এসএসসির খাতা দেখায় গাফিলতি, শাস্তির মুখে ৮ হাজার শিক্ষক
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:৩০:১৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে
এসএসসির খাতায় যে নম্বর দেওয়া হয়েছিল, সেটিই কি শিক্ষার্থীর প্রকৃত প্রাপ্য নম্বর? ফল প্রকাশের পর পুনর্নিরীক্ষণে যখন হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ফল বদলে গেল, তখন সামনে এসেছে আরও বড় প্রশ্ন—উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময় কোথায়, কীভাবে এবং কার গাফিলতিতে এত ভুল হলো?
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নে ব্যাপক অসংগতি ধরা পড়ার পর দেশের ১১ শিক্ষা বোর্ডে প্রায় আট হাজার শিক্ষক এখন শাস্তির মুখে। কারও বিরুদ্ধে দুই বছর পর্যন্ত খাতা দেখার দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আবার ইচ্ছাকৃত অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশোধিত পাবলিক পরীক্ষা আইনে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে।
তবে এখানেই শেষ নয়। গত বছরের খাতা মূল্যায়নে গাফিলতির বিষয়টিও এবার তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—বছরের পর বছর খাতা মূল্যায়নের নামে যে ভুলগুলো হয়ে এসেছে, সেগুলোর কতটা নিছক অসাবধানতা আর কতটা ইচ্ছাকৃত?
লাখ লাখ খাতা পুনর্নিরীক্ষণ, বদলে গেল হাজারো ফল
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয় গত ১০ আগস্ট। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন।
ফল প্রকাশের পর ১১ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন নেওয়া হয়। আবেদন করে ৪ লাখ ২ হাজার ৫১ শিক্ষার্থী। একাধিক বিষয়ের জন্য আবেদনের কারণে মোট ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬টি উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের আওতায় আসে।
এরপর যে চিত্র সামনে আসে, তা খাতা মূল্যায়নের পদ্ধতি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।
পুনর্নিরীক্ষণের পর ৪ হাজার ৫৮৫ শিক্ষার্থী ফেল থেকে পাস করেছে। নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৭৯ জন। গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে ২৭ হাজার ৮৩৬ জনের। আর নম্বরই বদলে গেছে ৫৬ হাজার ২৫৯টি উত্তরপত্রে।
অর্থাৎ, ফল প্রকাশের পর পুনর্নিরীক্ষণ না হলে এসব শিক্ষার্থীর অনেকের ফলই হয়তো আগের অবস্থায় থেকে যেত।
‘ওভার মার্কিং’ না ‘আন্ডার মার্কিং’—কোথায় সীমারেখা?
এবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠছে—একজন পরীক্ষক কতটা বেশি বা কম নম্বর দিলে সেটিকে ‘ভুল’ বলা হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করতেই আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি একটি ‘পুনর্মূল্যায়ন নীতিমালা’ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। সেখানে ওভার মার্কিং অর্থাৎ অতিরিক্ত নম্বর এবং আন্ডার মার্কিং অর্থাৎ কম নম্বর দেওয়ার গ্রহণযোগ্য সীমা নির্ধারণ করা হবে।
সীমার বাইরে গিয়ে নম্বর দিলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষককে জবাবদিহির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে বোর্ডগুলোতে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি তুলে ধরা হবে। মন্ত্রণালয়ের সম্মতি পাওয়া গেলে নীতিমালা তৈরির জন্য কমিটি গঠন করা হবে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এই সীমা নির্ধারণের আগে যেসব শিক্ষক অতিরিক্ত বা কম নম্বর দিয়েছেন বলে শনাক্ত হয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে কোন মানদণ্ডে ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
যশোর বোর্ডে ১,৬৮৪ পরীক্ষক নজরদারিতে
খাতা মূল্যায়নে গাফিলতির অভিযোগে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে যশোর শিক্ষা বোর্ড। সেখানে ১ হাজার ৬৮৪ জন প্রধান পরীক্ষক ও পরীক্ষককে আগামী দুই বছর কোনো পাবলিক পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের দায়িত্ব না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
পুনর্নিরীক্ষণের পর এই বোর্ডে ২ হাজার ৪৩৬ পরীক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়েছে। ফেল থেকে পাস করেছে ৩৮০ জন। গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে ১ হাজার ৩০৪ জনের। নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭৫২ জন।
বোর্ড সূত্র বলছে, এই ফল বিশ্লেষণ করেই খাতা মূল্যায়নে গাফিলতি বা ভুল করা পরীক্ষকদের শনাক্ত করা হয়েছে।
যশোর বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম হোসেন আলী বলেছেন, নির্ভুল ফল প্রকাশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। খাতা মূল্যায়নে গাফিলতি বা ভুল করা পরীক্ষকদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। শৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করা হবে।
ভুল আর ইচ্ছাকৃত কারসাজি—এক পাল্লায় কি মাপা হবে?
