ঢাকা ০২:৩৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রের আস্তানা, ছয় মাসে শত কোটি টাকা লুট!

বিশেষ প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০৮:০৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩০ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

দেশের গণ্ডি পেরিয়ে কক্সবাজারে আস্তানা গেড়েছে আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারক চক্র। গত ছয় মাস ধরে জেলার বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক হোটেল ভাড়া নিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল চক্রটির সদস্যরা। পুলিশের একাধিক সূত্রের দাবি, চক্রটিতে আড়াই শতাধিক থেকে তিন শতাধিক বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগই চীন ও তাইওয়ানের নাগরিক। প্রাথমিক অনুসন্ধানে চক্রটির বিরুদ্ধে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে।

ব্যাংক, মোবাইল ব্যাংকিং সেবা, ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া লিংক পাঠানো থেকে শুরু করে গ্রাহকের লগইন তথ্য, ওটিপি, কার্ডের তথ্য ও পাসওয়ার্ড সংগ্রহ—বিভিন্ন কৌশলে প্রতারণা চালিয়ে আসছে আন্তর্জাতিক চক্রগুলো। পাশাপাশি ভুয়া বিনিয়োগ, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং অল্প সময়ে বড় অঙ্কের লাভের প্রলোভন দেখিয়েও অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

কক্সবাজারে অবস্থান করা চক্রটির কার্যক্রম সামনে আসে বৃহস্পতিবার রাতে কলাতলী এলাকার হোটেল সি-প্যালেসে পুলিশের অভিযানের পর। অভিযানে চীনের ছয় নাগরিককে আটক করা হয়। শুক্রবার তাঁদের আদালতে পাঠানো হলে আদালত কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান জানান, অভিযানে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, অন্তত ৩০টি ল্যাপটপসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। রামু থানায় দায়ের করা একটি অভিযোগ এবং ঢাকার পুলিশের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযানটি পরিচালনা করা হয়।

পুলিশের একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চক্রটির সদস্যরা গত মার্চ থেকে কক্সবাজারে অবস্থান করছেন। ইনানী ও আশপাশের এলাকায় কয়েকটি আবাসিক হোটেল ভাড়া নিয়ে তাঁরা অবস্থান করছিলেন। বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিকের রহস্যজনক কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গোয়েন্দা নজরদারি শুরু করে। পরে তাঁদের অনলাইনভিত্তিক প্রতারণার সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়।

হোটেলেই ছিল বিপুল প্রযুক্তি সরঞ্জাম

গত ২৬ আগস্ট চীনা নাগরিকদের একটি দল হোটেল সি-প্যালেসে ওঠে। বৃহস্পতিবার রাতে সেখানে অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে আটক করে পুলিশ। তাঁদের কাছ থেকে বিপুলসংখ্যক আইফোন ও ল্যাপটপ উদ্ধারের ঘটনায় চক্রটির কর্মকাণ্ডের ধরন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে এসব ডিভাইস কী কাজে ব্যবহার করা হতো, কোন কোন দেশের নাগরিকদের টার্গেট করা হয়েছে এবং প্রতারণার মাধ্যমে কী পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়েছে—এসব বিষয়ে পুলিশ এখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

কীভাবে চলছে প্রতারণা?

অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারক চক্রগুলো সাধারণত পরিচিত প্রতিষ্ঠান বা আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের নাম-লোগো ব্যবহার করে ভুয়া ওয়েবসাইট ও লিংক তৈরি করে। এরপর গ্রাহকদের ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা মেসেজের মাধ্যমে এসব লিংক পাঠানো হয়। লিংকে প্রবেশ করে তথ্য দিলে তা চলে যায় প্রতারকদের নিয়ন্ত্রণে।

কখনো ব্যাংক হিসাব বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় দেখানো হয়, কখনো অ্যাকাউন্ট যাচাই বা তথ্য হালনাগাদের কথা বলা হয়। আবার কখনো বিনিয়োগে দ্রুত ও অস্বাভাবিক মুনাফার প্রলোভন দেখানো হয়। তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার পর ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়া কিংবা ভুয়া বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্মে টাকা জমা দিতে প্ররোচিত করা হয়।

কক্সবাজার কেন?

চক্রটির সদস্যরা কেন দীর্ঘ সময় ধরে কক্সবাজারকে কার্যক্রমের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছেন, সেটিও এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। পর্যটননির্ভর এই এলাকায় বিদেশি নাগরিকদের জন্য আবাসিক হোটেলে দীর্ঘদিন অবস্থান করা তুলনামূলক সহজ। তবে এত বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক একসঙ্গে অবস্থান করেও কীভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে গেলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

পুলিশের দাবি, চক্রটির অন্য সদস্যদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। অভিযানও অব্যাহত রয়েছে।

তবে এখনো স্পষ্ট হয়নি—চক্রটির মূল হোতা কারা, কক্সবাজারে তাদের কার্যক্রম কে সমন্বয় করছিল, ব্যবহৃত বিপুলসংখ্যক আইফোন ও ল্যাপটপ কোথা থেকে এসেছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে অর্থ লেনদেনের নেটওয়ার্কটি কীভাবে পরিচালিত হতো।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, গত ছয় মাসে চক্রটি ঠিক কত টাকা হাতিয়েছে এবং বাংলাদেশে বসে কোন কোন দেশ বা অঞ্চলের মানুষকে টার্গেট করা হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্ত এগোনোর পর।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রের আস্তানা, ছয় মাসে শত কোটি টাকা লুট!

