ঢাকা ১০:৩৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

‘বান্ধবীকে বিয়ে’ ছিল স্বপ্ন, স্তন অপসারণের পরই তরুণীর মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:০৭:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

বাম থেকে লিজার আগের ছবি ও সম্প্রতিক তোলা ছবিতে লিজার পরিবর্তনের পার্থক্য-ছবি: সংগৃহীত

বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ছোটবেলা থেকেই নিজেকে অন্যরকম মনে হতো রোজি আক্তার লিজার। মেয়েদের মতো পোশাক কিংবা সাজসজ্জার চেয়ে ছেলেদের মতো চলাফেরা, ছোট চুল—এসবেই যেন স্বস্তি খুঁজে পেতেন তিনি। জীবনের নানা সময়ে বিয়ের বন্ধনেও জড়িয়েছিলেন, কিন্তু কোনো সংসারই তাকে টানেনি। শেষ পর্যন্ত নিজের পরিচয় বদলে পুরুষ হিসেবে নতুন করে জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখেছিলেন ৩১ বছর বয়সী লিজা।

সেই স্বপ্ন পূরণের পথেও এগিয়েছিলেন তিনি। হরমোনের চিকিৎসার পাশাপাশি শরীরের পরিবর্তনের জন্য অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন। পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেও চিকিৎসার জন্য অর্থ নেওয়া হয়। কিন্তু যে অস্ত্রোপচারকে ঘিরে ছিল নতুন জীবনের স্বপ্ন, সেটিই শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল তার জীবন।

গত ৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে রাজধানীর পান্থপথের ইউনিহেলথ স্পেশালাইজড হাসপাতালে স্তন অপারেশন করানো হয় লিজার। কয়েক ঘণ্টা পরই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরদিন ভোর সাড়ে চারটার দিকে হাসপাতালেই মৃত্যু হয় তার।

লিজার মৃত্যুর খবর বাড়িতে পৌঁছানোর পর স্বজনদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। বরিশালের গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া গ্রামের বাড়িতে লাশ পৌঁছালে বিষয়টি নিয়ে এলাকায় শুরু হয় নানা আলোচনা। সন্ধ্যার মধ্যেই তড়িঘড়ি করে তাকে দাফন করা হয়।

লিজা ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রব হাওলাদার ও ফজিলা বেগমের মেয়ে। মেয়ের ছোটবেলার আচরণ ও পছন্দের কথা বলতে গিয়ে মা ফজিলা বেগমের কণ্ঠে ফুটে ওঠে দীর্ঘদিনের নানা দুশ্চিন্তা ও অসহায়তার কথা।

তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই লিজার কোনো ছেলেকে পছন্দ ছিল না। পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে দুবার বিয়ে দেওয়া হলেও কোনো সংসারেই তিনি থিতু হতে পারেননি। সংসার করার প্রতি তার আগ্রহ ছিল না বলেও জানান মা।

এরই মধ্যে লিজার জীবনে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন ঢাকার যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা জেমিনি ওরফে জেনিফা আক্তার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের পর দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। জেনিফা প্রায়ই লিজাদের বাড়িতে আসতেন এবং কখনো কখনো মাসের পর মাস সেখানে থাকতেন।

পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি জানতেন। তবে জেনিফা ধীরে ধীরে পরিবারের আপনজনের মতো হয়ে ওঠায় তার ওপর আস্থাও তৈরি হয়েছিল। এমনকি লিজার অস্ত্রোপচারের বিষয়েও পরিবারের পক্ষ থেকে জেনিফার ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তার মা।

জেনিফার ভাষ্য অনুযায়ী, লিজা দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় হরমোনের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। পুরুষ হিসেবে জীবন শুরু করার ইচ্ছা থেকেই অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। লিজার মা, বাবা ও বোন মিলে অস্ত্রোপচারের জন্য দেড় লাখ টাকা দেন।

গত ৩ সেপ্টেম্বর ইউনিহেলথ স্পেশালাইজড হাসপাতালে লিজাকে ‘সরফরাজ’ নামে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের নথিতে তাকে পুরুষ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। অস্ত্রোপচারের আগে সম্মতিপত্রে জেনিফা লিজার স্ত্রী হিসেবে স্বাক্ষর করেছিলেন বলে জানা গেছে।

