হাসিনাকে ঘিরে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:২২:২৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে
দিল্লিতে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের যে উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, দিল্লির ওই আয়োজন তা আরও জটিল করে তুলেছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বশীল ও কূটনৈতিক একাধিক সূত্র জানিয়েছে, শেখ হাসিনার অনুষ্ঠানের দুই দিন আগে ভারতের সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একজন প্রতিনিধি এবং ঢাকার নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে যোগাযোগ হয়েছিল। ওই আলোচনায় দিল্লিতে শেখ হাসিনার গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময় নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ জানানো হয়।
সূত্রের দাবি, তখন ভারতীয় পক্ষ জানিয়েছিল, অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার রেকর্ড করা বক্তব্য প্রচার করা হবে এবং গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিও সীমিত থাকবে। শুধু আয়োজক সংগঠনের সদস্যদের অংশ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই আশ্বাস অনুযায়ী অনুষ্ঠান হয়নি বলে বাংলাদেশের পক্ষের অভিযোগ।
এর আগে গত ৩০ জুলাই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার দেশটির পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছিল, শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটি থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এর এক সপ্তাহের মধ্যেই দিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে তার সরাসরি মতবিনিময়ের আয়োজন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
দিল্লির আয়োজনে ঢাকার ক্ষোভ
গত বুধবার দিল্লিতে শেখ হাসিনার মতবিনিময় অনুষ্ঠানের পরপরই কড়া প্রতিক্রিয়া জানায় বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে গণমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় ঢাকা ক্ষুব্ধ ও হতাশ।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন যাত্রার প্রচেষ্টায় এ ধরনের আয়োজন নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—এমন উদ্বেগ অনুষ্ঠানটির আগেই ভারতকে জানানো হয়েছিল। এরপরও শেখ হাসিনাকে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ গভীর হতাশা প্রকাশ করে।
বিবৃতিতে দিল্লির ওই আয়োজনকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি অপমান হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
শেখ হাসিনার বক্তব্য সমর্থন করে না ভারত
এদিকে শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, দিল্লির ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি স্পষ্ট করেন, অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যের কোনো অংশই ভারত সরকার সমর্থন করে না।
বিশেষ করে বাংলাদেশের বৈধভাবে গঠিত সরকারের বিরুদ্ধে দেওয়া বক্তব্যও ভারত অনুমোদন করে না বলে জানান তিনি।
দিল্লির ওই আয়োজন নিয়ে ভারতের কিছু গণমাধ্যমেও সমালোচনা হয়েছে। দেশটির ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এক সম্পাদকীয়তে লিখেছে, শেখ হাসিনা ভারতে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে পারেন, তবে সেই আশ্রয়কে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মঞ্চে পরিণত করা সমস্যাজনক। একই সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কোনো এক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হওয়া উচিত নয় বলেও মত দেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারতের অস্বস্তি?
শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। দিল্লি থেকে প্রচারিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে না পারার পেছনে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও একটি কারণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ছাড়ার পর প্রায় দুই বছর ধরে দিল্লিতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। এ সময় তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিও বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারও দিয়েছেন। তবে দিল্লির ওই অনুষ্ঠানেই প্রথমবারের মতো সরাসরি ভার্চুয়াল মাধ্যমে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছার কথাও জানান। তার এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ঢাকার নীতিনির্ধারণী মহলেও নতুন করে প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে।
আস্থার সংকট নিয়ে উদ্বেগ
ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ভাষ্য, ভারতের মাটিতে অবস্থান করে শেখ হাসিনা যেন বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ড বা বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির কোনো উদ্যোগ নিতে না পারেন, সে বিষয়ে ভারতকে একাধিকবার অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা। এ বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়ায় দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কূটনীতিকেরা।
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যেন বাংলাদেশে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সে বিষয়ে নয়াদিল্লির সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণও অনিশ্চিত
এরই মধ্যে আগামী ১২ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। তবে ওই সম্মেলনে তিনি অংশ নেবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এই সফর হলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তারেক রহমানের প্রথম সরাসরি বৈঠকের সুযোগ তৈরি হতে পারত। পাশাপাশি চীন ও রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও বৈঠকের সুযোগ থাকত।
তবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলের মতে, দিল্লিতে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক মতবিনিময় অনুষ্ঠান ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের বিষয়টিকে আরও অনিশ্চিত করেছে। বিশেষ করে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়ায় ঢাকার অসন্তোষ বেড়েছে বলে তারা মনে করছেন।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, ভারত চাইলে এই সংবাদ সম্মেলন ঠেকাতে পারত। ফলে বাংলাদেশ এ ঘটনাকে শেখ হাসিনার প্রতি ভারতের রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দেখার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত মনে করেন, প্রায় দুই বছর ধরে টানাপোড়েনের পর বাংলাদেশ ও ভারত যখন সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে, তখন এ ঘটনা ঘটেছে। তবে এটিকে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ধাক্কা হিসেবে না দেখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
তার মতে, ভারত ও বাংলাদেশ—উভয় দেশই পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে লাভবান হতে পারে। তাই সাম্প্রতিক উত্তেজনা কাটিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে বৃহত্তর স্বার্থে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ এখনো রয়েছে।





















