ঢাকা ১২:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
পিয়াসের শেষ বিদায়ে কাঁদল মালিপাড়া, বাবাহারা ছোট্ট মেয়ে পুনঃনিরীক্ষণের ফল প্রকাশ, ফেল থেকে পাস ৪৫৮৫ জন বিদ্যুৎ খাতে ৪৫ হাজার কোটি টাকার বকেয়া: বেকায়দায় নতুন সরকার প্রতি ইউনিয়ন ও উপজেলায় পশুচিকিৎসক নিয়োগ দেবে সরকার: প্রতিমন্ত্রী টুকু ঠাকুরগাঁওয়ে লিগ্যাল এইড নিয়ে মানুষের অভিজ্ঞতা শুনল ইউএনডিপি বসুন্ধরা মেডিকেল সিটির শেয়ার বিক্রি মেলায় থাকছে আকর্ষণীয় ছাড় ও গাড়ি জয়ের সুযোগ ছেলের বিয়ের বাজার করে ফেরা হলো না, সড়কে প্রাণ গেল দম্পতির মেট্রোরেলের ৭৩০ বেয়ারিং প্যাডে ত্রুটি, ক্রিটিক্যাল মাত্র ২৭টিতে বাবা হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই প্রাণ গেল সৈনিক পিয়াসের ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির কনক্লেভে এআই ব্যবহারে দায়িত্বশীলতা ও একাডেমিক সততার ওপর জোর

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির কনক্লেভে এআই ব্যবহারে দায়িত্বশীলতা ও একাডেমিক সততার ওপর জোর

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:২২:৪২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৮ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিস্তারের এই সময়ে একাডেমিক ও গবেষণা সততা রক্ষায় দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন শিক্ষাবিদ, গবেষক ও নীতিনির্ধারকেরা। তাদের মতে, এআইকে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে এর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে; তবে কোনোভাবেই মানবিক বিচারবোধ, সৃজনশীলতা ও গবেষণার মৌলিকতাকে এর বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির মেরুল বাড্ডা ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত ‘একাডেমিক অ্যান্ড রিসার্চ ইন্টেগ্রিটি কনক্লেভ ২০২৬’-এ বক্তারা এসব কথা বলেন। আয়েশা আবেদ লাইব্রেরির উদ্যোগে আয়োজিত দিনব্যাপী এ কনক্লেভের প্রতিপাদ্য ছিল—‘এথিকস, কোয়ালিটি অ্যান্ড রেসপনসিবল অ্যাকাডেমিক প্র্যাকটিস ইন দ্য এআই এরা’।

কনক্লেভে নীতিনির্ধারক, শিক্ষক, গবেষক, গ্রন্থাগারিক, সাংবাদিক ও উচ্চশিক্ষা খাতের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনায় একাডেমিক সততা, গবেষণা নৈতিকতা, এআইয়ের দায়িত্বশীল ব্যবহার, প্রকাশনা নৈতিকতা, মূল্যায়ন পদ্ধতি, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং উচ্চশিক্ষায় সততা নিশ্চিতের কাঠামো উঠে আসে।

এআই ব্যবহারে প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মামুন আহমেদ। বক্তব্যে তিনি এআই ব্যবহারের জন্য সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা প্রণয়ন, শিক্ষকদের পদোন্নতি ব্যবস্থা সংস্কার, নৈতিকতা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে আরও বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেন।

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, নৈতিকতার মতো মানবিক মূল্যবোধকে সমাজে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন ধরনের বৈষম্যও তৈরি করছে—একদল মানুষ প্রযুক্তিটি দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারছেন, অন্যরা সেই সুযোগ বা সক্ষমতা থেকে পিছিয়ে পড়ছেন।

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর আরশাদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি এআইকে হুমকি নয়, সম্ভাবনা হিসেবে দেখে।

