপ, বৃত্তির আওতায় ৭০ লাখ ছাত্রী
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির কার্যবিবরণীতে সরকারের কয়েকটি উদ্যোগের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, মেধা বিকাশ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়াতে ২০২৬ সালে গোল্ডেন জিপিএ অর্জনকারী প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে একটি করে ল্যাপটপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নারী শিক্ষার প্রসার ও ঝরে পড়া রোধে ৭০ লাখ ছাত্রীকে চার হাজার কোটি টাকার বৃত্তির আওতায় আনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বৈঠকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব আবদুল খালেক জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তাঁর বিভাগের জন্য ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি ৬৮ লাখ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ধরা হয়েছে। এটি আগের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।
কার্যবিবরণী অনুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বকেয়া পাওনা পরিশোধেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) ও আইবাস++ পদ্ধতিতে প্রায় ৭০ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর পাওনা সরাসরি ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর কাজ শুরু হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে গড়ে প্রত্যেক শিক্ষককে পাঁচ লাখ টাকা করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দুই হাজার কোটি টাকার বিশেষ আর্থিক সহায়তার জন্য বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে তাঁকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।
এমপিওভুক্তি ও শিক্ষকদের বকেয়া পরিশোধে তাগিদ
দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে কাজ করা শিক্ষক এবং এমপিওভুক্তির সব শর্ত পূরণ করা নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছে সংসদীয় কমিটি।
কমিটির সদস্য মোছা. তাহসিনা রুশদী ও মো. মুজিবুর রহমান শর্ত পূরণকারী প্রতিষ্ঠান এবং প্রবীণ শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত এমপিওভুক্তির সুপারিশ করেন। একই সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ফাইলের দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে শিক্ষকবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়।
কার্যবিবরণীতে হজযাত্রী এবং দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত শিক্ষকদের বকেয়া দ্রুত পরিশোধে পৃথক তালিকা তৈরির সুপারিশও রয়েছে। বাজেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বকেয়া ভাতা প্রদানের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার কথা বলা হয়েছে।
মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমছে কেন, খুঁজবে গবেষণা
দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংসদীয় কমিটি। শিক্ষার্থীরা কোথায় যাচ্ছে, কেন তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং বর্তমানে তাদের অবস্থা কী—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সময়োপযোগী গবেষণার সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিটির মতে, শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা না গেলে কার্যকর নীতি গ্রহণ কঠিন হবে। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে ঝরে পড়া রোধ ও শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার কৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির লক্ষ্য ৩০ শতাংশ
সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার প্রসারেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) সামসুর রহমান খান জানান, ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার ১৯ দশমিক ১৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ হার ৩০ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।
কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে কমিটি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করবেন সংসদ সদস্যরা
শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং বরাদ্দের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংসদ সদস্যদের সরাসরি স্কুল-কলেজ পরিদর্শনের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি পরবর্তী বৈঠকগুলোতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, সব শিক্ষা বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় দপ্তরের প্রধানদের সশরীর উপস্থিতি নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংসদীয় কমিটির সাত দফা সুপারিশের মধ্যে রয়েছে—
- আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে শিক্ষার গুণগত মান পরিমাপের বছরভিত্তিক পদ্ধতি তৈরি।
- শিক্ষা খাতের বরাদ্দের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন গড়ে তোলা।
- সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে স্কুল-কলেজ সরেজমিনে পরিদর্শন।
- মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে গবেষণা।
- জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষা বোর্ড ও অধীনস্থ দপ্তরের প্রধানদের বৈঠকে উপস্থিতি নিশ্চিত করা।
- হজযাত্রী ও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত শিক্ষকদের বকেয়া পরিশোধে পৃথক তালিকা তৈরি।
- বাজেটের সংস্থান অনুযায়ী শিক্ষকদের বকেয়া ভাতা পরিশোধের প্রক্রিয়া দ্রুত করা।
শিক্ষা খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, পাসের হারনির্ভর মূল্যায়নের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত দক্ষতা যাচাই, দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষানীতি প্রণয়ন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব সুপারিশের কার্যকর বাস্তবায়ন, মূল্যায়নের নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি নির্ধারণ এবং ধারাবাহিক নজরদারিই হবে উদ্যোগগুলোর সাফল্যের প্রধান শর্ত।






















