প্রথম ধাপে ৮০০ ইউপিতে ভোট, পেশিশক্তি দেখালেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:১৭:৩০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে
তৃণমূলের নির্বাচনী মাঠে প্রভাব বিস্তার, পেশিশক্তির ব্যবহার ও সহিংসতা ঠেকাতে কঠোর অবস্থানের বার্তা দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী বছরের ২৭ মে’র মধ্যে পাঁচ ধাপে দেশের প্রায় ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন। এর মধ্যে প্রথম ধাপে আগামী ২১ জানুয়ারি প্রায় ৮০০ ইউনিয়ন পরিষদে ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্বাচন ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়ে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে আইন প্রয়োগে কঠোর হওয়ার কথা জানিয়েছে কমিশন। নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করা, ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো কিংবা পেশিশক্তি প্রয়োগের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি বিধি লঙ্ঘনের দায়ে কোনো প্রার্থীর প্রার্থিতাও বাতিল হতে পারে।
কমিশনের এই অবস্থান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশ ও ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে কঠোর বার্তার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাই হবে কমিশনের বড় পরীক্ষা।
পাঁচ ধাপে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ ইউপিতে ভোট
ইসির ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ২১ জানুয়ারি প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ হবে। এরপর ৪ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধাপ, ২৯ এপ্রিল তৃতীয় ধাপ, ১৩ মে চতুর্থ ধাপ এবং ২৭ মে পঞ্চম ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, আনুমানিক ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে। আইন অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ২৭ মের মধ্যে এসব ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবেন। সাধারণত ভোটগ্রহণের ৪২ থেকে ৪৫ দিন আগে তফসিল প্রকাশ করা হবে।
ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে জেলা সদরসংলগ্ন এবং পরে উপজেলা সদরের কাছাকাছি ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে ভোট আয়োজন করা হতে পারে। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন সহজ হবে। প্রয়োজনে পার্শ্ববর্তী জেলা থেকেও অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা যাবে।
পেশিশক্তি ও প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে ম্যাজিস্ট্রেট
নির্বাচনী মাঠে কোনো পক্ষের প্রভাব বিস্তার কিংবা সহিংসতা বরদাশত করা হবে না বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ।
তিনি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে মানদণ্ড অনুসরণের কথা বলা হয়েছে, সেই আলোকে ভালো নির্বাচন আয়োজনের প্রচেষ্টা থাকবে। কমিশনের নিজস্ব কোনো উদ্দেশ্য নেই; আইন অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নির্বাচন কমিশনার জানান, নির্বাচনে জুডিশিয়াল ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। কেউ নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করলে বিধি অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মারামারি, বিশৃঙ্খলা কিংবা পেশিশক্তির ব্যবহার করে কেউ ভোটের পরিবেশ প্রভাবিত করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো প্রার্থী এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তাঁর প্রার্থিতা বাতিলের ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।
তবে কমিশনের লক্ষ্য কেবল শাস্তি দেওয়া নয় বলে উল্লেখ করেন মাছউদ। তাঁর ভাষ্য, মানুষ যাতে অপরাধ থেকে বিরত থাকে এবং আইন মেনে চলে, সে ধরনের পরিবেশ তৈরি করাই কমিশনের উদ্দেশ্য।
নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে তাদের সহযোগিতা চাওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা থাকছে কমিশনের হাতে
সংশোধিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনী বিধিমালায় প্রভাব বিস্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন, বলপ্রয়োগ এবং নির্বাচনী কাজে বাধা দেওয়ার মতো অপরাধের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রয়েছে।
বিধিমালার ৮০(ক) বিধি অনুযায়ী, নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিকে হুমকি দেওয়া, ভয়ভীতি দেখানো, আঘাত করা কিংবা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তাঁর দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া অপরাধ। একইভাবে কমিশন অনুমোদিত গণমাধ্যমকর্মী ও পর্যবেক্ষকদের কাজে বাধা দেওয়া, তাঁদের শারীরিক ক্ষতি করা বা দায়িত্ব পালনে ব্যবহৃত সরঞ্জাম নষ্ট করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া, কোনো প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দেওয়া কিংবা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে বাধ্য করার মতো কর্মকাণ্ডও এই বিধির আওতায় পড়বে।
এসব অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড, অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
এ ছাড়া কোনো প্রার্থী বা তাঁর নির্বাচনী এজেন্ট বিধিমালা লঙ্ঘন করেছেন কিংবা লঙ্ঘনের চেষ্টা করেছেন বলে কমিশনের কাছে তথ্য-প্রমাণ থাকলে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া যাবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে এবং সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার যথেষ্ট ভিত্তি থাকলে লিখিত আদেশে তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে কমিশন।
অর্থাৎ, নির্বাচনী অনিয়মের দায় শুধু মাঠপর্যায়ের কর্মী বা সমর্থকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিধি অনুযায়ী প্রার্থী কিংবা নির্বাচনী এজেন্টের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অনিয়ম হলে ভোট স্থগিত, হতে পারে পুনর্নির্বাচন
নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার কিংবা কারসাজির মাধ্যমে কোনো ভোটকেন্দ্রের ফলাফল প্রভাবিত হলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের ফলাফল স্থগিত করার ক্ষমতাও রয়েছে কমিশনের।
সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, বলপ্রয়োগ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, কারসাজি কিংবা অন্য কোনো অনিয়মের কারণে কোনো কেন্দ্র বা একাধিক কেন্দ্রের ফলাফল প্রভাবিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হলে কমিশন সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলোর ফলাফল স্থগিত রাখতে পারবে।
পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান শেষে কমিশন ফলাফল প্রকাশের নির্দেশ দিতে পারে। আবার পরিস্থিতি বিবেচনায় ন্যায়সংগত মনে করলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় ভোটগ্রহণের নির্দেশও দেওয়া সম্ভব।
নির্বাচনী অপরাধ ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যবেক্ষণে মনিটরিং কমিটি গঠনের বিধানও রয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর কমিশন প্রয়োজনীয়সংখ্যক উপযুক্ত কর্মকর্তার সমন্বয়ে এসব কমিটি গঠন করতে পারবে। তাদের দায়িত্ব হবে নির্বাচনী অপরাধ ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা।
রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঠে বড় পরীক্ষা ইসির
প্রায় ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন দেশের তৃণমূল পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের একটি বড় আয়োজন। এই নির্বাচনে স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ, প্রার্থীদের প্রভাব, ভোটারদের নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কমিশন একদিকে কঠোর আইন প্রয়োগের কথা বলছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা নিয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে চায়। কিন্তু কেবল বিধিমালা ও শাস্তির বিধান থাকলেই নির্বাচনী অনিয়ম বন্ধ হবে না। অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত তদন্ত, অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার এবং প্রভাবশালী ও সাধারণ প্রার্থীর ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রয়োগের বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম ধাপের ভোট থেকে শুরু করে শেষ ধাপ পর্যন্ত কমিশন ঘোষিত অবস্থান বাস্তবে কতটা কার্যকর করতে পারে, সেটিই হবে এই নির্বাচনী আয়োজনের অন্যতম প্রধান বিবেচ্য বিষয়। ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারছেন কি না এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা সমান সুযোগ পাচ্ছেন কি না—এসব সূচকেই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা মূল্যায়িত হবে।





















