একাদশে ফাঁকা থাকবে লাখ লাখ আসন, সংকটে গ্রামের কলেজগুলো
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০৯:৩২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৭ বার পড়া হয়েছে
শহরমুখী অভিবাসন, শিক্ষার মানের বৈষম্য ও অপরিকল্পিতভাবে কলেজের অনুমোদন—এই তিন কারণে দেশের অনেক কলেজে একাদশ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী সংকট আরও গভীর হচ্ছে। বিপরীতে রাজধানী ও বিভাগীয় শহরের কিছু কলেজে ভর্তির চাপ থাকলেও দেশের বিভিন্ন এলাকার কলেজে খালি থাকছে বিপুলসংখ্যক আসন।
২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য দেশের কলেজ ও মাদ্রাসাগুলোতে আসন রয়েছে প্রায় ২৫ লাখ। অথচ ভর্তির আবেদন করেছেন প্রায় ১০ লাখ শিক্ষার্থী। ফলে অর্ধেকের বেশি আসন ফাঁকা থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের অধীনে একাদশ শ্রেণিতে আসন রয়েছে তিন লাখের বেশি। কিন্তু প্রথম ধাপে আবেদন করেছেন মাত্র ৯৩ হাজার শিক্ষার্থী। একই চিত্র বরিশাল শিক্ষা বোর্ডেও। সেখানে আসন সংখ্যা দেড় লাখের বেশি হলেও এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৪ হাজার ৫৫৫ জন।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু এবারের ফলাফল নয়, কয়েক বছর ধরেই একাদশ শ্রেণিতে আসন ফাঁকা থাকার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। গত শিক্ষাবর্ষে চার দফায় আবেদন নেওয়ার পরও ৫৮ দশমিক ৭ শতাংশ আসনে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক আসন খালি ছিল।
একসময় আসন সংকট, এখন শিক্ষার্থী সংকট
কয়েক বছর আগেও মাধ্যমিক পাসের পর কলেজে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের ভোগান্তিতে পড়তে হতো। ভালো কলেজে আসন পেতে প্রতিযোগিতা ছিল তীব্র। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন অনেক কলেজে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছে না।
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। পাসের হার ছিল ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। এর বিপরীতে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিযোগ্য আসনের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় শিক্ষার্থী সংকট তৈরি হওয়া অনেকটাই স্বাভাবিক ছিল।
কেন ফাঁকা হচ্ছে কলেজ?
শিক্ষা খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, অপরিকল্পিতভাবে কলেজের অনুমোদন বৃদ্ধি এই সংকটের অন্যতম কারণ। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কলেজ প্রতিষ্ঠা হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান এখন শিক্ষার্থী সংকটে পড়ছে।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু তাহের মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম বলেন, প্রয়োজন না থাকলেও অনেক এলাকায় রাজনৈতিক বিবেচনায় কলেজের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে শিক্ষকরা সংকটে পড়ছেন, অন্যদিকে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরীর মতে, শিক্ষার মান উন্নয়নের চেয়ে শুধু শিক্ষার বিস্তারকে গুরুত্ব দেওয়ার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গত দেড় দশকে দেশে কলেজের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শহরে চাপ, গ্রামে শূন্যতা
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শহর ও গ্রামের কলেজগুলোর মধ্যে মানগত পার্থক্য বাড়ছে। ঢাকাসহ বড় শহরের কিছু কলেজে ভর্তি হতে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বেশি। অন্যদিকে গ্রামের অনেক কলেজে ভালো শিক্ষক, নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষার ফলাফল ও অবকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন থাকায় শিক্ষার্থীরা সেখানে যেতে আগ্রহ হারাচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্রাম থেকে শহরে মানুষের স্থানান্তর। কর্মসংস্থান ও উন্নত শিক্ষার আশায় পরিবারগুলো শহরমুখী হওয়ায় গ্রামের কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে।
টিকে থাকা কঠিন হবে অনেক কলেজের
বিশেষ করে বেসরকারি কলেজগুলোর জন্য শিক্ষার্থী সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের আয়ের প্রধান উৎস শিক্ষার্থীদের ভর্তি ফি ও মাসিক বেতন। শিক্ষার্থী কমে গেলে আয় কমবে, যার প্রভাব পড়বে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ও প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে।
শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু ভর্তি সংকট নয়, দেশের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাকেও সামনে আনছে। ভবিষ্যতে কলেজের সংখ্যা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষার্থীর চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পনা না করলে সংকট আরও বাড়তে পারে।





















