ঢাকা ১২:০৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
খালের পাড়ে হাঁটার পথ, সবুজায়ন ও সৌন্দর্যায়ন—নতুন রূপে ঢাকা ট্রাম্পের হুমকির পাল্টা ইরানের, ‘হামলা হলে আরও বড় যুদ্ধ’ নারীদের নিরাপদ যাতায়াতে বাড়ছে পিংক বাস সেবা যশোরে পুলিশের বিশেষ অভিযান, ৬২ মোটরসাইকেল আটক; ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ৫ এগ্রো ট্যুরিজমের নামে চরম ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের ফাঁদ কৃষকদের অবদানের স্বীকৃতিতে ‘রাষ্ট্রপতি কৃষি পুরস্কার’ চালুর উদ্যোগ ডেঙ্গুতে মারা গেলেন চিকিৎসক আঁচল রায় ইসিবি চত্বরে হামলার ঘটনায় চাঁদাবাজি-দখলদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন নাহিদ ইসলামের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরে এমপির নাম, প্রমাণ মিললে ব্যবস্থা: আমিনুল হক তত্ত্বাবধায়ক সরকারসহ তিন বিষয়ে গণভোট চায় বিএনপি

সাভারে বনভূমি ও কৃষিজমি দখলের তোড়জোড়

এগ্রো ট্যুরিজমের নামে চরম ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের ফাঁদ

বিশেষ প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:২৮:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৬৪ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সাভারের ছোট কালিয়াকৈর এলাকার কামালপুরে ১৭ একর বনভূমির জমিতে ‘এগ্রো ট্যুরিজম ও রিসোর্ট’ নামে একটি বাণিজ্যিক প্রকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। উদ্যোক্তাদের প্রচারণায় প্রকল্পটিকে আকর্ষণীয় ও পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ হিসেবে তুলে ধরা হলেও, সংশ্লিষ্ট জমির ব্যবহার ও অনুমোদন নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।

সার্বিক তথ্য পর্যালোচনায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বনভূমির জমিতে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং সরকারি ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

​নিচে প্রজেক্টটির প্রধান প্রধান নেতিবাচক ও ঝুঁকিপূর্ণ দিকগুলো তুলে ধরা হলো:

​১. বন বিভাগের জমি লিজের আইনি বৈধতা ও বড় ধরনের উচ্ছেদ ঝুঁকি
​বন আইন লঙ্ঘন: বাংলাদেশের সংবিধান ও বিদ্যমান বন আইন অনুযায়ী, সরকারি বনভূমি বা সাব-বিটের অন্তর্ভুক্ত জমি বাণিজ্যিক রিসোর্ট, পর্যটন বা ব্যক্তিস্বার্থমূলক প্রজেক্টের জন্য ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি।

​চুক্তির শর্তে অসচ্ছতা: বন বিভাগের জমি সাধারণত সামাজিক বনায়ন বা নির্দিষ্ট পরিবেশগত উদ্দেশ্যে সাময়িক চুক্তিতে দেওয়া হয়। সেখানে সদস্য বা কোনো বেসরকারি স্বত্বাধিকারীর নামে বাণিজ্যিক রিসোর্ট বা পশুপালনের দোহাই দিয়ে জমি ব্যবহারের দাবি আইনি পর্যালোচনায় টিকবে না। সরকার যেকোনো মুহূর্তে এই লিজ বাতিল করে জমি পুনঃদখল করতে পারে, যার ফলে প্রজেক্টের পুরো বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়বে।

​২. কৃষি জমি অকৃষি খাতে রূপান্তর ও পরিবেশগত ক্ষতি। রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণের জন্য পাশেই ব্যক্তিগত কৃষি জমি কেনার যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা দেশের “কৃষি জমি সুরক্ষা আইন”-এর চরম পরিপন্থী। উর্বর কৃষি জমিতে পাকা স্থাপনা নির্মাণ করে স্থানীয় খাদ্য উৎপাদন ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করা হচ্ছে।