এখানেই বিষয়টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সামনে আসে। একজন শিক্ষক অসাবধানতাবশত নম্বর দিতে ভুল করলেন, আর অন্যজন ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো শিক্ষার্থীর নম্বর বাড়িয়ে বা কমিয়ে দিলেন—দুই ঘটনাকে কি একইভাবে দেখা হবে?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণ ভুল, অসাবধানতা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে নম্বর বাড়ানো-কমানোর ঘটনা আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি। এ কারণেই ‘অনুচিত নম্বর’-এর একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অর্থাৎ, শুধু পুনর্নিরীক্ষণে নম্বর পরিবর্তন হয়েছে বলেই একজন পরীক্ষককে দোষী সাব্যস্ত করা হবে, নাকি তার মূল্যায়নের ধরন, ভুলের মাত্রা এবং ইচ্ছাকৃততার প্রমাণও যাচাই করা হবে—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।
আইনে এবার আরও কঠোর শাস্তির সুযোগ
খাতা মূল্যায়নে ইচ্ছাকৃত অনিয়ম প্রমাণিত হলে বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক শাস্তিতে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে।
গত ৭ জুলাই জাতীয় সংসদে অনুমোদিত সংশোধিত পাবলিক পরীক্ষা আইনে পাবলিক পরীক্ষার ফল বা মেধাতালিকায় হ্যাকিং কিংবা অবৈধ পরিবর্তনকে ‘ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন’ হিসেবে নতুন অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটিও জানিয়েছে, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে ওভার মার্কিং ও আন্ডার মার্কিংয়ের অভিযোগ তদন্তে কমিটি করা হবে। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশোধিত আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
শুধু খাতা নয়, প্রশ্ন উঠছে পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ে
এদিকে পরীক্ষা পরিচালনায় গাফিলতির অভিযোগে এসএসসি (ভোকেশনাল) ও দাখিল (ভোকেশনাল) পরীক্ষার ৩৪টি কেন্দ্রের সচিবকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড। গত রোববার জারি করা ওই নোটিশে ৭ অক্টোবরের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে।
ফলে খাতা মূল্যায়ন থেকে শুরু করে পরীক্ষা পরিচালনা—দুই ক্ষেত্রেই যখন একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা এই পাবলিক পরীক্ষা ব্যবস্থায় নজরদারি কতটা কার্যকর?
একটি ভুল নম্বর একজন শিক্ষার্থীর গ্রেড বদলে দিতে পারে, ফেল করিয়ে দিতে পারে, এমনকি তার পরবর্তী শিক্ষাজীবনের পথও পাল্টে দিতে পারে। পুনর্নিরীক্ষণে যখন হাজার হাজার ফল পরিবর্তনের প্রমাণ মিলছে, তখন শুধু কয়েক হাজার শিক্ষককে শাস্তি দিলেই কি সমস্যার সমাধান হবে?
নাকি এবার খুঁজে দেখা দরকার—খাতা মূল্যায়নে এই দীর্ঘদিনের গাফিলতির পেছনে আসলে কোথায় কাঠামোগত দুর্বলতা, আর কোথায় ইচ্ছাকৃত অনিয়ম?





















