সালমান শাহর মৃত্যু
ডন গ্রেপ্তারে তিন দশক পর তদন্তে নতুন মোড়

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৪:১৬:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
একটি মৃত্যু থামিয়ে দিতে পারে একটি জীবন, কিন্তু থামাতে পারে না মানুষের ভালোবাসা। তার প্রমাণ বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ। সিনেমায় অভিষেকের পর অল্প সময়েই যিনি জয় করে নিয়েছিলেন কোটি দর্শকের হৃদয়। ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত সেই নায়ক ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর হঠাৎই চলে যান না ফেরার দেশে।
সালমান শাহর মৃত্যুর পর তদন্তে বারবার উঠে এসেছে আত্মহত্যার তথ্য। তবে সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি তাঁর পরিবার ও অসংখ্য ভক্ত। দীর্ঘদিন ধরে মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনের দাবি জানিয়ে আসছে সালমানের পরিবার। পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনেও নারাজি দেয় পরিবার।
এরই ধারাবাহিকতায় ২১ অক্টোবর মামলায় সালমানের স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই এবং খলনায়ক ডন। তাদের বিরুদ্ধে জারি করা হয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা।
তিন দশক পর এবার সালমান শাহর মৃত্যুবার্ষিকী ঘিরে মামলাটিতে দেখা দিল নতুন উত্তেজনা। গত ৯ আগস্ট সালমান শাহ হত্যা মামলায় খল চরিত্রের অভিনেতা ডনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয় এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মঞ্জুর করা হয় পাঁচ দিনের রিমান্ড। ডনের গ্রেপ্তারির মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচিত এই মামলায় যেন নতুন করে গতি ফিরেছে।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বর্তমান পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ডনকে গ্রেপ্তারের পর তদন্তকারী কর্মকর্তা তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, বর্তমান সরকারের নীতি হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় সুযোগ দেওয়া।
সালমানের সঙ্গে বন্ধুত্বের সূত্রে সামীরার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল ডনের—এমন দাবি রয়েছে মামলাসংশ্লিষ্টদের। এ সম্পর্কের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ মিলতে পারে এমন একটি ছবির ফরেনসিক পরীক্ষার আবেদনও করেছেন সালমান শাহর পরিবারের আইনজীবী। তাদের প্রত্যাশা, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে ছবিটির সত্যতা যাচাই করা গেলে তদন্তে নতুন কোনো সূত্র সামনে আসতে পারে।
সালমান শাহর পরিবারের আইনজীবী ফারুক আহমেদ বলেন, ছবিটি সামীরার সঙ্গে মিলে গেলে তার সঙ্গে ডনের সম্পর্কের বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্লু পাওয়া যেতে পারে। সামীরা ছবিটিকে নিজের ছবি নয় বলে দাবি করলেও, আইনজীবীর মতে, বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করলেই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
তিনি আরও দাবি করেন, সালমান শাহর মৃত্যুর পর থেকেই দেশের চলচ্চিত্রশিল্পে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। তাঁর ধারণা, এর পেছনে কোনো তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা থাকতে পারে। বিষয়টি নিয়েও তারা তদন্ত করছেন বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে শুরু থেকেই সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন—এমন ধারণা প্রত্যাখ্যান করে আসছেন তাঁর মা নীলা চৌধুরী। ছেলের মৃত্যুকে তিনি হত্যাকাণ্ড হিসেবেই দেখছেন। একই সঙ্গে যেসব আসামি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে, তারা যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারেন, সে বিষয়ে পুলিশের পদক্ষেপও চান তিনি।
নীলা চৌধুরীর দাবি, সালমানের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারকে সঠিকভাবে মামলা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। বরং ঘটনাটিকে প্রথমে আত্মহত্যা এবং পরে অপমৃত্যু হিসেবে দেখানো হয়েছিল। তিনি বলেন, আজিজ মোহাম্মদ ভাই এখনো পলাতক থাকার পেছনে সালমান শাহর মামলাটিই অন্যতম কারণ।
ডনকে গ্রেপ্তারকে অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে মামলার তদন্তে এক ধাপ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সালমানের মা। তবে তাঁর অভিযোগ, মামলার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন আসামি এখনো বাইরে রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন লুসি, সামীরার বাবা এবং সামীরা নিজেও।
তিন দশক ধরে নানা প্রশ্ন, তদন্ত ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে সালমান শাহর মৃত্যুর মামলা। ডনের গ্রেপ্তার সেই পুরোনো রহস্যে নতুন করে আলো ফেলেছে। এখন প্রশ্ন একটাই—বাকি আসামিদের বিরুদ্ধে পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপ কী?
সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য কি এবার সত্যিই উন্মোচিত হবে? নাকি আরও দীর্ঘ হবে অপেক্ষা—উত্তরের জন্য অপেক্ষা করছেন তাঁর পরিবার, ভক্ত এবং পুরো চলচ্চিত্রাঙ্গন।























