ঢাকা ১২:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
প্রবাসীদের হয়রানি নিরসনে বিশেষ আদালত গঠনের পরিকল্পনা, শিগগিরই চালু যুবদল নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি-দখলের অভিযোগ, বিচার দাবিতে মানববন্ধন সিলেটে হামের চাপ, শয্যা সংকটে এক বিছানায় একাধিক শিশু শিশুর ডিএনএ পরীক্ষা কি চাইলেই করা যায়? রয়েছে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া স্বর্ণের দামে বড় পতন, ভরিতে কমল ৩,২৬৬ টাকা রাতে মহাসড়কে সিএনজি চালায় কারা? পরিচয়হীন চালক, ঝুঁকিতে যাত্রী জেএফকে বিমানবন্দরে তোপের মুখে ড. ইউনূস অনিয়মের ভিডিও করায় সাংবাদিকের মোবাইল কেড়ে নিলেন পাসপোর্ট অফিসের কর্মচারী নাসিরনগরে সার ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, কাঠগড়ায় এমপি হান্নান ২৯ অক্টোবর এইচএসসি-সমমানের ফল, মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব

শিক্ষায় পিছিয়ে সিলেট, বাল্যবিয়ে কম

আবুল কাশেম রুমন,সিলেট
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৪০:০৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬ ২২ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু সেই তুলনায় বাড়ছে না আয়। প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কমে যাওয়ায় সিলেটের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের সংসার চালানোও কঠিন হয়ে উঠছে। এর মধ্যে শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার বিষয়টি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি একটি ভিন্ন চিত্রও সামনে এসেছে—দেশের বিভাগগুলোর মধ্যে সিলেটে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে কম।

২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ক্ষুদ্র-এলাকাভিত্তিক প্রাক্কলনের তথ্যেও সিলেটে বাল্যবিবাহের হার তুলনামূলকভাবে কম থাকার চিত্র উঠে এসেছে। তবে শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার সঙ্গে তরুণ-তরুণীদের বিদেশমুখী হওয়ার সম্পর্ক কতটা, তা নির্ধারণে আলাদা গবেষণা প্রয়োজন।

বাল্যবিবাহে শীর্ষে রাজশাহী, সর্বনিম্ন সিলেট

এমআইসিএসের ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার সবচেয়ে বেশি রাজশাহী বিভাগে, ৬৭ শতাংশ। খুলনায় এ হার ৬৫ শতাংশ, রংপুরে ৬৩ শতাংশ এবং বরিশালে ৬১ শতাংশ। ঢাকা বিভাগে ৫৩ শতাংশ ও চট্টগ্রামে ৫১ শতাংশ। বিপরীতে, সিলেটে এ হার মাত্র ২৯ শতাংশ।

গ্রাম ও শহরের মধ্যেও বাল্যবিবাহের হারে পার্থক্য রয়েছে। গ্রামাঞ্চলে ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার ৪৯ দশমিক ৪ শতাংশ, শহরাঞ্চলে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ।

জরিপে দেখা গেছে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। তাঁদের মধ্যে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। অন্যদিকে, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ জরিপের সময় বিবাহিত ছিলেন।

তিন দশকে কমেছে বাল্যবিবাহ, অগ্রগতি ধীর

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার দীর্ঘমেয়াদে কমলেও অগ্রগতির গতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ২০১৯ সালে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার ছিল ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৫ সালের জরিপে তা কমে ৪৭ দশমিক ২ শতাংশে এসেছে।

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) অনুযায়ী, ১৯৯৩-৯৪ সালে এ হার ছিল ৭৩ শতাংশ। ২০২২ সালে তা কমে প্রায় ৫১ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ প্রায় তিন দশকে উল্লেখযোগ্য হ্রাস ঘটলেও এখনো বিপুলসংখ্যক নারীর বিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই হচ্ছে।

আঞ্চলিক তুলনায় বাংলাদেশের অগ্রগতির গতি ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও মালদ্বীপের তুলনায় ধীর বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিক্ষা ও সচ্ছলতা থাকলেও বাল্যবিবাহের ঝুঁকি

সাধারণভাবে শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতাকে বাল্যবিবাহ কমানোর গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবারেও বাল্যবিবাহের উপস্থিতি পুরোপুরি দূর হয়নি।