​ইকো-সিস্টেম বিপর্যয়: সাভারের বিরুলিয়া ও বন বিট সংলগ্ন এলাকাটি প্রাকৃতিক লেক, বনাঞ্চল ও কৃষিজমির জন্য পরিচিত। এখানে প্রতিদিন শত শত পর্যটকের সমাগম, বর্জ্য নিষ্কাশন ও শব্দদূষণ স্থানীয় জীববৈচিত্র্য, পশুপাখি এবং বনাঞ্চলকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলবে।

​৩. ​স্বচ্ছতার অভাব: মাত্র ২০টি শেয়ার বিক্রি করে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ নেওয়ার কথা বলা হলেও প্রজেক্টের মোট বাজেট, লভ্যাংশ বণ্টন পদ্ধতি কিংবা জমি হস্তান্তরের কোনো স্পষ্ট ও আইনি ফ্রেমওয়ার্ক নেই।

​বিনিয়োগকারীদের জালিয়াতির আশঙ্কা: লিজ নেওয়া বনভূমির কোনো মালিকানা বিনিয়োগকারীদের দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে কোনো আইনি জটিলতায় প্রজেক্ট বন্ধ হয়ে গেলে সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা তাদের অর্থ ফেরত পাবেন না। কেবল ক্রয়কৃত সামান্য কৃষিজমির ওপর নির্ভর করে এত বড় রিসোর্ট চালানো একটি চরম অদূরদর্শী ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসায়িক মডেল।

​৪. ​ভুল বার্তা ও ছদ্মবেশী পর্যটন: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে পর্যটনের মাধ্যমে স্থানীয় কৃষকের লাভ হবে। কিন্তু বাস্তবে বন ও কৃষিজমি দখল করে কৃত্রিম রিসোর্ট বানালে স্থানীয় কৃষকরা নিজেদের মূল জীবিকা ও জমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

​কৃষির ক্ষতি: আধুনিক রিসোর্টের কোলাহল ও পর্যটকদের আনাগোনায় স্বাভাবিক চাষাবাদ ব্যাহত হবে এবং স্থানীয় গ্রামটির প্রাকৃতিক পরিবেশ চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে।

পরিশেষে ​সাভার বন বিটের পাশে কামালপুরের এই এগ্রো ট্যুরিজম প্রজেক্টটি একটি আইনি জটিলতায় ঘেরা ও পরিবেশবিরোধী উদ্যোগ। বনভূমির জমিতে রিসোর্ট পরিচালনা করা যেকোনো সময় সরকারি অভিযানের মুখে পড়তে পারে। পর্যাপ্ত আইনি অনুমোদন, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) ছাড়পত্র এবং স্পষ্ট আর্থিক গ্যারান্টি ছাড়া এই প্রজেক্টে শেয়ার কেনা বা বিনিয়োগ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

সাভারে বনভূমি ও কৃষিজমি দখলের তোড়জোড়

এগ্রো ট্যুরিজমের নামে চরম ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের ফাঁদ

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:২৮:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাভারের ছোট কালিয়াকৈর এলাকার কামালপুরে ১৭ একর বনভূমির জমিতে ‘এগ্রো ট্যুরিজম ও রিসোর্ট’ নামে একটি বাণিজ্যিক প্রকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। উদ্যোক্তাদের প্রচারণায় প্রকল্পটিকে আকর্ষণীয় ও পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ হিসেবে তুলে ধরা হলেও, সংশ্লিষ্ট জমির ব্যবহার ও অনুমোদন নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।

সার্বিক তথ্য পর্যালোচনায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বনভূমির জমিতে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং সরকারি ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

​নিচে প্রজেক্টটির প্রধান প্রধান নেতিবাচক ও ঝুঁকিপূর্ণ দিকগুলো তুলে ধরা হলো:

​১. বন বিভাগের জমি লিজের আইনি বৈধতা ও বড় ধরনের উচ্ছেদ ঝুঁকি
​বন আইন লঙ্ঘন: বাংলাদেশের সংবিধান ও বিদ্যমান বন আইন অনুযায়ী, সরকারি বনভূমি বা সাব-বিটের অন্তর্ভুক্ত জমি বাণিজ্যিক রিসোর্ট, পর্যটন বা ব্যক্তিস্বার্থমূলক প্রজেক্টের জন্য ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি।

