উৎপাদন-মজুদ পর্যাপ্ত, তবু ২৩০ টাকা কেজি সুগন্ধি চাল—দাম বাড়ার নেপথ্যে কী?

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:৩৭:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
দেশে সুগন্ধি চালের উৎপাদন ভালো, সরকারি দাবি অনুযায়ী মজুদও পর্যাপ্ত। রপ্তানির অনুমোদিত কোটা অর্ধেক কমানো হয়েছে। তারপরও বাজারে কমছে না দাম। রাজধানীর খুচরা বাজারে পোলাওয়ের চাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২২০ থেকে ২৩০ টাকায়। ফলে সাধারণ ভোক্তার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বহুল ব্যবহৃত এই খাদ্যপণ্য।
দাম নিয়ন্ত্রণে এবার খুচরা ও পাইকারি বাজারে তদারকিতে নামছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানমের দাবি, জনগণের সামর্থ্যের মধ্যে সুগন্ধি চালের দাম রাখতে নজরদারি জোরদার করা হবে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—উৎপাদন ও মজুদ যদি পর্যাপ্তই থাকে, তাহলে বাজারে দাম এতটা বাড়ল কেন?
সরকারি তথ্যে দেখা যায়, ৪৫ হাজার টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন পেয়েছে ২৭৮টি কোম্পানি। অথচ গত তিন মাসে রপ্তানি হয়েছে মাত্র আড়াই হাজার টন। অর্থাৎ অনুমোদিত পরিমাণের তুলনায় বাস্তবে রপ্তানি হয়েছে খুবই সামান্য। এরপরও দেশের বাজারে দাম কমছে না। ফলে রপ্তানির সুযোগকে দাম বাড়ার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এর আগে সুগন্ধি চালের রপ্তানি উন্মুক্ত করার পর দেশের বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়ে দাম বাড়তে শুরু করে বলে অভিযোগ ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার রপ্তানির অনুমোদিত কোটা ৫০ শতাংশ কমিয়েছে। কিন্তু নীতিগত এই পদক্ষেপেরও বাজারদরে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েনি।
বরং এর প্রভাব এখন পড়ছে হোটেল-রেস্তোরাঁ ব্যবসায়। সুগন্ধি চালের দাম বাড়ায় পোলাও ও বিরিয়ানির দাম বেড়েছে, কমেছে বিক্রিও। ব্যবসায়ীদের দাবি, উৎপাদন ও সরবরাহের সংকটের চেয়ে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই দাম বৃদ্ধির বড় কারণ।
রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ফিরোজ আলম সুমনের অভিযোগ, কয়েকটি বড় করপোরেট গ্রুপ চাল মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। তাঁর দাবি, সরকার কার্যকরভাবে বাজার মনিটরিং করলে এক সপ্তাহের মধ্যেই দাম কমানো সম্ভব।
তবে এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে প্রয়োজন সরবরাহ চেইনের প্রতিটি ধাপের তথ্য। মিলার ও আমদানিকারক পর্যায় থেকে পাইকারি বাজার পর্যন্ত কী দামে চাল বিক্রি হচ্ছে, কারা কতটা মজুদ করছে, গুদামে কত চাল রয়েছে এবং বাজারে সরবরাহে কোথায় বাধা তৈরি হচ্ছে—এসব তথ্য প্রকাশ না হলে দাম বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হবে না।
একদিকে ভোক্তারা বাড়তি দামে চাল কিনছেন, অন্যদিকে রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাঁচামালের বাড়তি দামে তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। একজন ক্রেতার ভাষায়, ‘ইনকাম হয় তিন টাকা, খরচ হয় ১০ টাকা।’ এই আক্ষেপ শুধু একটি পণ্যের দাম বৃদ্ধির নয়, বরং সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তবতাকেই সামনে আনছে।
খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম অবশ্য বলছেন, দেশে সুগন্ধি চালের উৎপাদন ভালো এবং মজুদও পর্যাপ্ত। ফলে দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। জনগণ যাতে তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী খাদ্যপণ্য কিনতে পারেন, সে বিষয়েই সরকার কাজ করবে বলে জানান তিনি।
কিন্তু এখানেই বাজার ব্যবস্থাপনার বড় প্রশ্নটি সামনে আসে—মজুদ পর্যাপ্ত হলে সেই চাল বাজারে যাচ্ছে না কেন, আর বাজারে গেলে খুচরা পর্যায়ে এত বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কেন?
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবও সংকট তৈরি হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে সামগ্রিক ভোগ্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি নজরদারির তাগিদ দিয়েছে। ক্যাবের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন মনে করেন, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে বসে সমস্যার কারণ ও কীভাবে তা তৈরি হচ্ছে, তা খুঁজে বের করতে হবে।
বাংলাদেশের বাজারে একটি পণ্যের দাম একবার বাড়লে তা আগের অবস্থানে ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগে—এমন অভিযোগ ভোক্তাদের দীর্ঘদিনের। তাই এবার শুধু অভিযান বা সাময়িক নজরদারি নয়, সুগন্ধি চালের পুরো সরবরাহব্যবস্থায় কোথায় মূল্য বাড়ছে, কারা মজুদ করছে এবং কেন বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও দাম কমছে না—সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজাই হবে মূল পরীক্ষা।
কারণ সরকারি হিসাবেই যখন ৪৫ হাজার টন রপ্তানির অনুমোদনের বিপরীতে তিন মাসে রপ্তানি হয়েছে মাত্র আড়াই হাজার টন, তখন সুগন্ধি চালের বর্তমান দামের পেছনে রপ্তানি, মজুদ নাকি বাজারের মধ্যস্বত্বভোগী—কোনটি আসল কারণ, সেটিই এখন খতিয়ে দেখার বিষয়।


























