রাতে ঘুম নেই, সকালে ক্লান্তি! ‘সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশন’-এর লক্ষণ চিনবেন যেভাবে

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০৬:০৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে
রাতে সহজে ঘুম আসছে না, সকালে ঘুম ভাঙলেও শরীরজুড়ে ক্লান্তি। কখনো আবার দীর্ঘক্ষণ ঘুমিয়েও কাটছে না অবসাদ। অনেকেই এসব সমস্যাকে অনিয়মিত জীবনযাপন বা ঘুমের ঘাটতি বলে এড়িয়ে যান। কিন্তু ঘুম ও জেগে থাকার স্বাভাবিক ছন্দের সঙ্গে অবসাদের কি কোনো সম্পর্ক রয়েছে? সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে অবসাদের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য, যাকে বলা হচ্ছে ‘সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশন’।
গবেষকদের মতে, শরীরের জৈবিক ঘড়ির সঙ্গে সম্পর্কিত এসব বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা গেলে অবসাদে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সমস্যা আরও ভালোভাবে বোঝা এবং তাঁদের উপযোগী চিকিৎসা বেছে নেওয়া সহজ হতে পারে। তবে ঘুমের অনিয়ম কিংবা সকালে ক্লান্তি অনুভব করলেই কারও এই ধরনের অবসাদ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না।
শরীরের জৈবিক ঘড়ির সঙ্গে অবসাদের সম্পর্ক কী?
মানবদেহে প্রায় ২৪ ঘণ্টার একটি জৈবিক ছন্দ কাজ করে, যা ঘুম ও জেগে থাকার সময়সহ শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। এই ছন্দকে বলা হয় ‘সার্কাডিয়ান রিদম’।
ঘুমের সময় অনিয়মিত হয়ে পড়লে কিংবা শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দের সঙ্গে দৈনন্দিন কাজের সময়ের অসামঞ্জস্য তৈরি হলে ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই ধরনের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে অবসাদেরও সম্পর্ক থাকতে পারে।
*দ্য ব্রিটিশ জার্নাল অব সাইকিয়াট্রি*তে প্রকাশিত এক গবেষণায় ১০ হাজারের বেশি অবসাদগ্রস্ত মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকেরা। তাঁদের লক্ষ্য ছিল, জৈবিক ঘড়ির সঙ্গে সম্পর্কিত উপসর্গের ভিত্তিতে অবসাদের কোনো স্বতন্ত্র ধরন চিহ্নিত করা যায় কি না।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশের মধ্যে সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশনের বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কোন লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে?
সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশনের বৈশিষ্ট্যযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ঘুমের সময় ও দৈনন্দিন কার্যক্রমের ছন্দে বিভিন্ন ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা যেতে পারে। যেমন—
- রাতে দেরিতে ঘুম আসা বা ঘুমানোর সময় পিছিয়ে যাওয়া।
- সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরও তীব্র ক্লান্তি অনুভব করা।
- স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সময় ঘুমানোর প্রবণতা।
- সকালে নির্ধারিত সময়ে উঠতে অসুবিধা হওয়া।
- কাজ বা পড়াশোনার সময়সূচির সঙ্গে ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দের অমিল তৈরি হওয়া।
- ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে অবসাদের উপসর্গের তারতম্য দেখা দেওয়া।
কাজ, পড়াশোনা বা সামাজিক বাধ্যবাধকতার কারণে সকালে উঠতে হলেও রাতে দেরিতে ঘুম আসার ফলে শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দের সঙ্গে দৈনন্দিন সময়সূচির যে অমিল তৈরি হয়, তাকে বলা হয় ‘সোশ্যাল জেট ল্যাগ’। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই অসামঞ্জস্য ঘুমের সমস্যা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তরুণ ও নারীদের মধ্যে বেশি দেখা গেছে
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশনের বৈশিষ্ট্যযুক্ত গোষ্ঠীর গড় বয়স ছিল ১৮ দশমিক ৭ বছর। অবসাদের অন্য ধরনে আক্রান্তদের গড় বয়স ছিল ২৩ দশমিক ২ বছর।
সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশনের বৈশিষ্ট্য থাকা গোষ্ঠীর প্রায় ৮০ শতাংশ ছিলেন নারী। এ ছাড়া তাঁদের মধ্যে অবসাদের উপসর্গ তুলনামূলক তীব্র হওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। কিছু ক্ষেত্রে আত্মহত্যার চিন্তা এবং বাইপোলার ডিসঅর্ডারের সঙ্গে সম্পর্কিত উপসর্গও বেশি পাওয়া গেছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব পরিসংখ্যান থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না যে তরুণ বা নারীদের মধ্যেই কেবল এ ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। একইভাবে, ঘুমের সময়ের পরিবর্তন কিংবা ক্লান্তি একাই কোনো মানসিক রোগের নিশ্চিত প্রমাণ নয়।
চিকিৎসায় কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশনের বৈশিষ্ট্য থাকা কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এসএসআরআই ও এসএনআরআই শ্রেণির প্রচলিত অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট ওষুধের কার্যকারিতা তুলনামূলক কম ছিল।
অন্যদিকে, শরীরের জৈবিক ঘড়ি ও ঘুমের ছন্দকে লক্ষ্য করে তৈরি কিছু চিকিৎসাপদ্ধতি তাঁদের ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে বলে গবেষকেরা ইঙ্গিত দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে লাইট থেরাপি, মেলাটোনিন এবং ঘুমের সময়সূচি নিয়ন্ত্রণের মতো পদ্ধতি।
তবে এসব পদ্ধতি সবার ক্ষেত্রে সমান কার্যকর হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো প্রয়োজন। কোন চিকিৎসা উপযুক্ত হবে, তা ব্যক্তির উপসর্গ, শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞকে নির্ধারণ করতে হয়।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
রাতে ঘুমের সমস্যা, সকালে ক্লান্তি কিংবা দিনের বেলায় অবসাদ অনেক কারণে হতে পারে। তাই এসব লক্ষণ দেখা দিলেই সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশন হয়েছে বলে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।
তবে দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকা, আগে ভালো লাগত এমন কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, অতিরিক্ত ঘুম বা অনিদ্রা এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে মনোযোগ দিতে অসুবিধা হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মনে রাখবেন: গবেষণাটি অবসাদের একটি সম্ভাব্য উপধরন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিলেও এর ফলাফল আরও যাচাই করা প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট ওষুধ বন্ধ করবেন না কিংবা নিজে থেকে মেলাটোনিন গ্রহণ শুরু করবেন না।





















