ঢাকা ০১:৩৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

হলি আর্টিজানে হামলা: চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষায় মামলা, আপিল শুনানি বাকি

জয়নাল আবেদিন
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:২১:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ১০ বছর পূর্ণ হচ্ছে বুধবার (১ জুলাই)। দেশের ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস এ হামলার মামলায় বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টের বিচার প্রক্রিয়া শেষ হলেও এখন চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে আপিল বিভাগের শুনানি।

রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, হলি আর্টিজানের ঘটনা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ হামলায় বেশ কয়েকজন বিদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। তাই মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে সশস্ত্র জঙ্গিরা হামলা চালায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির সদস্য ছিল।

ওই হামলায় ২০ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ছিলেন ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, একজন ভারতীয়, একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান দ্বৈত নাগরিক এবং দুই বাংলাদেশি। এছাড়া জঙ্গিদের ছোড়া গ্রেনেডে নিহত হন পুলিশের দুই কর্মকর্তা—তৎকালীন বনানী থানার ওসি সালাউদ্দিন আহমেদ ও সহকারী পুলিশ কমিশনার রবিউল ইসলাম।

জিম্মি সংকটের অবসানে পরিচালিত কমান্ডো অভিযানে নিহত হয় পাঁচ হামলাকারী। তারা হলেন মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ওরফে মামুন, নিবরাস ইসলাম, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল।

পরে তদন্তে নব্য জেএমবির আরও কয়েকজন সদস্যের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। বিভিন্ন অভিযানে নিহত হওয়া আটজনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এছাড়া অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবুল হাসনাত রেজা করিমও অব্যাহতি পান।

বিচারিক আদালতে সাতজনের মৃত্যুদণ্ড

হলি আর্টিজান হামলা মামলায় ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল একজনকে খালাস দিয়ে সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ, আব্দুস সবুর খান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, হাদিসুর রহমান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ এবং মামুনুর রশিদ। খালাস পান মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান।

পরে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। একই সঙ্গে আসামিরা আপিল করেন।

হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড বদলে আমৃত্যু কারাদণ্ড

২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে সাত আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। পরে ২০২৫ সালের ১৭ জুন ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।

এরপর আসামিরা আপিল বিভাগে আবেদন করেন। বর্তমানে মামলাটি আপিল বিভাগের শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, আপিল বিভাগে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। দ্রুত শুনানি ও নিষ্পত্তির বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের উদ্যোগ থাকবে। তবে বিচারপতির সংখ্যা ও মামলার চাপের কারণে কিছু বাস্তব জটিলতা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, হলি আর্টিজানের ঘটনা শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এর গুরুত্ব রয়েছে। সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই রাষ্ট্রপক্ষ কাজ করবে।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, হামলাকারীরা পরিকল্পিতভাবে নিরীহ মানুষকে জিম্মি করে আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক ও ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড চালায়। তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

আদালত বলেন, ঘটনাস্থলে থাকা পাঁচ হামলাকারী নিহত হওয়ায় তাদের বিচার সম্ভব হয়নি। তারা জীবিত থাকলে আইন অনুযায়ী তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হতে পারত।

তবে আপিলকারীরা সরাসরি হামলায় অংশ নেয়নি। তাদের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা, অর্থ ও অস্ত্র সংগ্রহ, হামলাকারীদের প্রশিক্ষণ ও প্ররোচনার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় তাদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আদালত মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে সাত আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।

এখন মামলার শেষ ধাপ হিসেবে আপিল বিভাগের শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে হলি আর্টিজান হামলা মামলা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

হলি আর্টিজানে হামলা: চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষায় মামলা, আপিল শুনানি বাকি

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:২১:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬

রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ১০ বছর পূর্ণ হচ্ছে বুধবার (১ জুলাই)। দেশের ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস এ হামলার মামলায় বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টের বিচার প্রক্রিয়া শেষ হলেও এখন চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে আপিল বিভাগের শুনানি।

রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, হলি আর্টিজানের ঘটনা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ হামলায় বেশ কয়েকজন বিদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। তাই মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে সশস্ত্র জঙ্গিরা হামলা চালায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির সদস্য ছিল।

ওই হামলায় ২০ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ছিলেন ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, একজন ভারতীয়, একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান দ্বৈত নাগরিক এবং দুই বাংলাদেশি। এছাড়া জঙ্গিদের ছোড়া গ্রেনেডে নিহত হন পুলিশের দুই কর্মকর্তা—তৎকালীন বনানী থানার ওসি সালাউদ্দিন আহমেদ ও সহকারী পুলিশ কমিশনার রবিউল ইসলাম।

জিম্মি সংকটের অবসানে পরিচালিত কমান্ডো অভিযানে নিহত হয় পাঁচ হামলাকারী। তারা হলেন মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ওরফে মামুন, নিবরাস ইসলাম, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল।

পরে তদন্তে নব্য জেএমবির আরও কয়েকজন সদস্যের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। বিভিন্ন অভিযানে নিহত হওয়া আটজনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এছাড়া অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবুল হাসনাত রেজা করিমও অব্যাহতি পান।

বিচারিক আদালতে সাতজনের মৃত্যুদণ্ড

হলি আর্টিজান হামলা মামলায় ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল একজনকে খালাস দিয়ে সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ, আব্দুস সবুর খান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, হাদিসুর রহমান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ এবং মামুনুর রশিদ। খালাস পান মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান।

পরে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। একই সঙ্গে আসামিরা আপিল করেন।

হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড বদলে আমৃত্যু কারাদণ্ড

২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে সাত আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। পরে ২০২৫ সালের ১৭ জুন ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।

এরপর আসামিরা আপিল বিভাগে আবেদন করেন। বর্তমানে মামলাটি আপিল বিভাগের শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, আপিল বিভাগে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। দ্রুত শুনানি ও নিষ্পত্তির বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের উদ্যোগ থাকবে। তবে বিচারপতির সংখ্যা ও মামলার চাপের কারণে কিছু বাস্তব জটিলতা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, হলি আর্টিজানের ঘটনা শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এর গুরুত্ব রয়েছে। সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই রাষ্ট্রপক্ষ কাজ করবে।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, হামলাকারীরা পরিকল্পিতভাবে নিরীহ মানুষকে জিম্মি করে আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক ও ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড চালায়। তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

আদালত বলেন, ঘটনাস্থলে থাকা পাঁচ হামলাকারী নিহত হওয়ায় তাদের বিচার সম্ভব হয়নি। তারা জীবিত থাকলে আইন অনুযায়ী তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হতে পারত।

তবে আপিলকারীরা সরাসরি হামলায় অংশ নেয়নি। তাদের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা, অর্থ ও অস্ত্র সংগ্রহ, হামলাকারীদের প্রশিক্ষণ ও প্ররোচনার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় তাদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আদালত মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে সাত আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।

এখন মামলার শেষ ধাপ হিসেবে আপিল বিভাগের শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে হলি আর্টিজান হামলা মামলা।