মৃত্যুদণ্ডের আগে ঢাকাকে জানায়নি সৌদি আরব, জবাব চেয়ে চিঠি

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৯:০৬:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে
মক্কার পবিত্র মসজিদে ‘অনৈতিক’ কাজের অভিযোগে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি আরব। কিন্তু এই দণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশ সরকারকে কিছুই জানানো হয়নি বলে দাবি করেছে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সূত্র। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর বিষয়টি জানতে পেরে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে ঘটনার বিস্তারিত জানতে চেয়েছে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মতো গুরুতর ঘটনায় বাংলাদেশ আগে থেকে কিছু না জানায় কনস্যুলার যোগাযোগ, বিচারপ্রক্রিয়ায় আইনি সহায়তা এবং বন্দীদের অধিকার রক্ষার বিষয়গুলো সামনে এসেছে। তবে দুই বাংলাদেশি কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের একটি সূত্র জানায়, সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পরই বিষয়টি কনস্যুলেটের নজরে আসে। এরপর ঘটনার বিস্তারিত জানতে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়।
সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) গত বুধবার দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশ করে। দণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশি হলেন নজরুল ইসলাম ও সুইটি আখতার।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক ও অশালীন কাজে লিপ্ত থাকার অভিযোগে তাঁদের গ্রেপ্তার করেছিল সৌদি নিরাপত্তা বাহিনী।
কয়েক মাস চলেছে বিচার, তবু জানত না বাংলাদেশ
গালফ নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিক তদন্ত শেষে দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে আদালতে পাঠানো হয়। শরিয়াহ আইনের ‘তাআজির’ বিধানের আওতায় বিচারক তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেন। মসজিদের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করা এবং অপরাধ সংঘটনের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এ রায় দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পরে উচ্চতর বিচারিক কর্তৃপক্ষ রায় বহাল রাখে এবং রাজকীয় আদেশে দণ্ড কার্যকর করা হয়।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে পবিত্র মসজিদের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ধর্মীয় পবিত্রতা লঙ্ঘনের ঘটনায় শরিয়াহ আইন প্রয়োগের বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে।
এদিকে সৌদি আরবে বেসরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, জেদ্দার আদালতে কয়েক মাস ধরে এই দুই বাংলাদেশির বিচারপ্রক্রিয়া চলছিল। বিচার চলাকালে বাংলাদেশের দুজন বিশিষ্ট নাগরিক দোভাষী হিসেবেও সহযোগিতা করেছেন বলে জানা গেছে।
বিচারপ্রক্রিয়া কয়েক মাস ধরে চললেও বাংলাদেশি কনস্যুলেট কেন বিষয়টি জানতে পারেনি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আটক হওয়ার পর দুই বাংলাদেশি কনস্যুলার সহায়তা চেয়েছিলেন কি না, তাঁদের পক্ষে কেউ বাংলাদেশ মিশনে যোগাযোগ করেছিলেন কি না—এসব বিষয় এখনো পরিষ্কার নয়।
কনস্যুলার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশ ও সৌদি আরব—দুই দেশই কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা সনদের পক্ষভুক্ত। সনদের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদেশে কোনো দেশের নাগরিক গ্রেপ্তার হলে বন্দীর অনুরোধে আটককারী দেশকে দ্রুত তাঁর দেশের কনস্যুলেটকে অবহিত করতে হয় এবং কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার সুযোগ দিতে হয়।
তবে এই ঘটনায় সনদের বিধান অনুযায়ী কনস্যুলেটকে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছিল কি না, তা এখনো জানা যায়নি। ফলে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত না করার বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট তথ্য জানা জরুরি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, সৌদি কর্তৃপক্ষ দুই বাংলাদেশিকে আটক করে দ্রুত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে—বিষয়টি এমন হওয়ার কথা নয়। তাঁদের পক্ষে কেউ বাংলাদেশ মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি কেন, সেটিও রহস্যজনক।
মরদেহ ফেরানো ও আইনি সহায়তার তথ্যও অজানা
নজরুল ইসলাম ও সুইটি আখতারের সৌদি আরবে অবস্থানের ধরন ও মেয়াদ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। বিচার চলাকালে তাঁরা আইনজীবীর সহায়তা পেয়েছিলেন কি না, আপিলের সুযোগ নিয়েছিলেন কি না কিংবা বাংলাদেশি কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও মেলেনি।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো চিঠির জবাব পাওয়ার পর এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানা যেতে পারে। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে অবহিত না করার কারণ এবং পুরো বিচারপ্রক্রিয়ায় দুই বাংলাদেশির অধিকার কীভাবে নিশ্চিত করা হয়েছিল, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হচ্ছে।
এখন সৌদি কর্তৃপক্ষের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ। সেই জবাবেই স্পষ্ট হতে পারে, দুই নাগরিকের বিচার ও দণ্ড কার্যকরের পুরো প্রক্রিয়ায় কী ঘটেছিল এবং কেন বিষয়টি আগে থেকে বাংলাদেশের কনস্যুলেটের জানা ছিল না।