তিনি বলেন, এআইকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বরং প্রযুক্তিটিকে বুঝে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা ও গবেষণার জন্য অপরিহার্য একাডেমিক মান, সততা, মৌলিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এএফএম ইউসুফ হায়দার বলেন, এআইয়ের যুগে মানবিক বিচারবোধের গুরুত্ব কমেনি। এআইকে সহায়ক, অনুঘটক ও শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। তবে এটিকে কখনোই মানবিক বিচারবোধ, সৃজনশীলতা ও গবেষণার বিকল্প ভাবা যাবে না।

বেড়েছে এআইনির্ভর লেখা নিয়ে উদ্বেগ

কনক্লেভে বক্তব্য দেন টার্নইটিনের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ডিরেক্টর চৈতালি মৈত্র। জেনারেটিভ এআইয়ের বৈশ্বিক প্রভাব তুলে ধরে তিনি জানান, ২০২২ সালের শেষ দিকে চ্যাটজিপিটি চালুর পর জার্নালে নিবন্ধ জমা দেওয়ার হার ৪২ শতাংশ বেড়েছে।

তিনি আরও জানান, ২০২৪ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৭০ শতাংশের বেশি এআইসৃষ্ট লেখা থাকা জমাদানের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অফিস অব কমিউনিকেশন্সের ডিরেক্টর খায়রুল বাশার। তিনি বলেন, একাডেমিক সততা শুধু নকল প্রতিরোধ কিংবা নিয়ম মেনে চলার বিষয় নয়; এটি জ্ঞানের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা এবং এমন একটি পরিবেশ তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে সততা, দায়িত্ববোধ ও বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতূহল বিকশিত হতে পারে।

এআইয়ের সঙ্গে শেখার নতুন সুযোগ

কনক্লেভে ‘রেসপনসিবল এআই অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব অ্যাকাডেমিক ইন্টেগ্রিটি ইন হায়ার এডুকেশন’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরিজের ডিজিটাল ইনফ্রাস্ট্রাকচারের অ্যাসোসিয়েট ডিন ও ওপেন সোর্স প্রোগ্রামস অফিসের ডিরেক্টর এবং ওপেন ফোরাম ফর এআইয়ের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর সাঈদ চৌধুরী।

অনলাইনে যুক্ত হয়ে তিনি ওপেন সোর্সভিত্তিক মাল্টি-এলএলএম প্ল্যাটফর্ম ডায়েটরিখ অ্যানালাইসিস রিসার্চ এডুকেশন (ডেয়ার) নিয়ে আলোচনা করেন। শিক্ষার্থীরা কীভাবে এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এআইভিত্তিক প্রযুক্তি সম্পর্কে শেখা, পরিবর্তন ও জ্ঞান বিনিময়ের কাজ করছে, তা তুলে ধরেন তিনি।

এ ছাড়া ‘বিয়ন্ড কমপ্লায়েন্স: বিল্ডিং আ কালচার অব অ্যাকাডেমিক অ্যান্ড রিসার্চ ইন্টেগ্রিটি ইন দ্য এআই এরা’ শীর্ষক অধিবেশনেও একাডেমিক সততা নিয়ে আলোচনা হয়।

ইউল্যাবের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর সামসাদ মর্তূজা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে বিশ্বাসযোগ্য জ্ঞান উৎপাদন সম্ভব। এ জন্য তথ্য ও জ্ঞানের উৎসের স্বচ্ছতা, শক্তিশালী গবেষণা পদ্ধতি, দায়িত্বশীল তথ্য ব্যবহার, স্বচ্ছতা, স্বাধীন বিচার ও অর্থবহ পর্যালোচনা নিশ্চিত করা জরুরি।

আইইউবির ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর মোহাম্মদ তামিম একাডেমিক ও গবেষণা সততা নিশ্চিতে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রস্তাব দেন। তিনি সহজবোধ্য ও স্পষ্ট নীতিমালার পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিতের ওপর গুরুত্ব দেন।

