পাহাড়-ঝরনা-পাথরের সৌন্দর্যে ভাটা, সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলো কি হারাচ্ছে রূপ?

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৩:৪৯:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা স্বচ্ছ জলধারা, নদীতে ছড়িয়ে থাকা সাদা পাথর, দূরে মেঘে ঢাকা পাহাড় আর চারপাশে সবুজের সমারোহ—প্রকৃতির এমন বৈচিত্র্যই সিলেটকে দিয়েছে ‘প্রকৃতিকন্যা’র পরিচয়।
জাফলং, সাদাপাথর, বিছানাকান্দি, রাতারগুল, লালাখাল কিংবা পান্তুমাই—প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রের সৌন্দর্য আলাদা। কিন্তু প্রকৃতির এই অপরূপ উপহারই এখন নানা মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডে হুমকির মুখে।
বালু-পাথর উত্তোলন, পাহাড় কাটা, প্লাস্টিক ও বর্জ্য ফেলা, অপরিকল্পিত স্থাপনা এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতার কারণে একের পর এক পর্যটনকেন্দ্র হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে প্রকৃতিনির্ভর সিলেটের পর্যটনই বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
জাফলংয়ে প্রকৃতির সঙ্গে বাড়ছে চাপ
সিলেটে ঘুরতে আসা পর্যটকদের তালিকার শীর্ষেই থাকে জাফলং। সীমান্তের ওপারে সারি সারি পাহাড়, পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনা, পিয়াইনের স্বচ্ছ জলরাশি, ডাউকি ঝুলন্ত সেতু, মায়াবি ঝর্ণা ও খাসিয়া সম্প্রদায়ের জীবনযাপন—সব মিলিয়ে জাফলংয়ের আকর্ষণ আলাদা।
তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালেই তৈরি হয়েছে পরিবেশের চাপ। বালু-পাথর উত্তোলন, দখল এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের কারণে পরিবেশগত সংকট বাড়ছে। ফলে পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষিত জাফলংয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সাদাপাথরের সৌন্দর্যেও কালো ছায়া
জাফলংয়ের পর পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য সাদাপাথর। সাদা পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া স্বচ্ছ জলধারা, পাহাড় আর মেঘের মেলবন্ধন এখানে তৈরি করে অনন্য দৃশ্য।
কিন্তু অবাধে বালু-পাথর উত্তোলনের অভিযোগে সেই সৌন্দর্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ধলাই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
অন্যদিকে বিছানাকান্দির পরিস্থিতি নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা, পাথর উত্তোলন এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনার নানা সীমাবদ্ধতায় জায়গাটির স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও আকর্ষণ কমছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাতারগুলে হুমকিতে জীববৈচিত্র্য
সিলেটের পর্যটনে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে রাতারগুলের মিঠাপানির জলাবন। বর্ষায় পানিতে ডুবে থাকা গাছপালা, নৌকার চলাচল, পাখির ডাক আর নীরব পরিবেশ পর্যটকদের টানে।
কিন্তু পর্যটকের চাপের সঙ্গে বাড়ছে পরিবেশগত ঝুঁকিও। অতিরিক্ত নৌযান চলাচল, পানিতে বর্জ্য ফেলা, শব্দদূষণসহ নানা অপরিকল্পিত কার্যক্রম জলাবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ তৈরি করছে।
লালাখাল-পান্তুমাইও নিরাপদ নয়
পাহাড়ঘেরা পান্নাসবুজ স্বচ্ছ পানির জন্য লালাখাল সিলেটের অন্যতম আকর্ষণ। নৌকায় করে স্বচ্ছ পানির ওপর ভ্রমণ পর্যটকদের জন্য তৈরি করে ভিন্ন অভিজ্ঞতা।
অন্যদিকে সীমান্তঘেঁষা পান্তুমাইয়ের ঝরনাও বর্ষায় হয়ে ওঠে আরও আকর্ষণীয়। পাহাড়ের বুক থেকে নেমে আসা জলধারার গর্জন দূর থেকেই শোনা যায়।
তবে এই দুই পর্যটনকেন্দ্রের প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় পর্যাপ্ত উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্ভাবনা আছে, পরিকল্পনা কোথায়?
সিলেটের পর্যটন শুধু পাহাড়, নদী কিংবা ঝরনায় সীমাবদ্ধ নয়। চা-বাগান, খাদিমনগর উদ্যান, হাকালুকি হাওর, শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.)-এর মাজারসহ ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনাও এই অঞ্চলের পর্যটন সম্ভাবনাকে সমৃদ্ধ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃতি, ইতিহাস, ধর্ম ও সংস্কৃতিকে সমন্বয় করে একটি দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা করা গেলে সিলেটের পর্যটন শিল্প স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তৈরি হতে পারে বিপুল কর্মসংস্থানও।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা বলেন, “সিলেটের পর্যটন প্রকৃতিনির্ভর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতেই এখানে পর্যটকরা আসেন। কিন্তু আমরা প্রকৃতি রক্ষার চেয়ে বিনাশে বেশি ব্যস্ত। এ অবস্থা চলতে থাকলে পর্যটনের সর্বনাশ ঘটবে। প্রকৃতি বাঁচলে সিলেটের পর্যটন বাঁচবে।”
যোগাযোগব্যবস্থাও বড় বাধা
পর্যটনের বিকাশে পরিবেশগত সংকটের পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থাকেও বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের দুরবস্থা, ট্রেনের টিকিটের সংকট এবং আকাশপথের তুলনামূলক বেশি ভাড়া অনেক পর্যটকের জন্য ভোগান্তি তৈরি করছে।
বিশেষ করে পরিবার নিয়ে ভ্রমণকারীদের যাতায়াতের ক্ষেত্রে এসব সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। ফলে পর্যটনকেন্দ্রের অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন পর্যটনকেন্দ্র তৈরির উদ্যোগ
সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে জেলা প্রশাসন কাজ করছে।
তিনি বলেন, সিলেটে নতুন পর্যটন সম্ভাবনা খুঁজে বের করার পাশাপাশি সেগুলো কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি জৈন্তাপুরে একটি সম্ভাবনাময় পর্যটনস্থানের সন্ধান পাওয়ার পর সেখানে রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সিলেট থেকে তামাবিল পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রকৃতির সৌন্দর্যই যখন সিলেটের পর্যটনের মূল আকর্ষণ, তখন সেই প্রকৃতিই যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, দীর্ঘমেয়াদে পর্যটনের ভবিষ্যৎও প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাই পর্যটন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষাই এখন সিলেটের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।






















