আন্ডারওয়ার্ল্ড: চাঁদা না দিলেই গুলি
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৫৪:৪৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬ ৭১ বার পড়া হয়েছে
রাজধানী ঢাকা— কোটি মানুষের ব্যস্ত নগরী। কিন্তু এই শহরের অন্ধকার জগত নিয়ন্ত্রণ করছে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র। ব্যবসা, জমি, টেন্ডার, পরিবহন কিংবা আবাসন— সবখানেই রয়েছে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী সিন্ডিকেটের প্রভাব। অভিযোগ উঠেছে, চাঁদা না দিলেই হামলা, গুলি কিংবা খুনের মতো ঘটনা ঘটানো হচ্ছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড আবারও সামনে এনেছে রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ডের ভয়ঙ্কর চিত্র।
২০২৫ সালের ১০ জুন পল্লবীর মিল্লাত ক্যাম্পে খুন হন রাকিবুল ইসলাম সানি ওরফে পেপার সানি। কয়েক মাস পর আদালত চত্বরে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় তারিক সাঈফ মামুনকে। একই বছরের ১৭ নভেম্বর সিসিটিভির সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে।
ভুক্তভোগী পরিবার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র ও ভাড়াটে খুনি সিন্ডিকেট।
গোলাম কিবরিয়ার পরিবারের অভিযোগ, রাজনৈতিক আধিপত্য ও চাঁদাবাজির বিরোধ থেকেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। তার স্ত্রী দাবি করেন, স্থানীয় প্রভাবশালী সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে।
র্যাব জানিয়েছে, কিবরিয়া হত্যা মামলায় জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বে বাধা দেওয়ায় তাকে টার্গেট করা হয়েছিল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর মিরপুর, পল্লবী ও ভাষানটেক এলাকায় সক্রিয় একটি শক্তিশালী অপরাধী নেটওয়ার্ক। ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রথমে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়, পরে হুমকি, আর শেষপর্যায়ে হামলা বা গুলির ঘটনা ঘটে।
এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। অভিযোগ করেও প্রতিকার পাওয়া যায় না।
ভুক্তভোগীদের দাবি, মিরপুর এলাকায় “ফোর স্টার গ্রুপ” নামে পরিচিত একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি, দখল, মাদক ব্যবসা ও ভাড়াটে খুনের সঙ্গে জড়িত। এই গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছে কালশী মামুন, কিলার ইব্রাহিম, শাহাদাত ও মোক্তার নামে কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী।
তাদের নিয়ন্ত্রণে শতাধিক সন্ত্রাসী কাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, বাড়ি নির্মাণ, ব্যবসা কিংবা জমি দখল— সবকিছুতেই তাদের অনুমতি লাগে। চাঁদা না দিলে হামলা বা গুলি করা হয়।
অপরাধ বিশ্লেষক কামরুল হাসান বলেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই এসব চক্র টিকে আছে। তার ভাষায়, “রাষ্ট্র চাইলে এসব নির্মূল করা সম্ভব। কিন্তু প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় তারা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে।”
র্যাব ও ডিবি বলছে, দেশের বাইরে অবস্থান করেও অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। আইনগত সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হলেও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড ও সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্র নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নজরদারি ও অভিযানের কথা জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম।
তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, কিছু ক্ষেত্রে বিদেশে অবস্থান করে বা আড়াল থেকে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হতে পারে। এজন্য টেলিফোনে হুমকি-ধামকিও দেওয়া হয়। আবার অনেক সময় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন গ্রুপ নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করে।
ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, এসব বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি রয়েছে। কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক আন্ডারওয়ার্ল্ড গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, গুলশান, উত্তরা, মতিঝিল, নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকা ভাগ হয়ে নিয়ন্ত্রণ করছে এসব চক্র।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ড এখন শুধু অপরাধ নয়, বরং একটি সমান্তরাল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে; যেখানে ভয়, টাকা ও ক্ষমতার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাখা হচ্ছে।





