এমআইসিএস ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করা ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ২৫ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। সবচেয়ে সচ্ছল পরিবারগুলোর মধ্যেও এ হার ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ।

এ তথ্য ইঙ্গিত করে, শুধু শিক্ষা বা পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নই বাল্যবিবাহ বন্ধের জন্য যথেষ্ট নয়। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, পারিবারিক সিদ্ধান্ত এবং মেয়েদের শিক্ষা অব্যাহত রাখার সুযোগের মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

৫৪১ উপজেলায় বাল্যবিবাহের চিত্র

বিবিএসের ২০২৪ সালের ক্ষুদ্র-এলাকাভিত্তিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, দেশের ৫৪১টি উপজেলায় ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে বাল্যবিবাহের হার ৩৮ দশমিক ৩ থেকে ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশের মধ্যে।

এ প্রাক্কলনে খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় উচ্চ হার দেখা গেছে। খুলনা বিভাগের ৬৪টি উপজেলার সবকটিতে হার ৬০ শতাংশের বেশি। রাজশাহী বিভাগের ৭০টি উপজেলার মধ্যে ৬৯টিতে একই ধরনের চিত্র রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ হার চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায়, ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ। বগুড়া, জয়পুরহাট ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন এলাকাতেও বাল্যবিবাহের হার বেশি।


অন্যদিকে, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ময়মনসিং]হ, রংপুর ও ঢাকা বিভাগের অধিকাংশ এলাকায় এ হার ৪৮ থেকে ৫৩ শতাংশের মধ্যে। ঢাকা বিভাগের মধ্যে শাহবাগে হার ৩৯ শতাংশ এবং মিরপুরে ৬০ শতাংশ বলে প্রাক্কলনে উল্লেখ রয়েছে।

সিলেটের প্রতিটি উপজেলায় হার ৪৩ শতাংশের নিচে

দেশের অন্য অঞ্চলগুলোর তুলনায় সিলেটের চিত্র আলাদা। বিবিএসের প্রাক্কলন অনুযায়ী, সিলেট বিভাগের প্রতিটি উপজেলায় বাল্যবিবাহের হার ৪৩ শতাংশের নিচে। উপজেলাভেদে এ হার ৩৮ দশমিক ৩ থেকে ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ।

উপজেলা পর্যায়ে দেশের সর্বনিম্ন হার পাওয়া গেছে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে, ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ। সিলেটের এই চিত্র বিভাগটিতে বাল্যবিবাহের তুলনামূলক কম প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।

তবে বাল্যবিবাহের হার কম হলেই শিক্ষার সব সূচকে সিলেট এগিয়ে আছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, বিদেশে অভিবাসন এবং পারিবারিক আর্থসামাজিক পরিস্থিতি—প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

কম বয়সে বিয়ে নিয়ে অনুশোচনা বেশি অন্য তিন বিভাগে

বিডিএইচএস ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের নারীদের প্রথম বিয়ের মধ্যক বয়স ১৬ বছর। অর্থাৎ এসব বিভাগের ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের অর্ধেকের বিয়ে হয়েছে ১৬ বছর বা তার কম বয়সে।

এসব বিভাগের নারীদের মধ্যে পরে বিয়ে করলে ভালো হতো—এমন মত প্রকাশের হারও তুলনামূলক বেশি। রাজশাহীতে এ হার ৪৭ শতাংশ, খুলনায় ৪২ শতাংশ এবং রংপুরে ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ।

বিপরীতে, সিলেট বিভাগে প্রথম বিয়ের মধ্যক বয়স ১৮ দশমিক ৮ বছর, যা দেশের বিভাগগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ বলে বিডিএইচএসের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।


শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার কারণ অনুসন্ধান জরুরি

সিলেটের শিক্ষার হার তুলনামূলক কম হওয়ার পেছনে তরুণ-তরুণীদের বিদেশমুখী হওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এলেও, এটিকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সী অনেক তরুণ-তরুণী পড়াশোনা চলাকালেই যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান বলে স্থানীয় পর্যায়ে দাবি রয়েছে।

