জাতিসংঘে তারেক রহমান: ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’ গড়তে চায় সরকার

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:১২:৫০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে
জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার প্রত্যয় জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দল-মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সব নাগরিকের সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে প্রথমবারের মতো বাংলায় দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
ভাষণে তারেক রহমান বলেন, নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমেই দেশের উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সামনে এখন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগিয়ে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশকে একটি ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে।
তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, স্টার্টআপ খাতে সহায়তার জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নে জোর
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু রাজনৈতিক গণতন্ত্র নয়, অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নও নিশ্চিত করতে চায়। যাতে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের কাছে পৌঁছায়।
তিনি বলেন, দেশের অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠী নারী। তাই নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিকে সরকারের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে এবং স্নাতক পর্যন্ত নারীদের বিনাবেতনে শিক্ষার সুযোগ উন্মুক্ত করা হয়েছে।
অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব সুবিধাকে একত্র করে ভবিষ্যতে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে পরিকল্পনা
তারেক রহমান বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। দেশের ইতিহাসে এবার শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষা খাতে জিডিপির বরাদ্দ ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করতে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ব্যাগ, ইউনিফর্ম ও বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শিক্ষা সিলেবাসে ‘স্পোর্টস’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
প্রযুক্তির বৈষম্য দূর করার আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও আধুনিক বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করছে। তবে প্রযুক্তির সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়।
তিনি বলেন, ডিজিটাল বিভাজন যেন ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভাজনে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি ও আধুনিক প্রযুক্তিতে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
এলডিসি উত্তরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চান
বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের পথে রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই উত্তরণকে টেকসই করতে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সহায়তা, বাজার সুবিধা, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধি।
তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোনো দেশ একা এগিয়ে যেতে পারে না। পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের মাধ্যমেই বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব।
শান্তি, রোহিঙ্গা ও জলবায়ু ইস্যুতে অবস্থান
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত ও মানবিক সংকটের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব সমস্যার সমাধান হতে হবে আলোচনা, কূটনীতি ও সহযোগিতার মাধ্যমে।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এই সংকটের মূল কারণ মিয়ানমারে, তাই সমাধানও সেখানেই নিহিত।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বৈশ্বিক উদ্যোগের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, সৌরশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকা
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদানের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবতার সেবায় কাজ করছেন। নারী শান্তিরক্ষীদের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
ভাষণের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তরুণদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ, নারীর আত্মনির্ভরতা এবং শিশুদের বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করে একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে।
‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।





















