সেপ্টেম্বরের শেষেই ডেঙ্গুর ‘পিক’, ঝুঁকিতে ১৫ জেলা

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৮:২৪:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে
দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা। এরই মধ্যে সতর্কবার্তা দিয়েছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)—সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবরের শুরুতে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছে অন্তত ১৫ জেলা।
আইইডিসিআরের গত চার বছরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ বলছে, আগামী কয়েক সপ্তাহে ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, পিরোজপুর, নারায়ণগঞ্জ, ঝালকাঠি, কক্সবাজার, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা, বরিশাল, বরগুনা, বান্দরবান ও পটুয়াখালীতে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
দেশজুড়ে তিন মাসের পরিচ্ছন্নতা অভিযান
পরিস্থিতি মোকাবিলায় শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) থেকে সারা দেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করেছে সরকার। তিন মাসব্যাপী এ কর্মসূচিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠান ছাড়াও স্বেচ্ছাসেবক এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেবেন।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও কীটতত্ত্ববিদরাও সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা করে আসছিলেন। গত ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত জানিয়েছিলেন, দেশে ডেঙ্গু বাড়তে শুরু করেছে। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ ও অক্টোবরের শুরুতে ডেঙ্গুর ‘পিক’ বা সর্বোচ্চ প্রকোপ দেখা দিতে পারে বলেও সতর্ক করেছিলেন তিনি।
২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু ৬, হাসপাতালে ১,৫৬১
ডেঙ্গুর প্রকোপের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উদ্বেগও। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গুতে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৬১ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা মাসে মাসে বেড়েছে। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে মারা যান পাঁচজন। জুনে মৃত্যু হয় ১৩ জনের, জুলাইয়ে ৩৬ জনের এবং আগস্টে ৪৩ জনের। সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৩ দিনেই মারা গেছেন ৫২ জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪৯ জনে।
এ সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫১ হাজার ৮৩৭ জন। মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসেই আগের মাসের তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে খুলনা বিভাগে।
আক্রান্ত বেশি পুরুষ, মৃত্যু বেশি নারীর
ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি হলেও মৃত্যুর ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে। এখন পর্যন্ত আক্রান্তদের ৬২ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৮ শতাংশ নারী। বিপরীতে ডেঙ্গুতে মৃতদের মধ্যে ৫২ শতাংশ নারী এবং ৪৮ শতাংশ পুরুষ।
ঢাকা ছাড়িয়ে ছড়াচ্ছে ডেঙ্গু
একসময় ডেঙ্গু মূলত ঢাকা শহরকেন্দ্রিক থাকলেও এখন দেশের বিভিন্ন জেলায় রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার পর খুলনা বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণের জেলা পিরোজপুরেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী শনাক্ত হয়েছে। গত বছর বরগুনা শহরেও হঠাৎ ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ঢাকা কিংবা দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশনকে কেন্দ্র করে মশা নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না। পৌরসভা ও গ্রামাঞ্চলেও এডিস মশার বিস্তার এবং নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের ওপর নজর দিতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পুরো দেশকে বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি প্রয়োজন।
মৃত্যুহার কম, তবে ঝুঁকি কাটেনি
চলতি বছর এখন পর্যন্ত মৃত্যুহার আগের কয়েক বছরের তুলনায় কম—এটি কিছুটা স্বস্তির খবর। আইইডিসিআরের ২০২৩ সাল থেকে চলতি বছরের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে রেকর্ড ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হন এবং মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন। ওই বছর মৃত্যুহার ছিল শূন্য দশমিক ৫৩ শতাংশ।
২০২৪ সালে মৃত্যুহার ছিল শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ। চলতি বছরের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তা ছিল শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুহার সামান্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ২৯ শতাংশে।
ডেঙ্গুর কোন ধরন বেশি সক্রিয়?
ভাইরাসের ধরন নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। চলতি বছর আক্রান্ত ৭১ জনের নমুনা বিশ্লেষণ করে আইইডিসিআর জানিয়েছে, ৯১ দশমিক ৫ শতাংশ সংক্রমণের জন্য দায়ী ডেনভি-৩। বাকি ৮ দশমিক ৫ শতাংশ সংক্রমণ হয়েছে ডেনভি-২-এর কারণে।
বরগুনা, বান্দরবান ও পিরোজপুরে ডেনভি-২-এর সংক্রমণও পাওয়া গেছে।
রোগতত্ত্ববিদদের মতে, ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ধরন—ডেনভি-১, ডেনভি-২, ডেনভি-৩ ও ডেনভি-৪। একটি ধরনে আক্রান্ত হলে ওই নির্দিষ্ট ধরনের বিরুদ্ধে শরীরে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়। তবে অন্য তিন ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। ফলে একজন মানুষ জীবদ্দশায় চার ধরনের ডেঙ্গুতেই আক্রান্ত হতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথমবারের তুলনায় দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে। তৃতীয়বার সংক্রমিত হলে ঝুঁকি আরও গুরুতর হতে পারে। আইইডিসিআরের বিশ্লেষণেও বাংলাদেশে ডেঙ্গুর চারটি ধরনই সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
সমন্বয়ের ঘাটতিই বড় সমস্যা
জনস্বাস্থ্যবিদদের অভিযোগ, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সমন্বয়ের অভাব। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব মূলত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের, আর আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কঠিন—বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে এমন মত দিয়ে আসছেন।
তবে বাস্তবে সেই সমন্বয়ের ঘাটতি রয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০১৭ সালে ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রোগতত্ত্ববিদ ড. কে কৃষ্ণমূর্তিকে বাংলাদেশে পাঠায়। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি ২২ পৃষ্ঠার একটি পরিকল্পনা তৈরি করেন। এতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কমাতে রোগতত্ত্ববিদ, কীটতত্ত্ববিদ, অণুজীববিজ্ঞানী, তথ্য-শিক্ষা-যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যমকর্মীদের সমন্বয়ে ‘র্যাপিড রেসপন্স টিম’ গঠনের সুপারিশ করা হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ১২টি মন্ত্রণালয়কে যুক্ত করার কথাও বলা হয়েছিল। ২০১৯ সালের মধ্যে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের কথা থাকলেও তা হয়নি।
এরপর ২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জ্যেষ্ঠ কীটতত্ত্ববিদ বি এন নাগপালকে ঢাকায় পাঠায়। তিনি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দেন।
তাঁর মতে, শুধু সিটি করপোরেশনের কর্মীদের দিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কারণ এডিস মশা ঘরের ভেতরেও টেবিল-চেয়ার, সোফা, বিছানা, পর্দা ও আলমারির পেছনের মতো অন্ধকার ও আর্দ্র জায়গায় অবস্থান করে। তাই বাড়িঘরের ভেতরে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের কাজে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করাও জরুরি।
সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ ও অক্টোবরের শুরুতে সম্ভাব্য ‘পিক’ সামনে রেখে এখন প্রশ্ন একটাই—প্রতিরোধের প্রস্তুতি কি সংক্রমণের গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে?
