তবে এই তথ্য জানতেন না লিজার বাবা আব্দুর রব হাওলাদার।

তার ভাষায়, জেনিফা যে সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করবেন এবং সেই স্বাক্ষরের ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার হবে—এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না। এমনকি মেয়ের নাম ‘সরফরাজ’ রাখা হয়েছে, সেটিও মৃত্যুর পর জানতে পারেন।

বাবার কাছে সবচেয়ে বড় আঘাত ছিল হয়তো অন্য জায়গায়। মেয়ের স্বপ্নের কথা তিনি জানতেন, কিন্তু সেই স্বপ্ন যে এত দ্রুত মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াবে, তা কখনো ভাবেননি।

আব্দুর রব বলেন, লিজা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পুরুষ হয়ে জেনিফাকে বিয়ে করার পরিকল্পনা করেছিল—এমন কথা তিনি মেয়ের মায়ের কাছ থেকে শুনেছিলেন।

অন্যদিকে হাসপাতালের দেওয়া মৃত্যু সনদে লিজার নাম ‘সরফরাজ’ এবং লিঙ্গ পুরুষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অস্ত্রোপচারের পর ঠিক কী কারণে তার মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে পরিবারের কাছে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই।

ঘটনাটি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। পরে হাসপাতালের জিএমও একই পরামর্শ দেন। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি পরে ফোন করবেন বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। এরপর একাধিকবার ফোন করা হলেও আর সাড়া পাওয়া যায়নি।

লিজার কাছে হয়তো সেই অস্ত্রোপচার ছিল নিজের মতো করে বাঁচার পথে একটি বড় পদক্ষেপ। নতুন পরিচয়ে নতুন জীবন শুরু করার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের প্রথম ধাপেই থেমে গেল সবকিছু।

৩১ বছরের একটি জীবন, বহুদিনের নিজের মতো করে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা, পরিবারের নানা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আর ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা স্বপ্ন—সবকিছুর শেষ হলো হাসপাতালের একটি কক্ষে।

এখন পড়ে আছে শুধু কিছু প্রশ্ন—অস্ত্রোপচারের পর ঠিক কী ঘটেছিল? কেন এত দ্রুত তার মৃত্যু হলো? আর যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি হাসপাতালে গিয়েছিলেন, সেই স্বপ্নের পথেই কি লুকিয়ে ছিল মৃত্যুর অজানা কারণ?

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

‘বান্ধবীকে বিয়ে’ ছিল স্বপ্ন, স্তন অপসারণের পরই তরুণীর মৃত্যু

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:০৭:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছোটবেলা থেকেই নিজেকে অন্যরকম মনে হতো রোজি আক্তার লিজার। মেয়েদের মতো পোশাক কিংবা সাজসজ্জার চেয়ে ছেলেদের মতো চলাফেরা, ছোট চুল—এসবেই যেন স্বস্তি খুঁজে পেতেন তিনি। জীবনের নানা সময়ে বিয়ের বন্ধনেও জড়িয়েছিলেন, কিন্তু কোনো সংসারই তাকে টানেনি। শেষ পর্যন্ত নিজের পরিচয় বদলে পুরুষ হিসেবে নতুন করে জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখেছিলেন ৩১ বছর বয়সী লিজা।

সেই স্বপ্ন পূরণের পথেও এগিয়েছিলেন তিনি। হরমোনের চিকিৎসার পাশাপাশি শরীরের পরিবর্তনের জন্য অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন। পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেও চিকিৎসার জন্য অর্থ নেওয়া হয়। কিন্তু যে অস্ত্রোপচারকে ঘিরে ছিল নতুন জীবনের স্বপ্ন, সেটিই শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল তার জীবন।

গত ৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে রাজধানীর পান্থপথের ইউনিহেলথ স্পেশালাইজড হাসপাতালে স্তন অপারেশন করানো হয় লিজার। কয়েক ঘণ্টা পরই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরদিন ভোর সাড়ে চারটার দিকে হাসপাতালেই মৃত্যু হয় তার।

লিজার মৃত্যুর খবর বাড়িতে পৌঁছানোর পর স্বজনদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। বরিশালের গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া গ্রামের বাড়িতে লাশ পৌঁছালে বিষয়টি নিয়ে এলাকায় শুরু হয় নানা আলোচনা। সন্ধ্যার মধ্যেই তড়িঘড়ি করে তাকে দাফন করা হয়।

