বড় ঋণ খেলাপিরা কেন শাস্তির বাইরে, বারবার কেন মিলছে ছাড়?

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০৫:৪১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৭ বার পড়া হয়েছে
ব্যাংক থেকে সামান্য ঋণ নিয়ে কিস্তি পরিশোধে এক-দুই দিন দেরি হলেই গ্রাহকের ফোনে চলে আসে এসএমএস, বাড়িতে পৌঁছে যায় নোটিশ। শেষ পর্যন্ত গড়াতে পারে মামলাতেও। অথচ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বছরের পর বছর তা পরিশোধ না করেও বড় খেলাপিদের অনেকেই পাচ্ছেন পুনঃতফসিল, নবায়নসহ নানা নীতি সুবিধা। বাংলাদেশে এ বৈষম্য নিয়ে প্রশ্নও উঠছে দীর্ঘদিন ধরে।
দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০০৯ সালে যেখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা, ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১ হাজার কোটি টাকায়। ২০২৬ সালের মার্চে খেলাপি ঋণের পরিমাণ গিয়ে ঠেকেছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়।
অর্থাৎ দুই দশকেরও কম সময়ে খেলাপি ঋণের বোঝা বেড়েছে সাড়ে পাঁচ লাখ কোটি টাকার বেশি।
ছাড়ের পরও বাড়ছে খেলাপি ঋণ
খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে নীতি সহায়তা ও পুনঃতফসিলের সুযোগ দিলেও পরিস্থিতির বড় কোনো উন্নতি হয়নি। বরং ২০২৫ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপরও খেলাপি ঋণ উদ্ধারে কঠোর শাস্তির পরিবর্তে বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য নতুন করে ছাড় দেওয়ার নীতি নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আর্থিক খাতের বর্তমান দুর্বল অবস্থায় দ্রুত অর্থ ফেরত আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে বিকল্প কৌশল খুব বেশি নেই। তবে ছাড়ের এই নীতি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।
তাদের আশঙ্কা, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। ছয় লাখ কোটি টাকা থেকে তা আট লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতেও বেশি সময় লাগবে না।
খেলাপি ঋণ বাড়ার পেছনে যেসব কারণ
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ রয়েছে—রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অপরিণামদর্শী ঋণ বিতরণ, দুর্বল তদারকি এবং ব্যাংক পরিচালকদের নামে-বেনামে ঋণ নেওয়া।
গত দুই দশকে বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী ও ব্যাংকের আর্থিক কেলেঙ্কারিও খেলাপি ঋণের বোঝা বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর যে হারে প্রভিশন রাখার নিয়ম রয়েছে, অনেক ব্যাংকই সেটি যথাযথভাবে রাখতে পারছে না। এতে ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
বড় খেলাপিদের জন্য ১৫ বছর সময়
গত ৩১ আগস্ট ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ও আর্থিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনে নীতি সহায়তা দিয়ে একটি সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এতে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ থাকা গ্রাহকদের ঋণ পুনঃতফসিল বা নবায়নের পর তা পরিশোধে ১৫ বছর পর্যন্ত সময় দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দুই বছর কোনো কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না।
এই সুবিধা নিতে আগ্রহীদের সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবেদন করতে বলা হয়েছে। আবেদনগুলো ডিসেম্বরের মধ্যে নিষ্পত্তি করার কথা রয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বিদ্যমান খেলাপি ঋণের অন্তত ২ শতাংশ নগদ অর্থ জমা দেওয়ার শর্তে ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। ঋণ নিয়মিত হলে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ পরিশোধের জন্য দেওয়া হয়েছিল ১০ বছর সময়।
এ ছাড়া অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ভর্তুকি সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলের ঘোষণাও দেওয়া হয়।
কেন এত ছাড় দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক?