নকল শনাক্তের চেয়ে প্রতিরোধে গুরুত্ব

‘স্ট্রেনদেনিং অ্যাকাডেমিক অ্যান্ড রিসার্চ ইন্টেগ্রিটি থ্রু পলিসি, প্র্যাকটিস অ্যান্ড টেকনোলজি ইন দ্য এআই এরা’ শীর্ষক সেশনটি পরিচালনা করেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ইকোনমিকস অ্যান্ড সোশাল সায়েন্সেস বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ও প্রক্টর রুবানা আহমেদ।

সেশনে ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের হিউম্যানিটারিয়ান রিসার্চ লিড প্রফেসর কাওসার আফসানা জনস্বাস্থ্য গবেষণায় সততার পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন। এগুলো হলো—বৈজ্ঞানিক কঠোরতা, তথ্যের নির্ভুলতা, স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীল প্রকাশনা ও জবাবদিহিতা।

বুয়েটের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর মোহাম্মদ আবদুল বাসিত বলেন, নকল শনাক্ত করার চেয়ে তা প্রতিরোধ করাই বেশি কার্যকর। এ জন্য সঠিক উদ্ধৃতি ও সূত্র ব্যবহারের শিক্ষা এবং তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ও আইকিউএসির ডেপুটি ডিরেক্টর স্বাক্ষর শতাব্দ বলেন, শিক্ষার্থীদের আজীবন শিক্ষার্থী হিসেবে গড়ে তুলতে আত্মসচেতনতা, পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা এবং ব্যবহারিক দক্ষতা বিকাশ জরুরি।

একাডেমিক সততায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে লাইব্রেরি

আয়েশা আবেদ লাইব্রেরির পক্ষে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিয়ান হাসিনা আফরোজ বলেন, একাডেমিক ও গবেষণা সততা রক্ষায় লাইব্রেরিগুলোর ভূমিকা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি এআই বিষয়ে সচেতনতা, সমালোচনামূলক অনুসন্ধান ও দায়িত্বশীল শিক্ষাচর্চার ওপর ভিত্তি করে একটি কাঠামো তুলে ধরেন।

দিনব্যাপী কনক্লেভের শেষ হয় ‘বিল্ডিং অ্যান ইন্টেগ্রিটি কালচার: ইনস্টিটিউশনাল চ্যালেঞ্জেস, পলিসি অ্যান্ড প্র্যাকটিস’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের মধ্য দিয়ে। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সেন্ট্রাল রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন অফিসের ডিরেক্টর প্রফেসর মলয় কান্তি মৃধা।

আলোচনার শেষে জাতীয় পর্যায়ে একাডেমিক ও গবেষণা সততা নিশ্চিত করতে একটি প্রাথমিক কাঠামোর জন্য কয়েকটি সুপারিশ প্রস্তাব করেন অংশগ্রহণকারীরা। এসব সুপারিশ সংকলন করে ভবিষ্যতে নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রণয়নের বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির কনক্লেভে এআই ব্যবহারে দায়িত্বশীলতা ও একাডেমিক সততার ওপর জোর

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:২২:৪২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিস্তারের এই সময়ে একাডেমিক ও গবেষণা সততা রক্ষায় দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন শিক্ষাবিদ, গবেষক ও নীতিনির্ধারকেরা। তাদের মতে, এআইকে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে এর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে; তবে কোনোভাবেই মানবিক বিচারবোধ, সৃজনশীলতা ও গবেষণার মৌলিকতাকে এর বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির মেরুল বাড্ডা ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত ‘একাডেমিক অ্যান্ড রিসার্চ ইন্টেগ্রিটি কনক্লেভ ২০২৬’-এ বক্তারা এসব কথা বলেন। আয়েশা আবেদ লাইব্রেরির উদ্যোগে আয়োজিত দিনব্যাপী এ কনক্লেভের প্রতিপাদ্য ছিল—‘এথিকস, কোয়ালিটি অ্যান্ড রেসপনসিবল অ্যাকাডেমিক প্র্যাকটিস ইন দ্য এআই এরা’।

