আজ বিশ্ব প্রবীণ দিবস
১ কোটি ৬৭ লাখ প্রবীণের ভার, সেবায় এখনো শূন্যতা
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৯:৪০:২১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬ ১৯ বার পড়া হয়েছে
দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে দ্রুত, কিন্তু তাদের জন্য বাড়ছে না প্রয়োজনীয় সেবা ও নিরাপত্তা। বর্তমানে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬৭ লাখ—মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রক্ষেপণ বলছে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এই সংখ্যা পৌঁছাবে ১ কোটি ৬৮ লাখে। অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসা, আবাসন, সামাজিক নিরাপত্তা কিংবা আলাদা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।
আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব প্রবীণ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য— ‘দীর্ঘায়ুর যুগ : দীর্ঘ জীবনের জন্য ব্যবস্থাগুলোর পুনর্চিন্তা’। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, দীর্ঘ জীবন পাওয়া মানুষের শেষ বয়সের নিরাপত্তা এখনো অনিশ্চিত।
নেই পর্যাপ্ত প্রবীণ নিবাস, নেই পরিকল্পিত ব্যবস্থা
প্রবীণদের জন্য সরকারি আবাসনব্যবস্থা কার্যত অপ্রতুল। সমাজসেবা অধিদপ্তরের উদ্যোগে দেশের আট বিভাগে ‘শান্তি নিবাস’ প্রকল্প নেওয়া হলেও এখনো তা পুরোপুরি চালু হয়নি। সরকারি শিশু পরিবারগুলোর মাধ্যমে প্রবীণদের থাকার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে সেখানে আগ্রহী প্রবীণের সংখ্যা কম।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন করে এ সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবীণদের জন্য আলাদা ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসনব্যবস্থা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এ এস এম আতিকুর রহমান বলেন, প্রবীণদের আর্থিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন আলাদা কাঠামো। তার মতে, প্রবীণ উন্নয়ন ফাউন্ডেশন আইন কার্যকর করা এবং সর্বজনীন সামাজিক পেনশন চালু করা জরুরি।
৭০০ টাকার ভাতাতেও ভোগান্তি
সরকার প্রবীণদের জন্য বয়স্ক ভাতা চালু করলেও তা নিয়ে রয়েছে নানা জটিলতা। বর্তমানে একজন প্রবীণ মাসে ৭০০ টাকা ভাতা পান। ৯০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য এই পরিমাণ ১ হাজার টাকা।
তবে ভাতা পেতে গিয়ে অনেক প্রবীণকে পড়তে হচ্ছে ভোগান্তিতে। আগে অনেকেই সন্তান বা স্বজনের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে ভাতা নিতেন। এতে অনেক ক্ষেত্রে প্রতারণার শিকার হয়েছেন তারা। এখন নিজস্ব মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করা হলেও নম্বর পরিবর্তনসহ নানা জটিলতায় অনেকে সমস্যায় পড়ছেন।
এর পাশাপাশি প্রতারক চক্র সরকারি ভাতা বাড়িয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রবীণদের কাছ থেকে পিন ও গোপন তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
চিকিৎসায় নেই বিশেষায়িত সুবিধা
প্রবীণদের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিশেষ শাখা ‘জেরিয়াট্রিক মেডিসিন’। কিন্তু দেশে এই সেবা এখনো সীমিত। ফলে বয়সজনিত নানা সমস্যায় ভোগা প্রবীণদের সাধারণ রোগীদের সঙ্গে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
রাজধানীর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বিচ্ছিন্নভাবে জেরিয়াট্রিক সেবা চালু থাকলেও তা দেশের বিপুল সংখ্যক প্রবীণের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।
বারডেম হাসপাতালের জেরিয়াট্রিক ডে কেয়ার ইউনিটে প্রবীণদের জন্য বিশেষ সেবা দেওয়া হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের প্রতিটি জেলা পর্যায়ে এ ধরনের চিকিৎসাব্যবস্থা প্রয়োজন।
দ্রুত বাড়ছে প্রবীণ সমাজ, প্রস্তুতি কোথায়?
জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ দ্রুত প্রবীণ সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, ২০২৭ সালের দিকেই বাংলাদেশ ‘এজিং সোসাইটি’তে পরিণত হতে পারে। তাই এখনই প্রবীণদের উপযোগী স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা নতুন করে সাজানো প্রয়োজন।
আলাদা মন্ত্রণালয়ের দাবি
প্রবীণদের কল্যাণে আলাদা মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি উঠেছে দীর্ঘদিন ধরে। প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের মহাসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইন্তেজার রহমান বলেন, দেশের এত বড় একটি জনগোষ্ঠীর জন্য নির্দিষ্ট কোনো মন্ত্রণালয় না থাকা বড় ঘাটতি।
তার মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ প্রবীণ মন্ত্রণালয় গঠন করা হলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসুস্থ ও অসহায় প্রবীণরাও সরকারি সেবার আওতায় আসতে পারবেন।
দেশে মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে, বাড়ছে প্রবীণের সংখ্যাও। কিন্তু তাদের শেষ বয়সের নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার কাঠামো এখনো পিছিয়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবীণদের জন্য এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না নিলে ভবিষ্যতে এই জনসংখ্যা হবে বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ।




