লিজা ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রব হাওলাদার ও ফজিলা বেগমের মেয়ে। মেয়ের ছোটবেলার আচরণ ও পছন্দের কথা বলতে গিয়ে মা ফজিলা বেগমের কণ্ঠে ফুটে ওঠে দীর্ঘদিনের নানা দুশ্চিন্তা ও অসহায়তার কথা।

তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই লিজার কোনো ছেলেকে পছন্দ ছিল না। পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে দুবার বিয়ে দেওয়া হলেও কোনো সংসারেই তিনি থিতু হতে পারেননি। সংসার করার প্রতি তার আগ্রহ ছিল না বলেও জানান মা।

এরই মধ্যে লিজার জীবনে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন ঢাকার যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা জেমিনি ওরফে জেনিফা আক্তার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের পর দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। জেনিফা প্রায়ই লিজাদের বাড়িতে আসতেন এবং কখনো কখনো মাসের পর মাস সেখানে থাকতেন।

পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি জানতেন। তবে জেনিফা ধীরে ধীরে পরিবারের আপনজনের মতো হয়ে ওঠায় তার ওপর আস্থাও তৈরি হয়েছিল। এমনকি লিজার অস্ত্রোপচারের বিষয়েও পরিবারের পক্ষ থেকে জেনিফার ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তার মা।

জেনিফার ভাষ্য অনুযায়ী, লিজা দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় হরমোনের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। পুরুষ হিসেবে জীবন শুরু করার ইচ্ছা থেকেই অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। লিজার মা, বাবা ও বোন মিলে অস্ত্রোপচারের জন্য দেড় লাখ টাকা দেন।

গত ৩ সেপ্টেম্বর ইউনিহেলথ স্পেশালাইজড হাসপাতালে লিজাকে ‘সরফরাজ’ নামে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের নথিতে তাকে পুরুষ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। অস্ত্রোপচারের আগে সম্মতিপত্রে জেনিফা লিজার স্ত্রী হিসেবে স্বাক্ষর করেছিলেন বলে জানা গেছে।

তবে এই তথ্য জানতেন না লিজার বাবা আব্দুর রব হাওলাদার।

তার ভাষায়, জেনিফা যে সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করবেন এবং সেই স্বাক্ষরের ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার হবে—এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না। এমনকি মেয়ের নাম ‘সরফরাজ’ রাখা হয়েছে, সেটিও মৃত্যুর পর জানতে পারেন।

বাবার কাছে সবচেয়ে বড় আঘাত ছিল হয়তো অন্য জায়গায়। মেয়ের স্বপ্নের কথা তিনি জানতেন, কিন্তু সেই স্বপ্ন যে এত দ্রুত মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াবে, তা কখনো ভাবেননি।

আব্দুর রব বলেন, লিজা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পুরুষ হয়ে জেনিফাকে বিয়ে করার পরিকল্পনা করেছিল—এমন কথা তিনি মেয়ের মায়ের কাছ থেকে শুনেছিলেন।

অন্যদিকে হাসপাতালের দেওয়া মৃত্যু সনদে লিজার নাম ‘সরফরাজ’ এবং লিঙ্গ পুরুষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অস্ত্রোপচারের পর ঠিক কী কারণে তার মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে পরিবারের কাছে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই।

ঘটনাটি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। পরে হাসপাতালের জিএমও একই পরামর্শ দেন। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি পরে ফোন করবেন বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। এরপর একাধিকবার ফোন করা হলেও আর সাড়া পাওয়া যায়নি।

লিজার কাছে হয়তো সেই অস্ত্রোপচার ছিল নিজের মতো করে বাঁচার পথে একটি বড় পদক্ষেপ। নতুন পরিচয়ে নতুন জীবন শুরু করার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের প্রথম ধাপেই থেমে গেল সবকিছু।

৩১ বছরের একটি জীবন, বহুদিনের নিজের মতো করে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা, পরিবারের নানা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আর ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা স্বপ্ন—সবকিছুর শেষ হলো হাসপাতালের একটি কক্ষে।

এখন পড়ে আছে শুধু কিছু প্রশ্ন—অস্ত্রোপচারের পর ঠিক কী ঘটেছিল? কেন এত দ্রুত তার মৃত্যু হলো? আর যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি হাসপাতালে গিয়েছিলেন, সেই স্বপ্নের পথেই কি লুকিয়ে ছিল মৃত্যুর অজানা কারণ?