কনক্লেভে নীতিনির্ধারক, শিক্ষক, গবেষক, গ্রন্থাগারিক, সাংবাদিক ও উচ্চশিক্ষা খাতের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনায় একাডেমিক সততা, গবেষণা নৈতিকতা, এআইয়ের দায়িত্বশীল ব্যবহার, প্রকাশনা নৈতিকতা, মূল্যায়ন পদ্ধতি, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং উচ্চশিক্ষায় সততা নিশ্চিতের কাঠামো উঠে আসে।

এআই ব্যবহারে প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মামুন আহমেদ। বক্তব্যে তিনি এআই ব্যবহারের জন্য সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা প্রণয়ন, শিক্ষকদের পদোন্নতি ব্যবস্থা সংস্কার, নৈতিকতা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে আরও বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেন।

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, নৈতিকতার মতো মানবিক মূল্যবোধকে সমাজে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন ধরনের বৈষম্যও তৈরি করছে—একদল মানুষ প্রযুক্তিটি দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারছেন, অন্যরা সেই সুযোগ বা সক্ষমতা থেকে পিছিয়ে পড়ছেন।

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর আরশাদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি এআইকে হুমকি নয়, সম্ভাবনা হিসেবে দেখে।

তিনি বলেন, এআইকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বরং প্রযুক্তিটিকে বুঝে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা ও গবেষণার জন্য অপরিহার্য একাডেমিক মান, সততা, মৌলিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এএফএম ইউসুফ হায়দার বলেন, এআইয়ের যুগে মানবিক বিচারবোধের গুরুত্ব কমেনি। এআইকে সহায়ক, অনুঘটক ও শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। তবে এটিকে কখনোই মানবিক বিচারবোধ, সৃজনশীলতা ও গবেষণার বিকল্প ভাবা যাবে না।

বেড়েছে এআইনির্ভর লেখা নিয়ে উদ্বেগ

কনক্লেভে বক্তব্য দেন টার্নইটিনের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ডিরেক্টর চৈতালি মৈত্র। জেনারেটিভ এআইয়ের বৈশ্বিক প্রভাব তুলে ধরে তিনি জানান, ২০২২ সালের শেষ দিকে চ্যাটজিপিটি চালুর পর জার্নালে নিবন্ধ জমা দেওয়ার হার ৪২ শতাংশ বেড়েছে।

তিনি আরও জানান, ২০২৪ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৭০ শতাংশের বেশি এআইসৃষ্ট লেখা থাকা জমাদানের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অফিস অব কমিউনিকেশন্সের ডিরেক্টর খায়রুল বাশার। তিনি বলেন, একাডেমিক সততা শুধু নকল প্রতিরোধ কিংবা নিয়ম মেনে চলার বিষয় নয়; এটি জ্ঞানের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা এবং এমন একটি পরিবেশ তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে সততা, দায়িত্ববোধ ও বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতূহল বিকশিত হতে পারে।

এআইয়ের সঙ্গে শেখার নতুন সুযোগ

কনক্লেভে ‘রেসপনসিবল এআই অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব অ্যাকাডেমিক ইন্টেগ্রিটি ইন হায়ার এডুকেশন’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরিজের ডিজিটাল ইনফ্রাস্ট্রাকচারের অ্যাসোসিয়েট ডিন ও ওপেন সোর্স প্রোগ্রামস অফিসের ডিরেক্টর এবং ওপেন ফোরাম ফর এআইয়ের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর সাঈদ চৌধুরী।

অনলাইনে যুক্ত হয়ে তিনি ওপেন সোর্সভিত্তিক মাল্টি-এলএলএম প্ল্যাটফর্ম ডায়েটরিখ অ্যানালাইসিস রিসার্চ এডুকেশন (ডেয়ার) নিয়ে আলোচনা করেন। শিক্ষার্থীরা কীভাবে এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এআইভিত্তিক প্রযুক্তি সম্পর্কে শেখা, পরিবর্তন ও জ্ঞান বিনিময়ের কাজ করছে, তা তুলে ধরেন তিনি।

