আশঙ্কাজনক হারে মরছে সুন্দরী গাছ! ৩০ শতাংশ আক্রান্ত পরগাছায়
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০২:১০:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬ ৫০ বার পড়া হয়েছে
সুন্দরবনের প্রধান বৃক্ষ Sundari tree এখন নতুন এক গুরুতর সংকটে পড়েছে বলে বন বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। আগা মরা রোগের পর এবার পরগাছার বিস্তার ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে সুন্দরী গাছ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বনবিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে সুন্দরবনের প্রায় ৩০ শতাংশ সুন্দরী গাছ এই পরজীবী আক্রমণে আক্রান্ত।
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি দেখা গেছে। স্থানীয় বনকর্মী ও গবেষকদের মতে, এসব এলাকায় ইতোমধ্যে হাজার হাজার গাছ মারা গেছে বা দুর্বল হয়ে পড়েছে। লতা জাতীয় এই পরগাছা গাছের কাণ্ড ও ডালপালা থেকে রস শোষণ করে ধীরে ধীরে গাছকে নিঃশেষ করে দেয়। ফলে পাতা হলুদ হয়ে ঝরে পড়ে এবং এক পর্যায়ে গাছ শুকিয়ে মারা যায়।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সুন্দরবন। বিশেষ করে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে সুন্দরী গাছের আগা মরা রোগ ও পরগাছার বিস্তার বেড়েই চলেছে। এই গাছ না থাকলে বনের জীববৈচিত্র্য যেমন হুমকিতে পড়বে, তেমনি জীবন-জীবিকা হারানো এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকবিলা করাও মুশকিল হয়ে পড়বে উপকূলবাসীর জন্য।
দেখা গেছে, পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা এবং চাঁদপাই রেঞ্জের বন ও লোকালয়ের ভেতর থেকে বয়ে যাওয়া এক সময়ের খরস্রোতা ভোলাসহ কয়েকটি নদী-খাল ভরাট হয়ে সরু খালে পরিণত হয়েছে।
এই নদীটি ভরাট হওয়ায় শরণখোলা রেঞ্জের দাসের ভারাণী ফরেস্ট টহল ফাঁড়ি থেকে চাঁদপাই রেঞ্জের নাংলী টহল ফাঁড়ি, ধানসাগর স্টেশন, জিউধরা স্টেশন, কদলমতেজী টহল ফাঁড়ি হয়ে জয়মনী পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার ভরাট হয়ে গেছে। এ কারণে এই নদীর নাম এখন মারা ভোলা নামে পরিচিত। ভোলা নদী ভরাট হওয়ার ফলে এর সঙ্গে সংযুক্ত খালগুলোও মরে যাচ্ছে। পানির স্বাভাবিক গতি কমে বৃদ্ধি পাচ্ছে লবণাক্ততা।

এর ফলে পূর্ব বনবিভাগের এই অঞ্চলে সুন্দরীসহ ম্যানগ্রোভ প্রজাতির অন্যান্য উদ্ভিদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে কমে গেছে।
বনবিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে সুন্দরবনে প্রায় ৩০ শতাংশ সুন্দরী গাছ পরগাছায় আক্রান্ত। এই পরগাছা একধরণের লতা জাতীয় উদ্ধিদ। যা সুন্দরীর মূল গাছ থেকে শুরু করে ডালপালাকে আঁকড়ে বেড়ে ওঠে। এই পরজীবী গাছের রস শোষণ করে বেঁচে থাকে।
ফলে ধীরে ধীরে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে পাতা হলুদ বর্ণ ধারণ করে ঝরে পড়ে। একসময় গাছটিও শুঁকিয়ে মারা যায়।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানিতেও লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুর্যোগের সময় অস্বাভাবিক জলোচ্ছ্বাসে বারবার প্লাবিত হয়ে পলি জমছে সুন্দরবনের উপরিভাগে। এর ফলে নানা প্রজাতির পরগাছা, লতাগুল্ম ও ছত্রাকের জন্ম হচ্ছে। আর এসব আগাছার বেশিরভাগই সুন্দীরকে আক্রমণ করছে। এছাড়া, বনের অভ্যন্তর ও পাশ থেকে বহমান নদ-নদী গুলো দিন দিন ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বনের তুলনা মূলক উঁচু এলাকায় পানি প্রবেশ করতে পারছে না। পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় কারণে সুন্দরী গাছে পরগাছা, ছত্রাক ও কীটপতঙ্গের আক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে আরো দুর্বল করে তুলছে সুন্দরীর অস্তিত্বকে।