তবে এই অভিবাসন শিক্ষার হার, শিক্ষাজীবন শেষ করার প্রবণতা কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতির ওপর কতটা প্রভাব ফেলছে, তা জানতে নির্ভরযোগ্য উপাত্ত ও গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সিলেটে বাল্যবিবাহের হার কম থাকার পেছনে শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক সিদ্ধান্ত ও অভিবাসনের ভূমিকা আছে কি না, সেটিও অনুসন্ধানের বিষয়।

সার্বিক তথ্য বলছে, বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে সিলেট দেশের তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও শিক্ষার চিত্র নিয়ে আলাদা করে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে। বাল্যবিবাহ কমানোর অগ্রগতিকে ধরে রাখার পাশাপাশি শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর সুযোগ তৈরি করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

শিক্ষায় পিছিয়ে সিলেট, বাল্যবিয়ে কম

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৪০:০৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬

জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু সেই তুলনায় বাড়ছে না আয়। প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কমে যাওয়ায় সিলেটের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের সংসার চালানোও কঠিন হয়ে উঠছে। এর মধ্যে শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার বিষয়টি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি একটি ভিন্ন চিত্রও সামনে এসেছে—দেশের বিভাগগুলোর মধ্যে সিলেটে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে কম।

২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ক্ষুদ্র-এলাকাভিত্তিক প্রাক্কলনের তথ্যেও সিলেটে বাল্যবিবাহের হার তুলনামূলকভাবে কম থাকার চিত্র উঠে এসেছে। তবে শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার সঙ্গে তরুণ-তরুণীদের বিদেশমুখী হওয়ার সম্পর্ক কতটা, তা নির্ধারণে আলাদা গবেষণা প্রয়োজন।

বাল্যবিবাহে শীর্ষে রাজশাহী, সর্বনিম্ন সিলেট

এমআইসিএসের ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার সবচেয়ে বেশি রাজশাহী বিভাগে, ৬৭ শতাংশ। খুলনায় এ হার ৬৫ শতাংশ, রংপুরে ৬৩ শতাংশ এবং বরিশালে ৬১ শতাংশ। ঢাকা বিভাগে ৫৩ শতাংশ ও চট্টগ্রামে ৫১ শতাংশ। বিপরীতে, সিলেটে এ হার মাত্র ২৯ শতাংশ।

গ্রাম ও শহরের মধ্যেও বাল্যবিবাহের হারে পার্থক্য রয়েছে। গ্রামাঞ্চলে ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার ৪৯ দশমিক ৪ শতাংশ, শহরাঞ্চলে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ।

জরিপে দেখা গেছে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। তাঁদের মধ্যে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। অন্যদিকে, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ জরিপের সময় বিবাহিত ছিলেন।

তিন দশকে কমেছে বাল্যবিবাহ, অগ্রগতি ধীর

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার দীর্ঘমেয়াদে কমলেও অগ্রগতির গতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ২০১৯ সালে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার ছিল ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৫ সালের জরিপে তা কমে ৪৭ দশমিক ২ শতাংশে এসেছে।

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) অনুযায়ী, ১৯৯৩-৯৪ সালে এ হার ছিল ৭৩ শতাংশ। ২০২২ সালে তা কমে প্রায় ৫১ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ প্রায় তিন দশকে উল্লেখযোগ্য হ্রাস ঘটলেও এখনো বিপুলসংখ্যক নারীর বিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই হচ্ছে।

আঞ্চলিক তুলনায় বাংলাদেশের অগ্রগতির গতি ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও মালদ্বীপের তুলনায় ধীর বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিক্ষা ও সচ্ছলতা থাকলেও বাল্যবিবাহের ঝুঁকি

সাধারণভাবে শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতাকে বাল্যবিবাহ কমানোর গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবারেও বাল্যবিবাহের উপস্থিতি পুরোপুরি দূর হয়নি।

এমআইসিএস ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করা ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ২৫ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। সবচেয়ে সচ্ছল পরিবারগুলোর মধ্যেও এ হার ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ।

এ তথ্য ইঙ্গিত করে, শুধু শিক্ষা বা পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নই বাল্যবিবাহ বন্ধের জন্য যথেষ্ট নয়। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, পারিবারিক সিদ্ধান্ত এবং মেয়েদের শিক্ষা অব্যাহত রাখার সুযোগের মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

