উত্তর বিএনপির নতুন কমিটি: পুরোনোদের লড়াই, নতুন মুখের অপেক্ষা
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৯:১৭:২৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত হওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে জোর আলোচনা। কে আসছেন সভাপতি বা আহ্বায়ক পদে, আর সদস্যসচিব কিংবা সাধারণ সম্পাদক হচ্ছেন কে—এ নিয়ে দলের ভেতরে চলছে নানা হিসাব।
বিলুপ্ত কমিটির পরিচিত মুখদের কেউ আবারও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ফিরতে পারেন—এমন আলোচনা যেমন আছে, তেমনি এবার অপেক্ষাকৃত নতুন ও তৃণমূলঘনিষ্ঠ নেতৃত্বকে সামনে আনার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে উত্তর বিএনপির নতুন কমিটি এখন অনেকটাই নির্ভর করছে নেতৃত্ব বাছাইয়ের সমীকরণের ওপর।
সভাপতি পদে আলোচনায় একাধিক মুখ
সভাপতি বা আহ্বায়ক পদে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব। তার সঙ্গে আলোচনায় রয়েছেন মহানগর উত্তরের প্রশাসক ও বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন, ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য ও বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম জাহাঙ্গীর, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসান, সাবেক সিনিয়র সদস্য আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার এবং বিলুপ্ত কমিটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান সেগুন।
সাইফুল আলম নীরবের নাম সামনে আসায় মহানগর উত্তরের সাবেক নেতৃত্বের একটি অংশের ভূমিকাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তবে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন সদ্য বিলুপ্ত কমিটির আহ্বায়ক আমিনুল হকও। তাকে সভাপতি করার দাবিতে গত ৫ অক্টোবর গুলশানে বিক্ষোভ মিছিল করেন বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ডের নেতাকর্মীরা।
‘বিলুপ্ত কমিটি থেকেই যোগ্য নেতৃত্ব’—এক পক্ষের অবস্থান
নতুন নেতৃত্বে অভিজ্ঞদের গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন বিলুপ্ত কমিটির এক নম্বর সদস্য আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার। তার মতে, আগের কমিটির মধ্য থেকেই যোগ্য নেতাদের বেছে নেওয়ার পাশাপাশি ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলসহ অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সাবেক নেতাদেরও নতুন কমিটিতে জায়গা দেওয়া যেতে পারে।
আমিনুল হকের পক্ষে অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, আন্দোলন-সংগ্রামে তার ভূমিকা ছিল এবং মহানগর উত্তরের নেতাকর্মীদের সংগঠিত রাখার ক্ষেত্রেও তিনি কাজ করেছেন।
অন্যদিকে এস এম জাহাঙ্গীরের বক্তব্য, নতুন কমিটির সিদ্ধান্ত নীতিনির্ধারকেরাই নেবেন। তবে নেতৃত্ব নির্বাচনে সাংগঠনিক দক্ষতা, যোগ্যতা ও অতীতের ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সদস্যসচিব পদেও জমছে হিসাব
সভাপতি পদের পাশাপাশি সদস্যসচিব বা সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়েও চলছে জোর আলোচনা। এ পদের দৌড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন বিলুপ্ত কমিটির সদস্যসচিব মোস্তফা জামান।
তার পাশাপাশি সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আফাজ উদ্দিন এবং দারুস সালাম থানা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক এস এ সিদ্দিকী সাজুর নামও রয়েছে আলোচনায়।
এ ছাড়া সাবেক কমিশনার আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার, মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক হাজী ইউসুফ ও সাবেক দপ্তর সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাকের নামও সাধারণ সম্পাদক পদের সম্ভাব্য তালিকায় ঘুরছে।
পরিবর্তনের ইঙ্গিত, কিন্তু সিদ্ধান্ত এখনো ঝুলে
নতুন কমিটি ঘোষণার সময় নিয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তার কাছে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য নেই। তবে সংগঠনের গতিশীলতার স্বার্থে পরিবর্তন আসবে এবং এটি চলমান প্রক্রিয়া।
অর্থাৎ পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্ট হলেও কারা আসছেন কিংবা কবে কমিটি ঘোষণা হবে—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
কেন ভাঙা হলো ৫১ সদস্যের কমিটি?
গত ৩০ সেপ্টেম্বর এক বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করে বিএনপি। কমিটিটির নেতৃত্বে ছিলেন আহ্বায়ক মো. আমিনুল হক ও সদস্যসচিব মো. মোস্তফা জামান।
বিজ্ঞপ্তিতে কমিটি বিলুপ্তির কারণ জানানো হয়নি। তবে একই বিজ্ঞপ্তিতে অতি শিগগির নতুন কমিটি ঘোষণার কথা বলা হয়।
একই দিনে মহানগর উত্তর যুবদল ও মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়।
এর আগে ২৪ সেপ্টেম্বর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার ছয় দিনের মাথায় তিন সংগঠনের কমিটি বিলুপ্ত হলেও বিএনপির বিজ্ঞপ্তিতে রাড্ডার ঘটনার কোনো উল্লেখ ছিল না।
ছয় সদস্য থেকে ৫১, এরপর বিলুপ্ত
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি প্রথমে ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর ছয় সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে। মাত্র ২২ দিনের মাথায় ২৬ নভেম্বর তা সম্প্রসারিত হয়ে ৫১ সদস্যের কমিটিতে রূপ নেয়।
কমিটিতে আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের পাশাপাশি ছিলেন ১৩ জন যুগ্ম আহ্বায়ক ও ৩৬ জন সদস্য।
প্রায় ২২ মাস পর সেই কমিটিই এখন অতীত। সামনে কেবল নতুন নেতৃত্বের অপেক্ষা।
সামনে তিন সম্ভাব্য সমীকরণ
নতুন কমিটি ঘিরে এখন মূলত তিন ধরনের সমীকরণ আলোচনায় রয়েছে। প্রথমত, বিলুপ্ত কমিটির অভিজ্ঞ নেতাদের মধ্য থেকেই নেতৃত্ব বেছে নেওয়া। দ্বিতীয়ত, অপেক্ষাকৃত নতুন ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের সামনে আনা। তৃতীয়ত, পুরোনো অভিজ্ঞতা ও নতুন নেতৃত্বের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কমিটি গঠন।
আমিনুল হককে সভাপতি করার দাবিতে প্রকাশ্য কর্মসূচি যেমন একটি পক্ষের শক্ত অবস্থান তুলে ধরেছে, তেমনি সাইফুল আলম নীরব, শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন, এস এম জাহাঙ্গীর, মামুন হাসান, আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার ও মোস্তাফিজুর রহমান সেগুনের নামও আলোচনাকে বহুমাত্রিক করেছে।
সদস্যসচিব পদে মোস্তফা জামান, আফাজ উদ্দিন ও এস এ সিদ্দিকী সাজুসহ আরও কয়েকজনকে ঘিরে চলছে আলোচনা।
তবে শেষ কথা বলবে দলের নীতিনির্ধারণী মহল। এখনো কোনো নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হয়নি।
তাই প্রশ্ন একটাই—ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিতে এবার কি ফিরবেন পুরোনো পরীক্ষিতরা, নাকি সংগঠনের হাল ধরবেন নতুন মুখ? উত্তর মিলবে নতুন কমিটি ঘোষণার পরই।



























