‘অপ্রতিমকে আর ফিরে পাব না, তবে আর কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়’

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:২১:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
ছেলেকে হারানোর শোকের সঙ্গে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা নাহিদের মনে—কী কারণে হত্যা করা হলো তাঁর ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে?
হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা, কী উদ্দেশ্যে এবং পরিকল্পনাটি কীভাবে করা হয়েছিল—এসবের প্রকৃত কারণ তদন্ত করে বের করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। নিজের কিছু সন্দেহের কথাও জানিয়েছেন অপ্রতিমের মা। তবে সেগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলে মনে করেন তিনি।
বুধবার দুপুরে কুমিল্লার কোটবাড়ি গন্ধমতি এলাকায় নিজের বাসভবনে সাংবাদিকদের দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ড. নাহিদা। ছেলের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর এই প্রথম গণমাধ্যমের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেন তিনি। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন অপ্রতিমের বাবা ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার।
‘প্রতিশোধের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, খুঁজে দেখুক পুলিশ’
ড. নাহিদা বলেন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর থাকাকালে তিনি মাদকবিরোধী বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। তখন অনেককে আইনের আওতায় আনা হয়েছিল।
তাঁর ভাষ্য, একটি সূত্রের মাধ্যমে তিনি জানতে পেরেছেন, ওই সময় তুহিনের গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্যও ধরা পড়েছিল। এ ঘটনার সঙ্গে অপ্রতিম হত্যার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখার দাবি জানান তিনি।
ড. নাহিদার ভাষায়, তাঁর ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে ধীরে ধীরে কোনো পরিকল্পনা করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তকারীদের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদক সরবরাহের সঙ্গে জড়িতদের নিয়েও তাঁর সন্দেহের কথা জানান তিনি।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এগুলো তাঁর ধারণা ও সন্দেহ; হত্যার প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসতে হবে।
আসামিদের বয়স নিয়েও প্রশ্ন
হত্যা মামলায় অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে দেখানো দুই আসামির বয়স নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অপ্রতিমের মা।
তিনি বলেন, যাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে দেখানো হয়েছে, তাদের বয়স যথাযথভাবে পরীক্ষা করা উচিত। বয়সের কারণে যদি তাদের সংশোধনাগারে পাঠানো হয় এবং পরবর্তী সময়ে তারা বের হয়ে আবার পরিবারের জন্য নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করে—সেটিও ভাবতে হবে।
ড. নাহিদার বক্তব্য, আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি হলেও তিনি তাঁর সন্তানকে ফিরে পাবেন না। তাঁর মূল চাওয়া, এমন ঘটনার শিকার হয়ে যেন আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়।
ছেলের বন্ধুত্ব নিয়ে সতর্ক ছিলেন মা
অপ্রতিমের বন্ধু নির্বাচন নিয়ে আগে থেকেই সতর্ক ছিলেন বলে জানান ড. নাহিদা। ছেলেকে ব্যস্ত রাখতে স্কুলের পড়াশোনার পাশাপাশি দুইজন গৃহশিক্ষকও রাখা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
ছেলেকে প্রচলিত অর্থে শুধু ডাক্তার বা প্রকৌশলী বানানোর স্বপ্ন তাঁর ছিল না উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি চেয়েছিলেন অপ্রতিম পৃথিবী দেখুক, নিজের মতো করে শিখুক, ফটোগ্রাফি ও সাইক্লিংয়ের মতো বিভিন্ন কাজে যুক্ত হোক।
তবে ছেলে বয়সে বড়দের সঙ্গে মিশছে জানতে পারলে তিনি সতর্ক হতেন বলে জানান।
‘সিনিয়র-জুনিয়র বোধটাই ছিল না’
তুহিন গ্যাংয়ের সঙ্গে অপ্রতিমের ছবি ও টিকটক ভিডিও প্রসঙ্গেও কথা বলেন তাঁর মা।
ড. নাহিদা বলেন, অপ্রতিম ছোটবেলা থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সান্নিধ্যে বড় হয়েছে। ফলে তার কাছে সিনিয়র-জুনিয়রের আলাদা ধারণা ছিল না। সে অনেককেই নিজের ভাই বা আপনজন মনে করত।
বাইক নিয়ে অপ্রতিমের আগ্রহ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, আগে ছেলের মধ্যে বাইকের প্রতি এমন আগ্রহ দেখা যায়নি। সম্প্রতি কেউ তাকে এ বিষয়ে উৎসাহিত করেছে বা বাইকে চড়িয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
যেভাবে শেষ হয় অপ্রতিমের জীবন
গত ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার দুপুরে কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। পরদিন শনিবার দুপুরে সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
অপ্রতিম কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের মধ্যে দুজনকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। কিশোর বয়সী অপর দুজনকে পাঠানো হয়েছে সংশোধনাগারে।
এখন অপ্রতিমের পরিবারের প্রধান দাবি—হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রকৃত কারণ কী ছিল, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং কী উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হয়েছে, তদন্তের মাধ্যমে তা স্পষ্ট করা। মায়ের ভাষায়, সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই; অন্তত সত্যটা যেন সামনে আসে।





