৫৪১ উপজেলায় বাল্যবিবাহের চিত্র

বিবিএসের ২০২৪ সালের ক্ষুদ্র-এলাকাভিত্তিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, দেশের ৫৪১টি উপজেলায় ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে বাল্যবিবাহের হার ৩৮ দশমিক ৩ থেকে ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশের মধ্যে।

এ প্রাক্কলনে খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় উচ্চ হার দেখা গেছে। খুলনা বিভাগের ৬৪টি উপজেলার সবকটিতে হার ৬০ শতাংশের বেশি। রাজশাহী বিভাগের ৭০টি উপজেলার মধ্যে ৬৯টিতে একই ধরনের চিত্র রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ হার চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায়, ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ। বগুড়া, জয়পুরহাট ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন এলাকাতেও বাল্যবিবাহের হার বেশি।


অন্যদিকে, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ময়মনসিং]হ, রংপুর ও ঢাকা বিভাগের অধিকাংশ এলাকায় এ হার ৪৮ থেকে ৫৩ শতাংশের মধ্যে। ঢাকা বিভাগের মধ্যে শাহবাগে হার ৩৯ শতাংশ এবং মিরপুরে ৬০ শতাংশ বলে প্রাক্কলনে উল্লেখ রয়েছে।

সিলেটের প্রতিটি উপজেলায় হার ৪৩ শতাংশের নিচে

দেশের অন্য অঞ্চলগুলোর তুলনায় সিলেটের চিত্র আলাদা। বিবিএসের প্রাক্কলন অনুযায়ী, সিলেট বিভাগের প্রতিটি উপজেলায় বাল্যবিবাহের হার ৪৩ শতাংশের নিচে। উপজেলাভেদে এ হার ৩৮ দশমিক ৩ থেকে ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ।

উপজেলা পর্যায়ে দেশের সর্বনিম্ন হার পাওয়া গেছে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে, ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ। সিলেটের এই চিত্র বিভাগটিতে বাল্যবিবাহের তুলনামূলক কম প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।

তবে বাল্যবিবাহের হার কম হলেই শিক্ষার সব সূচকে সিলেট এগিয়ে আছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, বিদেশে অভিবাসন এবং পারিবারিক আর্থসামাজিক পরিস্থিতি—প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

কম বয়সে বিয়ে নিয়ে অনুশোচনা বেশি অন্য তিন বিভাগে

বিডিএইচএস ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের নারীদের প্রথম বিয়ের মধ্যক বয়স ১৬ বছর। অর্থাৎ এসব বিভাগের ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের অর্ধেকের বিয়ে হয়েছে ১৬ বছর বা তার কম বয়সে।

এসব বিভাগের নারীদের মধ্যে পরে বিয়ে করলে ভালো হতো—এমন মত প্রকাশের হারও তুলনামূলক বেশি। রাজশাহীতে এ হার ৪৭ শতাংশ, খুলনায় ৪২ শতাংশ এবং রংপুরে ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ।

বিপরীতে, সিলেট বিভাগে প্রথম বিয়ের মধ্যক বয়স ১৮ দশমিক ৮ বছর, যা দেশের বিভাগগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ বলে বিডিএইচএসের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।


শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার কারণ অনুসন্ধান জরুরি

সিলেটের শিক্ষার হার তুলনামূলক কম হওয়ার পেছনে তরুণ-তরুণীদের বিদেশমুখী হওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এলেও, এটিকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সী অনেক তরুণ-তরুণী পড়াশোনা চলাকালেই যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান বলে স্থানীয় পর্যায়ে দাবি রয়েছে।

তবে এই অভিবাসন শিক্ষার হার, শিক্ষাজীবন শেষ করার প্রবণতা কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতির ওপর কতটা প্রভাব ফেলছে, তা জানতে নির্ভরযোগ্য উপাত্ত ও গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সিলেটে বাল্যবিবাহের হার কম থাকার পেছনে শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক সিদ্ধান্ত ও অভিবাসনের ভূমিকা আছে কি না, সেটিও অনুসন্ধানের বিষয়।

সার্বিক তথ্য বলছে, বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে সিলেট দেশের তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও শিক্ষার চিত্র নিয়ে আলাদা করে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে। বাল্যবিবাহ কমানোর অগ্রগতিকে ধরে রাখার পাশাপাশি শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর সুযোগ তৈরি করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।