​চুক্তির শর্তে অসচ্ছতা: বন বিভাগের জমি সাধারণত সামাজিক বনায়ন বা নির্দিষ্ট পরিবেশগত উদ্দেশ্যে সাময়িক চুক্তিতে দেওয়া হয়। সেখানে সদস্য বা কোনো বেসরকারি স্বত্বাধিকারীর নামে বাণিজ্যিক রিসোর্ট বা পশুপালনের দোহাই দিয়ে জমি ব্যবহারের দাবি আইনি পর্যালোচনায় টিকবে না। সরকার যেকোনো মুহূর্তে এই লিজ বাতিল করে জমি পুনঃদখল করতে পারে, যার ফলে প্রজেক্টের পুরো বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়বে।

​২. কৃষি জমি অকৃষি খাতে রূপান্তর ও পরিবেশগত ক্ষতি। রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণের জন্য পাশেই ব্যক্তিগত কৃষি জমি কেনার যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা দেশের “কৃষি জমি সুরক্ষা আইন”-এর চরম পরিপন্থী। উর্বর কৃষি জমিতে পাকা স্থাপনা নির্মাণ করে স্থানীয় খাদ্য উৎপাদন ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করা হচ্ছে।

​ইকো-সিস্টেম বিপর্যয়: সাভারের বিরুলিয়া ও বন বিট সংলগ্ন এলাকাটি প্রাকৃতিক লেক, বনাঞ্চল ও কৃষিজমির জন্য পরিচিত। এখানে প্রতিদিন শত শত পর্যটকের সমাগম, বর্জ্য নিষ্কাশন ও শব্দদূষণ স্থানীয় জীববৈচিত্র্য, পশুপাখি এবং বনাঞ্চলকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলবে।

​৩. ​স্বচ্ছতার অভাব: মাত্র ২০টি শেয়ার বিক্রি করে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ নেওয়ার কথা বলা হলেও প্রজেক্টের মোট বাজেট, লভ্যাংশ বণ্টন পদ্ধতি কিংবা জমি হস্তান্তরের কোনো স্পষ্ট ও আইনি ফ্রেমওয়ার্ক নেই।

​বিনিয়োগকারীদের জালিয়াতির আশঙ্কা: লিজ নেওয়া বনভূমির কোনো মালিকানা বিনিয়োগকারীদের দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে কোনো আইনি জটিলতায় প্রজেক্ট বন্ধ হয়ে গেলে সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা তাদের অর্থ ফেরত পাবেন না। কেবল ক্রয়কৃত সামান্য কৃষিজমির ওপর নির্ভর করে এত বড় রিসোর্ট চালানো একটি চরম অদূরদর্শী ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসায়িক মডেল।

​৪. ​ভুল বার্তা ও ছদ্মবেশী পর্যটন: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে পর্যটনের মাধ্যমে স্থানীয় কৃষকের লাভ হবে। কিন্তু বাস্তবে বন ও কৃষিজমি দখল করে কৃত্রিম রিসোর্ট বানালে স্থানীয় কৃষকরা নিজেদের মূল জীবিকা ও জমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

​কৃষির ক্ষতি: আধুনিক রিসোর্টের কোলাহল ও পর্যটকদের আনাগোনায় স্বাভাবিক চাষাবাদ ব্যাহত হবে এবং স্থানীয় গ্রামটির প্রাকৃতিক পরিবেশ চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে।

পরিশেষে ​সাভার বন বিটের পাশে কামালপুরের এই এগ্রো ট্যুরিজম প্রজেক্টটি একটি আইনি জটিলতায় ঘেরা ও পরিবেশবিরোধী উদ্যোগ। বনভূমির জমিতে রিসোর্ট পরিচালনা করা যেকোনো সময় সরকারি অভিযানের মুখে পড়তে পারে। পর্যাপ্ত আইনি অনুমোদন, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) ছাড়পত্র এবং স্পষ্ট আর্থিক গ্যারান্টি ছাড়া এই প্রজেক্টে শেয়ার কেনা বা বিনিয়োগ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।