সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী
তিন বছরে বন্ধ ৪ শতাধিক পোশাক কারখানা, বাড়ছে রপ্তানি ঝুঁকি
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:০১:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৮ বার পড়া হয়েছে
বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা, একের পর এক যুদ্ধ, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট—সব মিলিয়ে চাপে পড়েছে দেশের তৈরি পোশাক খাত। এরই মধ্যে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছরে বন্ধ হয়ে গেছে ৪ শতাধিক তৈরি পোশাক কারখানা।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমিনের লিখিত প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির।
বিজিএমইএর ২৮২, বিকেএমইএর ১২০ কারখানা বন্ধ
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, তিন বছরে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) ২৮২টি এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) ১২০টি সদস্য কারখানা বন্ধ হয়েছে। অর্থাৎ দুই সংগঠনের সদস্য হিসেবে মোট ৪০২টি কারখানা বন্ধ হয়েছে।
বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর নামের তালিকা সংগ্রহের কাজ চলছে বলেও সংসদে জানান মন্ত্রী।
যেসব কারণে বন্ধ হচ্ছে কারখানা
গত ২২ জুন বিজিএমইএর প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী কারখানা বন্ধের পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে—
- করোনা মহামারির বৈশ্বিক প্রভাব
- রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ
- মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত
- যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত
- আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মন্দা
- দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা
- অর্থ পাচারের কারণে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট
- ইউরোপের সঙ্গে ভারত ও ভিয়েতনামের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ)
এ ছাড়া বিদেশি ক্রেতাদের নিজস্ব মনিটরিং সুবিধার অভাবে ছোট ও মাঝারি কারখানায় রপ্তানি আদেশ দিতে অনাগ্রহও সংকটের অন্যতম কারণ বলে জানান তিনি।
এলডিসি উত্তরণেও বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর বিভিন্ন উন্নত দেশের ট্রেডিং স্কিমে বিদ্যমান অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী।
এর ফলে প্রায় ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও সংসদে জানান তিনি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৪ হাজার ৫০৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর চলতি বছরের জুলাইয়ে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩ হাজার ৮৮৬ দশমিক ৭২ মিলিয়ন ডলার।
ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার
ভারতের সঙ্গেও বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। বাণিজ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই দেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় পৌনে ১৩ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ ভারতে রপ্তানি করেছে ১ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য।
সংসদে দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৭ হাজার ৩১৩ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে ১১ হাজার ৬৯৮ দশমিক ৬০ মিলিয়নে দাঁড়ায়। এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭ হাজার ৭১৬ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭ হাজার ৪৩০ দশমিক ৯৬ মিলিয়ন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭ হাজার ৮৫৯ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন ডলার ঘাটতি ছিল।
তবে সরকার কোনো একটি দেশের সঙ্গে আলাদাভাবে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর পরিবর্তে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী।
নতুন রপ্তানি বাজার খুঁজছে সরকার
রপ্তানি বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে চামড়া, পাট, জাহাজ নির্মাণ, হালকা প্রকৌশল ও সেমিকন্ডাক্টরসহ কয়েকটি খাতকে সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব খাতে নীতি সহায়তা, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ভারতের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিরও যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তবে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ভারতের দিক থেকে কিছু বাধা রয়েছে। একই সঙ্গে গত দুই বছরে বাংলাদেশের দিক থেকেও কিছু প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
ভোজ্যতেলেও আমদানিনির্ভরতা
সংসদে দেওয়া তথ্যে আরও জানা যায়, দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। বর্তমানে বছরে দেশে আনুমানিক ২২ থেকে ২৫ লাখ মেট্রিক টন ভোজ্যতেলের প্রয়োজন হয়।
এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২২ দশমিক ৭৯ মিলিয়ন ডলারের পান রপ্তানি করেছে। লেবানন, ওমান, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রে এ পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
দুই স্ট্রোক ইঞ্জিনের থ্রি-হুইলার, টেম্পো ও অটোরিকশাসহ সংশ্লিষ্ট যানবাহন আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২৯ অনুযায়ী আমদানি নিষিদ্ধ বলেও সংসদে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তবে স্থানীয়ভাবে ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার উৎপাদনে সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানি করা হচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এআরটি চুক্তির ফলে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে বলেও জানান তিনি।




















