স্থানীয় সরকার নির্বাচন: সাংগঠনিক প্রস্তুতিতে জোর বিএনপির

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:৪৮:৩৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬ ২০ বার পড়া হয়েছে
স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের আগে আরও সময় নিয়ে সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে চায় বিএনপি। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হওয়ায় একই পদে একাধিক দলীয় প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভোট বিভক্তি এবং তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের আশঙ্কাও দলটির নীতিনির্ধারকদের আলোচনায় উঠে এসেছে। অন্যদিকে, আসন্ন দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিকেও রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি।
শনিবার (১০ অক্টোবর) রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও দুর্গাপূজার নিরাপত্তা—এই দুই বিষয়কে কেন্দ্র করে আলোচনা হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শুরু হয়ে রাত ৯টা পর্যন্ত চলা বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি, নির্বাচনের পরিবেশ, সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং তৃণমূলের ঐক্য ধরে রাখার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য দলের নেতাকর্মীদের নিজ নিজ এলাকায় সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রস্তুতি আগে, ভোট পরে
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অবস্থান হলো, নির্বাচনের জন্য তাড়াহুড়ো না করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গুছিয়ে নেওয়া। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি প্রয়োজন বলে মনে করছেন দলটির নীতিনির্ধারকেরা।
বৈঠকে নির্বাচন কমিশনের সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণার বিষয়টি আলোচনায় এলে কয়েকজন সদস্যের পক্ষ থেকে বলা হয়, নির্বাচনের প্রস্তুতি ও সময়সূচি নির্ধারণের আগে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় দায়িত্ব প্রদানসহ প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া জরুরি। এ কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে আরও সময় নেওয়ার পক্ষে মত দেন তাঁরা।
তবে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের পক্ষেও মত দিয়েছেন কয়েকজন নেতা। তাঁদের মতে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে নির্বাচন প্রয়োজন। তাই প্রস্তুতি সম্পন্ন করে যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
অর্থাৎ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির আলোচনায় নির্বাচন নিয়ে দুটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে—একদিকে দ্রুত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার প্রয়োজন, অন্যদিকে নির্বাচনের আগে প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করা।
দলীয় প্রতীক না থাকায় তৃণমূলে কোন্দলের শঙ্কা
স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিএনপির জন্য কেবল জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয় নয়, তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তি ও দলীয় ঐক্য ধরে রাখারও পরীক্ষা। দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচন হওয়ায় একই পদে বিএনপির একাধিক নেতা প্রার্থী হতে পারেন। এতে দলীয় ভোট বিভক্ত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের বিরোধ ও কোন্দল বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দলীয় সূত্র জানায়, এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সম্ভাব্য বিরোধগুলো আগেভাগে আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসার নির্দেশনা দিয়েছেন তারেক রহমান। নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতির পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে নেতাদের মধ্যে সমন্বয় এবং গ্রহণযোগ্য প্রার্থী নির্ধারণের বিষয়টিও দলটির সাংগঠনিক আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
এ লক্ষ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভী ও ইসমাইল জবিউল্লাহ সম্প্রতি জেলা, মহানগর, উপজেলা ও পৌরসভার শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকের বিষয়বস্তু স্থায়ী কমিটির সভায় তুলে ধরা হয়। ঢাকা বিভাগের নেতাদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনামূলক বৈঠকও শিগগিরই করা হবে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের কাছে এখন বড় বিবেচনা হলো, নির্বাচনের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ যেন নির্বাচনী সংঘাতে রূপ না নেয়। স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থী নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু নির্বাচনে নয়, পরবর্তী সময়ে দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রমেও পড়তে পারে।
দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় মাঠপর্যায়ে নজরদারি
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কৌশল নির্ধারণের পাশাপাশি দুর্গাপূজার নিরাপত্তাকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে বিএনপি। দলীয় সূত্র জানায়, পূজাকে কেন্দ্র করে কেউ সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি কিংবা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে সিদ্ধান্তের বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দলের নেতাদের নিজ নিজ এলাকার পূজামণ্ডপ পরিদর্শন, পূজা উদযাপন কমিটির সঙ্গে সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। স্থায়ী কমিটির সদস্য, মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট নেতাদের এ কাজে সম্পৃক্ত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দলটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্থানীয় পূজা উদযাপন কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে বিএনপির নেতাকর্মীরা স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকা পালন করবেন। পূজামণ্ডপে হামলা, নাশকতা কিংবা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির আশঙ্কা মোকাবিলায় মন্দিরভিত্তিক কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ এবং সার্বক্ষণিক নজরদারির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীরাও সতর্ক থাকবেন, যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তা প্রতিরোধে দ্রুত সমন্বয় করা যায়।
‘নীলনকশা ও ষড়যন্ত্র’ নিয়ে রিজভীর বক্তব্য
বৈঠক শেষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা যাতে নির্বিঘ্নে দুর্গাপূজা উদযাপন করতে পারেন এবং উৎসবের আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন, তা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, স্থানীয় পূজা উদযাপন কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে সারা দেশের পূজামণ্ডপে বিএনপির নেতাকর্মীরা স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকা পালন করবেন। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি দুর্গাপূজা পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং এর আগেও বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রিজভীর ভাষ্য, দেশের বিরুদ্ধে এবং গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে কেউ কেউ নানা ধরনের নীলনকশা করছেন। অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় সরকারকে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। একই সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদেরও সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, পূজামণ্ডপগুলোতে নেতাকর্মীরা ‘ঘুমহীন প্রহরীর মতো’ স্বেচ্ছাসেবক ও প্রহরীর ভূমিকা পালন করবেন। পূজার নিরাপত্তায় ইতিমধ্যে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং সামনে কী করণীয়, তা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
রিজভী আরও জানান, দলের পরবর্তী সাংগঠনিক কার্যক্রম কীভাবে জোরদার করা যায়, সে বিষয়েও স্থায়ী কমিটির সদস্যরা আলোচনা করেছেন।
রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দুই সমীকরণ
বৈঠকের আলোচনা থেকে স্পষ্ট, বিএনপির সামনে এখন দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক বিবেচনা রয়েছে। প্রথমত, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে তৃণমূলের নেতৃত্বের বিরোধ ও সম্ভাব্য ভোট বিভক্তি সামাল দেওয়া। দ্বিতীয়ত, দুর্গাপূজার নিরাপত্তা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় দলীয় নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখা।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দলটি প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও অভ্যন্তরীণ সমন্বয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে, দুর্গাপূজার নিরাপত্তা নিয়ে মাঠপর্যায়ে নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। ফলে বৈঠকটি শুধু তাৎক্ষণিক দুটি ইস্যুর আলোচনা নয়; বরং দলটির সাংগঠনিক তৎপরতা ও রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতির সঙ্গেও সম্পর্কিত।
বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, রুহুল কবির রিজভী, আমান উল্লাহ আমান, অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার ও ইসমাইল জবিউল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।

