সুন্দরী গাছ কমে গেলে গোটা ইকোসিস্টেমে ভেঙে পড়বে। সুন্দরীর গাছের গোড়ার শেকড়ে আশ্রয় নেয় নানা প্রজাতির মাছ ও চিংড়ি। গাছে আশ্রয় নেয় বানর এবং গাছের শাখা-প্রশাখায় বাসা বাঁধে নানাজাতের পাখপাখালি। বাঘ, হরিণসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর আশ্রয়স্থল এই সুন্দরী গাছ। বনের হরিণ ও অন্যসব বন্যপ্রাণী আবার সেই রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রধান খাদ্য। তাই সুন্দরী না থাকলে সমস্ত শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সুন্দরবনের ওপর ১০ লক্ষাধিক মানুষ সরাসরি নির্ভরশীল। এই বনই তাদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে অনেক ভূমিকা রয়েছে এই বনজ ও জলজ সম্পদের। তাছাড়া এসব সম্পদ আহরণ ও ব্যবহার করে নতুন নতুন ব্যাবসা-বাণিজ্য ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি হয়েছে উপকূলে। ফলে, সুন্দরী গাছ কমে গেলে শুধু জীববৈচিত্র্য নয়, অস্তিত্ব সংকটে পড়বে গোটা সুন্দরবন। মানুষের জীবন-জীবিকাও পড়বে হুমকির মুখে।
বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার বনসংলগ্ন খুড়িয়াখালী গ্রামের মৌয়াল মো. শাহজাহান আকন (৬০) ও মো. আউয়াল খাঁন (৫৫) বলেন, আমাতের একেকজন ৩০-৩৫ বছর ধুরি সুন্দরবনে মধু আহরণ করি। সুন্দরবনের সব জায়গা চেনা। এখন আর আগের মতো মধু পাইনে। বনের অনেক জায়গায় সুন্দরী গাছ নেই। ৫-৬ বছর আগেও যেসব জায়গায় ঘোন জঙ্গল ছেলো সেসব জাগা এখন ফাঁকা। বহু সুন্দরী গাছ শুকুই গেছে। আর মরা গাছে মৌমাছি চাক বান্দে না। এখন ৪-৫ কিলোমিটার হাঁটার পরও একটা মৌচাকের দেখা পাইনে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুন্দরবনের নানা পরিবর্তন পরিলক্ষতি হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে লবণাক্ততা বৃদ্ধি। এই লবণাক্তার কারণে বনের জীববৈচিত্র্যের বেশ ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে সুন্দরী গাছের আগামরা রোগের পাশাপাশি বর্তমানে পরগাছার আক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে গাছের বিন্যাস ও গঠনে পরিবর্তন আসছে। সুন্দরী বা ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ কমে গেলে সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সুন্দরবনে প্ল্যান্টেশনের সুযোগ নেই। বনের যেসব জায়গার গাছ মরে ফাঁকা হচ্ছে, সেসব স্থানে প্রাকৃতিকভাবেই অন্য কোনো গাছ দখল করছে। তবে, যে কারণেই হোক সুন্দরী গাছের সংখ্যা কমতে থাকলে একসময়, বনের জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও উপকূলের জীবন-জীবিকা চরম হুমকিতে পড়বে। সুন্দরী গাছের পরগাছা ও মড়ক রোধে ব্যাপক গবেষণা ছাড়া সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত বা মতামত দেওয়া সম্ভব না।
বাগেরহাট পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, আগে থেকেই সুন্দরী গাছের টপ ডাইং (আগা মরা) রোগের প্রাদুর্ভাব রয়েছে। আবার নতুন করে আরো বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে পরগাছার উপদ্রব। পূর্ব বন বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য গাছ মরে দাঁড়িয়ে আছে। এই পরগাছা এখন সুন্দরবন বিভাগের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের। সুন্দরী গাছ রক্ষা করতে এই পরজীবী নিয়ে দ্রুত গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।





















