মূল্যস্ফীতি কমলেও কাটেনি ঝুঁকি, নীতি সুদহার ৯.৫০ শতাংশই থাকছে

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৩:৫২:১১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে
মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এর অন্তর্নিহিত ঝুঁকি এখনো উল্লেখযোগ্য বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২৬ প্রান্তিকের মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নতুন প্রান্তিকের মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে গত ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) ১৪তম সভায় সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি কমলেও তা দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণে আসার বিষয়ে এখনো পর্যাপ্ত প্রমাণ মেলেনি। বরং বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য অচলাবস্থা, দেশে নিয়ন্ত্রিত জ্বালানির দাম সমন্বয় এবং নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতিতে আগেভাগে মুদ্রানীতি শিথিল করা হলে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বেড়ে যেতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতিকে লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘ হতে পারে।
কমেছে মূল্যস্ফীতি, তবে স্বস্তি পুরোপুরি নয়
মুদ্রানীতির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। আগস্টে তা কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। মূলত খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে নামায় সার্বিক মূল্যস্ফীতিতেও নিম্নমুখী প্রবণতা এসেছে।
তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে রয়েছে। ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কমলেও এর ভেতরের চাপ পুরোপুরি দূর হয়নি বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়ন হলে মানুষের ব্যয়ক্ষমতা বাড়ার মাধ্যমে চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতির চাপও তৈরি হতে পারে।
প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি
মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও মন্থরতা রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে। একই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। ওই সময়ে শিল্প উৎপাদন ০ দশমিক ২৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।
শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির মতো সূচকগুলো অর্থনীতির গতি কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে কিছুটা পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, উচ্চ সুদে অর্থায়ন, জ্বালানি ঘাটতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দেশি-বিদেশি চাহিদার অনিশ্চয়তা প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
ঋণ প্রবৃদ্ধি তলানিতে, খেলাপি ঋণও বড় উদ্বেগ
২০২৬ সালের আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে। বিনিয়োগে মন্থরতা, ঋণগ্রহীতাদের উচ্চ ঝুঁকি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার কারণে ঋণের চাহিদা ও বিতরণ—দুটিই দুর্বল রয়েছে।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় ব্যাংক পুনর্গঠন, সুশাসন নিশ্চিত করা, মূলধন পুনরুদ্ধার এবং ঋণ শৃঙ্খলা জোরদারকে গুরুত্ব দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকাসহ মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ এবং কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
তবে সরবরাহপক্ষের সব বাধা শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে দূর করা সম্ভব নয় বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার।
রেমিট্যান্সে ইতিবাচক চিত্র
বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতিতে কিছুটা উন্নতিও হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যালেন্স অব পেমেন্টসের উদ্বৃত্ত ছিল ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যার প্রধান কারণ আর্থিক হিসাবের ঘাটতি।
এর মধ্যেও রেমিট্যান্স প্রবাহ ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি বিনিময় হার মোটামুটি স্থিতিশীল থাকায় আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা মিলেছে।
সামনে ধীরগতির পুনরুদ্ধারের আভাস
আগামী অর্থবছরে দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পরিবর্তে ধীরগতির পুনরুদ্ধার হতে পারে বলে ধারণা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশ্বব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে আইএমএফ তাদের আগের ৪ দশমিক ৩ শতাংশ পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়েছে।
মুদ্রানীতিতে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্য, কঠোর বৈশ্বিক মুদ্রানীতি, দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, রাজস্ব খাতের চাপ, জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রক্রিয়া যাতে ব্যাহত না হয়, আবার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও যাতে অতিরিক্ত চাপে না পড়ে—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল চ্যালেঞ্জ। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পরবর্তী মুদ্রানীতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।






