এ ছাড়া ‘বিয়ন্ড কমপ্লায়েন্স: বিল্ডিং আ কালচার অব অ্যাকাডেমিক অ্যান্ড রিসার্চ ইন্টেগ্রিটি ইন দ্য এআই এরা’ শীর্ষক অধিবেশনেও একাডেমিক সততা নিয়ে আলোচনা হয়।

ইউল্যাবের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর সামসাদ মর্তূজা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে বিশ্বাসযোগ্য জ্ঞান উৎপাদন সম্ভব। এ জন্য তথ্য ও জ্ঞানের উৎসের স্বচ্ছতা, শক্তিশালী গবেষণা পদ্ধতি, দায়িত্বশীল তথ্য ব্যবহার, স্বচ্ছতা, স্বাধীন বিচার ও অর্থবহ পর্যালোচনা নিশ্চিত করা জরুরি।

আইইউবির ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর মোহাম্মদ তামিম একাডেমিক ও গবেষণা সততা নিশ্চিতে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রস্তাব দেন। তিনি সহজবোধ্য ও স্পষ্ট নীতিমালার পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিতের ওপর গুরুত্ব দেন।

নকল শনাক্তের চেয়ে প্রতিরোধে গুরুত্ব

‘স্ট্রেনদেনিং অ্যাকাডেমিক অ্যান্ড রিসার্চ ইন্টেগ্রিটি থ্রু পলিসি, প্র্যাকটিস অ্যান্ড টেকনোলজি ইন দ্য এআই এরা’ শীর্ষক সেশনটি পরিচালনা করেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ইকোনমিকস অ্যান্ড সোশাল সায়েন্সেস বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ও প্রক্টর রুবানা আহমেদ।

সেশনে ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের হিউম্যানিটারিয়ান রিসার্চ লিড প্রফেসর কাওসার আফসানা জনস্বাস্থ্য গবেষণায় সততার পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন। এগুলো হলো—বৈজ্ঞানিক কঠোরতা, তথ্যের নির্ভুলতা, স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীল প্রকাশনা ও জবাবদিহিতা।

বুয়েটের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর মোহাম্মদ আবদুল বাসিত বলেন, নকল শনাক্ত করার চেয়ে তা প্রতিরোধ করাই বেশি কার্যকর। এ জন্য সঠিক উদ্ধৃতি ও সূত্র ব্যবহারের শিক্ষা এবং তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ও আইকিউএসির ডেপুটি ডিরেক্টর স্বাক্ষর শতাব্দ বলেন, শিক্ষার্থীদের আজীবন শিক্ষার্থী হিসেবে গড়ে তুলতে আত্মসচেতনতা, পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা এবং ব্যবহারিক দক্ষতা বিকাশ জরুরি।

একাডেমিক সততায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে লাইব্রেরি

আয়েশা আবেদ লাইব্রেরির পক্ষে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিয়ান হাসিনা আফরোজ বলেন, একাডেমিক ও গবেষণা সততা রক্ষায় লাইব্রেরিগুলোর ভূমিকা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি এআই বিষয়ে সচেতনতা, সমালোচনামূলক অনুসন্ধান ও দায়িত্বশীল শিক্ষাচর্চার ওপর ভিত্তি করে একটি কাঠামো তুলে ধরেন।

দিনব্যাপী কনক্লেভের শেষ হয় ‘বিল্ডিং অ্যান ইন্টেগ্রিটি কালচার: ইনস্টিটিউশনাল চ্যালেঞ্জেস, পলিসি অ্যান্ড প্র্যাকটিস’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের মধ্য দিয়ে। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সেন্ট্রাল রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন অফিসের ডিরেক্টর প্রফেসর মলয় কান্তি মৃধা।

আলোচনার শেষে জাতীয় পর্যায়ে একাডেমিক ও গবেষণা সততা নিশ্চিত করতে একটি প্রাথমিক কাঠামোর জন্য কয়েকটি সুপারিশ প্রস্তাব করেন অংশগ্রহণকারীরা। এসব সুপারিশ সংকলন করে ভবিষ্যতে নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রণয়নের বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।