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০৮:০৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দেশের গণ্ডি পেরিয়ে কক্সবাজারে আস্তানা গেড়েছে আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারক চক্র। গত ছয় মাস ধরে জেলার বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক হোটেল ভাড়া নিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল চক্রটির সদস্যরা। পুলিশের একাধিক সূত্রের দাবি, চক্রটিতে আড়াই শতাধিক থেকে তিন শতাধিক বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগই চীন ও তাইওয়ানের নাগরিক। প্রাথমিক অনুসন্ধানে চক্রটির বিরুদ্ধে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে।

ব্যাংক, মোবাইল ব্যাংকিং সেবা, ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া লিংক পাঠানো থেকে শুরু করে গ্রাহকের লগইন তথ্য, ওটিপি, কার্ডের তথ্য ও পাসওয়ার্ড সংগ্রহ—বিভিন্ন কৌশলে প্রতারণা চালিয়ে আসছে আন্তর্জাতিক চক্রগুলো। পাশাপাশি ভুয়া বিনিয়োগ, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং অল্প সময়ে বড় অঙ্কের লাভের প্রলোভন দেখিয়েও অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

কক্সবাজারে অবস্থান করা চক্রটির কার্যক্রম সামনে আসে বৃহস্পতিবার রাতে কলাতলী এলাকার হোটেল সি-প্যালেসে পুলিশের অভিযানের পর। অভিযানে চীনের ছয় নাগরিককে আটক করা হয়। শুক্রবার তাঁদের আদালতে পাঠানো হলে আদালত কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান জানান, অভিযানে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, অন্তত ৩০টি ল্যাপটপসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। রামু থানায় দায়ের করা একটি অভিযোগ এবং ঢাকার পুলিশের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযানটি পরিচালনা করা হয়।

পুলিশের একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চক্রটির সদস্যরা গত মার্চ থেকে কক্সবাজারে অবস্থান করছেন। ইনানী ও আশপাশের এলাকায় কয়েকটি আবাসিক হোটেল ভাড়া নিয়ে তাঁরা অবস্থান করছিলেন। বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিকের রহস্যজনক কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গোয়েন্দা নজরদারি শুরু করে। পরে তাঁদের অনলাইনভিত্তিক প্রতারণার সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়।

হোটেলেই ছিল বিপুল প্রযুক্তি সরঞ্জাম

গত ২৬ আগস্ট চীনা নাগরিকদের একটি দল হোটেল সি-প্যালেসে ওঠে। বৃহস্পতিবার রাতে সেখানে অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে আটক করে পুলিশ। তাঁদের কাছ থেকে বিপুলসংখ্যক আইফোন ও ল্যাপটপ উদ্ধারের ঘটনায় চক্রটির কর্মকাণ্ডের ধরন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে এসব ডিভাইস কী কাজে ব্যবহার করা হতো, কোন কোন দেশের নাগরিকদের টার্গেট করা হয়েছে এবং প্রতারণার মাধ্যমে কী পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়েছে—এসব বিষয়ে পুলিশ এখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

কীভাবে চলছে প্রতারণা?

অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারক চক্রগুলো সাধারণত পরিচিত প্রতিষ্ঠান বা আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের নাম-লোগো ব্যবহার করে ভুয়া ওয়েবসাইট ও লিংক তৈরি করে। এরপর গ্রাহকদের ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা মেসেজের মাধ্যমে এসব লিংক পাঠানো হয়। লিংকে প্রবেশ করে তথ্য দিলে তা চলে যায় প্রতারকদের নিয়ন্ত্রণে।

কখনো ব্যাংক হিসাব বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় দেখানো হয়, কখনো অ্যাকাউন্ট যাচাই বা তথ্য হালনাগাদের কথা বলা হয়। আবার কখনো বিনিয়োগে দ্রুত ও অস্বাভাবিক মুনাফার প্রলোভন দেখানো হয়। তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার পর ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়া কিংবা ভুয়া বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্মে টাকা জমা দিতে প্ররোচিত করা হয়।

কক্সবাজার কেন?

চক্রটির সদস্যরা কেন দীর্ঘ সময় ধরে কক্সবাজারকে কার্যক্রমের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছেন, সেটিও এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। পর্যটননির্ভর এই এলাকায় বিদেশি নাগরিকদের জন্য আবাসিক হোটেলে দীর্ঘদিন অবস্থান করা তুলনামূলক সহজ। তবে এত বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক একসঙ্গে অবস্থান করেও কীভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে গেলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

পুলিশের দাবি, চক্রটির অন্য সদস্যদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। অভিযানও অব্যাহত রয়েছে।

তবে এখনো স্পষ্ট হয়নি—চক্রটির মূল হোতা কারা, কক্সবাজারে তাদের কার্যক্রম কে সমন্বয় করছিল, ব্যবহৃত বিপুলসংখ্যক আইফোন ও ল্যাপটপ কোথা থেকে এসেছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে অর্থ লেনদেনের নেটওয়ার্কটি কীভাবে পরিচালিত হতো।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, গত ছয় মাসে চক্রটি ঠিক কত টাকা হাতিয়েছে এবং বাংলাদেশে বসে কোন কোন দেশ বা অঞ্চলের মানুষকে টার্গেট করা হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্ত এগোনোর পর।