মানববর্জ্য বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল, প্রকল্পে সহযোগিতার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৫:২৭:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে
মানববর্জ্য, পয়ঃশোধনাগারের বর্জ্য, রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশ থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের উদ্ভাবনী প্রকল্প বাস্তবায়নে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হলে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে আশা করছেন গবেষকেরা।
শনিবার (১০ অক্টোবর) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের এই উদ্ভাবনী প্রকল্পের প্রদর্শনী পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী সহযোগিতার আশ্বাস দেন। প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) এ তথ্য জানান।
প্রদর্শনীতে গবেষকেরা তাঁদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি, দীর্ঘদিনের গবেষণার অগ্রগতি এবং বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে জ্বালানি তেল উৎপাদনের সম্ভাবনা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। প্রকল্পটির কার্যক্রম ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর এর সম্ভাবনা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন তিনি।
প্রকল্পটির গবেষক খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান মানববর্জ্য, পয়ঃশোধনাগারের বর্জ্য, রান্নাঘরের বর্জ্য এবং কৃষিজ অবশিষ্টাংশ থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের প্রযুক্তিগত দিকগুলো তুলে ধরেন।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০ বছর ধরে পরিচালিত এ গবেষণায় ‘হাইড্রোথার্মাল লিকুইফ্যাকশন’ (এইচটিএল) প্রযুক্তি ব্যবহার করে বর্জ্য থেকে জৈব অপরিশোধিত তেল বা বায়োক্রুড উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
গবেষণাগারের পরীক্ষায় বর্জ্য থেকে ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বায়োক্রুড উৎপাদনের ফল পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ডিজেলসমৃদ্ধ বায়োক্রুড উৎপাদনেও সাফল্য এসেছে বলে প্রধানমন্ত্রীকে জানান গবেষকেরা।
তবে গবেষণাগারে পাওয়া এই ফলকে বাণিজ্যিক উৎপাদনের সাফল্যে রূপ দিতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং উৎপাদন ব্যয় যাচাই প্রয়োজন।
গবেষণার পরবর্তী ধাপে প্রতিদিন ১ থেকে ৩ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণে সক্ষম একটি পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত এই প্ল্যান্টের মাধ্যমে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা, উৎপাদন ব্যয় এবং বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে।
গবেষকদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপনে আনুমানিক ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এই পর্যায়ে প্রযুক্তিটির বাস্তব প্রয়োগ, উৎপাদনের ধারাবাহিকতা এবং অর্থনৈতিক কার্যকারিতা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষকদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা পাওয়া গেলে গবেষণাগারের পর্যায় থেকে প্রযুক্তিটিকে শিল্প উৎপাদনের পর্যায়ে নেওয়ার পথ তৈরি হবে।
প্রযুক্তিটি বৃহৎ পরিসরে বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।
তাঁদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হলে বছরে আনুমানিক ৬ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতে পারে।
তবে এই হিসাব সম্ভাব্য উৎপাদন ও সম্প্রসারণের ওপর নির্ভরশীল। বাস্তবে কতটা তেল উৎপাদন করা যাবে, উৎপাদিত বায়োক্রুডের গুণগত মান কেমন হবে এবং প্রচলিত জ্বালানির বিকল্প হিসেবে তা কতটা ব্যবহারযোগ্য হবে—এসব বিষয় পাইলট প্ল্যান্টের পরীক্ষায় যাচাই করতে হবে।
প্রকল্পটি সফলভাবে বাণিজ্যিক পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব হলে দেশের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে—একদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অন্যদিকে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা।
মানববর্জ্য ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশের মতো উপকরণকে জ্বালানি উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা গেলে বর্জ্যের কার্যকর ব্যবহার বাড়বে। একই সঙ্গে পরিবেশদূষণ কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং দেশীয় জ্বালানি শিল্পের বিকাশের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এসব সুফল নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিটির বৃহৎ পরিসরে কার্যকারিতা, পরিবেশগত প্রভাব, উৎপাদন ব্যয় এবং বাণিজ্যিক স্থায়িত্ব যাচাই করা জরুরি। গবেষণাগারের সাফল্যকে বাস্তব উৎপাদনে রূপ দিতে পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপন তাই প্রকল্পটির গুরুত্বপূর্ণ পরবর্তী ধাপ।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সরকারি সহযোগিতার আশ্বাস গবেষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এখন গবেষণার ফলকে কার্যকর ও অর্থনৈতিকভাবে টেকসই উৎপাদনব্যবস্থায় রূপ দেওয়াই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।
প্রদর্শনীতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল মাহমুদ টুকু, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পাবলিক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সদস্য অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন, কুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাছুদ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

