বড় খেলাপিদের জন্য বারবার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে সমালোচনা থাকলেও সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক এর পক্ষে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, খেলাপি ঋণ বাড়ার পেছনে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—
প্রথমত, বৈশ্বিক সংকট। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটে রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এতে অনেক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমেছে।
দ্বিতীয়ত, সুদের চাপ। বাজারভিত্তিক সুদহার চালুর পর ব্যবসায়ীদের সুদ ব্যয় বেড়েছে। একই সময়ে বিক্রি কমে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধ কঠিন হয়েছে।
তৃতীয়ত, ১৮ মাসের রোডম্যাপ। খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক যে রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে, তার অংশ হিসেবেই বড় ঋণগ্রহীতাদের বাড়তি সময় দেওয়া হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুক্তি হলো—দীর্ঘদিন মামলা চালিয়ে যে অর্থ আদায় করা সম্ভব নাও হতে পারে, আলোচনার মাধ্যমে তার একটি বড় অংশ দ্রুত আদায় করা গেলে ব্যাংকের তারল্য বাড়বে। পাশাপাশি কারখানা চালু রাখা সম্ভব হলে কর্মসংস্থানও টিকে থাকবে।
তবে ছাড় কি উল্টো খেলাপির সংস্কৃতি বাড়াবে?
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, অতিরিক্ত সুযোগ পেয়ে খেলাপিরা আরও বেশি ঋণখেলাপির দিকে যেতে পারেন।
তিনি বলেন, এসব সুযোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে ঋণগ্রহীতাদের বাছাই এবং অর্থ আদায়ে ব্যাংকের ওপরও বড় দায়িত্ব থাকবে।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, শুধু নীতি সহায়তা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। বড় খেলাপিদের ক্ষেত্রে জবাবদিহি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অর্থঋণ আদালতে দ্রুত বিচার, খেলাপিদের নতুন ব্যবসা ও বিদেশ ভ্রমণে বিধিনিষেধ—এ ধরনের কঠোর ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
আইনে ব্যবস্থা থাকলেও প্রয়োগ কতটা কঠোর?
বাংলাদেশে অর্থঋণ আদালতসহ ঋণ আদায়ের জন্য আইন রয়েছে। কিন্তু বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নজির তুলনামূলকভাবে কম।
বিআইবিএমের অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবীবের ভাষায়, বিদ্যমান আইনে ‘উইলফুল ডিফল্টার’ বা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এখনো কার্যকর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অবশ্য বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়। যুক্তরাষ্ট্রে ঋণ খেলাপির কারণে ক্রেডিট রেকর্ড ক্ষতিগ্রস্ত হলে নতুন ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। চীনে খেলাপিদের কালো তালিকাভুক্ত করার ব্যবস্থা রয়েছে। আর ভারতে ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংক্রাপ্টসি কোডের আওতায় বড় খেলাপি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি করে পাওনা আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে।
তাহলে বড় খেলাপিরা শাস্তি পান না কেন?
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সমস্যাটি শুধু আইন না থাকার নয়; বরং আইনের প্রয়োগ, রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যাংক পরিচালকদের জবাবদিহির ঘাটতি এবং দীর্ঘসূত্রতার সঙ্গে বিষয়টি জড়িত।
বিআইবিএমের অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবীবের মতে, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, সেটি ভাঙতে কঠোর পদক্ষেপ জরুরি। কিন্তু এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই জায়গায় যথেষ্ট শক্ত অবস্থান নেয়নি।
ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—বারবার ছাড় দিয়ে কি সত্যিই খেলাপি ঋণ আদায় সম্ভব, নাকি এতে ভালো ঋণগ্রহীতাদের ওপরই বাড়তি চাপ তৈরি হবে?
ব্যাংকিং খাতকে টিকিয়ে রাখতে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হতে পারে এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে সৎভাবে ব্যবসা করে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ঋণগ্রহীতা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ না দেওয়া বড় খেলাপিদের এক চোখে দেখা হবে না। পাশাপাশি ঋণ দেওয়ার সময় যেমন কঠোর যাচাই দরকার, তেমনি ইচ্ছাকৃত খেলাপির ক্ষেত্রে দৃশ্যমান শাস্তিও নিশ্চিত করা জরুরি।























