ঢাকা ১০:৫৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দূর্গম চরে শিক্ষার সংকট, হাঁটতে শিখেই কাজে নামছে শিশুরা

লিয়াকত হোসাইন লায়ন, জামালপুর
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৫৫:৩৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

জামালপুরে ইসলামপুরে যমুনার চরাঞ্চলের হাজার হাজার শিশু অশিক্ষার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে। চরাঞ্চল গুলোতে বেড়ে উঠা এসব শিশু জানেনা কি তাদের ভবিষ্যৎ। যমুনা-ব্রহ্মপুত্র নদনদী উপজেলার বুক চিড়ে প্রবাহিত হওয়ায় নদীভাঙন, বন্যা খড়াসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে সংগ্রাম করে বাঁচতে হয় চরাঞ্চলের মানুষদের। দারিদ্রতম উপজেলার মধ্যে ইসলামপুর অন্যতম। দু’টি নদনদী এ উপজেলাকে তিনভাগে বিভক্ত করে রেখেছে। যে কারণে এ অঞ্চলের শিশুদের ঘাড়ে চেপে বসেছে দারিদ্রতার অভিশাপ। আর তাদের উজ্জল ভবিষৎ অন্ধকারে ঢাকা পড়ছে।

যমুনা নদী ইসলামপুরের ছয়টি ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকা যমুনা নদী গ্রাস করায় মন্নিয়া, বরুল, জিগাতলা, শীলদহ, বেড়কুশা, সিন্দুরতলী, সাপধরী, কাসারীডোবা, চরশিশুয়া, কোদালধোঁয়া ও চর বিশরশিসহ প্রায় ৩০টি দূর্গম চরাঞ্চলের সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষার আলো তো দূরের কথা সভ্যতার আলোও সঠিকভাবে পৌঁেছনি এসব চরাঞ্চলে।

পরিসংখ্যান ব্যুরো সূত্রজানায়, এসব গ্রামে ২০ থেকে ২৫হাজার শিশু রয়েছে। যাদের বেশির ভাগই স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়না। হাঁটতে শিখলেই চরাঞ্চলের মানুষরা শিশুদের পাঠিয়ে দেয় আয়ের পথে। এদের মধ্যে মন্নিয়া গ্রামের হোটেল শ্রমিক নিরব মিয়া (৮) এবং ঘোড়ার গাড়ী চালক মিজান আলী (৯)সহ চরাঞ্চলের শতশত শিশু সকাল হলেই বেড়িয়ে পড়ে রোজগার করা জন্য।

শিক্ষা বিভাগ সূত্রে জানাযায়, যমুনার চরাঞ্চলের প্রায় ৩০টি গ্রামে ২৩টি প্রাইমারি স্কুল, ৫টি এবতেদায়ি মাদরাসা, তিনটি মাধ্যমিক স্কুল এবং একটি দাখিল মাদরাসাসহ ৩০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান,সরকারি প্রাইমারি স্কুল ও ইবতেদায়ি মাদরাসা গুলো চলছে নামে মাত্র। সরকারি স্কুলের বেশির ভাগ শিক্ষক ঢাকা, ময়মনসিংহ, জামালপুর ও উপজেলা শহরে বসবাস করে কোচিং বাণিজ্য ব্যস্ত। স্কুলগুলো চলছে প্রক্সি শিক্ষক ও নৈশপ্রহরী দিয়ে। এলাকার অল্প শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীরা সামান্য বেতনে এসব স্কুলে প্রক্সি শিক্ষক হিসাবে পাঠদান করাচ্ছেন। এমনিতে যমুনার চরাঞ্চলের শিশুরা স্কুলে যায়না। যারাও স্কুলে আসে কিন্তু শিক্ষক না আসায় হৈহুল্লোর করে বাড়ি ফিরে যায়। ফলে যমুনা চরের শিশুরা অশিক্ষার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে। এসব শিশুরা জানেনা কি তাদের ভবিষ্যৎ। এলাকাবাসী আরো জানান, যমুনাচরের স্কুলগুলোতে শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তাদেরও কোন তদারকি নেই। এ সুযোগে শিক্ষকরা চাকরি না করে সরকারের লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

ইসলামপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জাহানারা বেগম জানান,প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয় পাঠদান করানোর কোন নিয়ম নেই। এ ধরনের কাজ কোন বিদ্যালয় করলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বর্তমানের প্রতিনিয়তই মনিটরিং চলছে। এতে করে শিক্ষার পরিবেশ অনেকটা ফিরে এসেছে।

সাপধরী ইউপি চেয়ারম্যান শাহ আলম মন্ডল বলেন, যমুনার চরাঞ্চল গুলো অত্যন্ত দূর্গম হওয়ায় প্রশাসনের অনেকটা নাগালের বাইরে। এছাড়া বেশীর ভাগই অতি দরিদ্রতার মধ্যে বসবাস করেন। চরাঞ্চলের শিশুদের শিক্ষিত করতে হলে শিশু শ্রম ও বাল্য বিবাহ বন্ধের পাশাপাশি চরের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ও শিক্ষকদের আবাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

ইসলামপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আরিফা আক্তার বাংলা টাইমসকে বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং ঝরে পড়া রোধের এই লড়াইয়ে প্রশাসনের পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অভিভাবকগণ যদি তাদের সন্তানদের পড়ালেখার নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখেন, তবে শিক্ষার্থীরা আড্ডাবাজি ও অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করে পড়াশোনায় মনোযোগী হবে। সকলের সম্মিলিত ও সমন্বিত প্রচেষ্টায় এগিয়ে যাবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং নিশ্চিত হবে সুন্দর ভবিষ্যৎ। এছাড়াও শিশুশ্রম বন্ধ এবং শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করতে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

চরাঞ্চল বাসীর দাবী,সঠিক তদারকির মাধ্যমে শিক্ষার সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পারলেই আলোকিত হবে যমুনার দূর্গম চরাঞ্চলবাসী।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

দূর্গম চরে শিক্ষার সংকট, হাঁটতে শিখেই কাজে নামছে শিশুরা

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৫৫:৩৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬

জামালপুরে ইসলামপুরে যমুনার চরাঞ্চলের হাজার হাজার শিশু অশিক্ষার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে। চরাঞ্চল গুলোতে বেড়ে উঠা এসব শিশু জানেনা কি তাদের ভবিষ্যৎ। যমুনা-ব্রহ্মপুত্র নদনদী উপজেলার বুক চিড়ে প্রবাহিত হওয়ায় নদীভাঙন, বন্যা খড়াসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে সংগ্রাম করে বাঁচতে হয় চরাঞ্চলের মানুষদের। দারিদ্রতম উপজেলার মধ্যে ইসলামপুর অন্যতম। দু’টি নদনদী এ উপজেলাকে তিনভাগে বিভক্ত করে রেখেছে। যে কারণে এ অঞ্চলের শিশুদের ঘাড়ে চেপে বসেছে দারিদ্রতার অভিশাপ। আর তাদের উজ্জল ভবিষৎ অন্ধকারে ঢাকা পড়ছে।

যমুনা নদী ইসলামপুরের ছয়টি ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকা যমুনা নদী গ্রাস করায় মন্নিয়া, বরুল, জিগাতলা, শীলদহ, বেড়কুশা, সিন্দুরতলী, সাপধরী, কাসারীডোবা, চরশিশুয়া, কোদালধোঁয়া ও চর বিশরশিসহ প্রায় ৩০টি দূর্গম চরাঞ্চলের সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষার আলো তো দূরের কথা সভ্যতার আলোও সঠিকভাবে পৌঁেছনি এসব চরাঞ্চলে।

পরিসংখ্যান ব্যুরো সূত্রজানায়, এসব গ্রামে ২০ থেকে ২৫হাজার শিশু রয়েছে। যাদের বেশির ভাগই স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়না। হাঁটতে শিখলেই চরাঞ্চলের মানুষরা শিশুদের পাঠিয়ে দেয় আয়ের পথে। এদের মধ্যে মন্নিয়া গ্রামের হোটেল শ্রমিক নিরব মিয়া (৮) এবং ঘোড়ার গাড়ী চালক মিজান আলী (৯)সহ চরাঞ্চলের শতশত শিশু সকাল হলেই বেড়িয়ে পড়ে রোজগার করা জন্য।

শিক্ষা বিভাগ সূত্রে জানাযায়, যমুনার চরাঞ্চলের প্রায় ৩০টি গ্রামে ২৩টি প্রাইমারি স্কুল, ৫টি এবতেদায়ি মাদরাসা, তিনটি মাধ্যমিক স্কুল এবং একটি দাখিল মাদরাসাসহ ৩০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান,সরকারি প্রাইমারি স্কুল ও ইবতেদায়ি মাদরাসা গুলো চলছে নামে মাত্র। সরকারি স্কুলের বেশির ভাগ শিক্ষক ঢাকা, ময়মনসিংহ, জামালপুর ও উপজেলা শহরে বসবাস করে কোচিং বাণিজ্য ব্যস্ত। স্কুলগুলো চলছে প্রক্সি শিক্ষক ও নৈশপ্রহরী দিয়ে। এলাকার অল্প শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীরা সামান্য বেতনে এসব স্কুলে প্রক্সি শিক্ষক হিসাবে পাঠদান করাচ্ছেন। এমনিতে যমুনার চরাঞ্চলের শিশুরা স্কুলে যায়না। যারাও স্কুলে আসে কিন্তু শিক্ষক না আসায় হৈহুল্লোর করে বাড়ি ফিরে যায়। ফলে যমুনা চরের শিশুরা অশিক্ষার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে। এসব শিশুরা জানেনা কি তাদের ভবিষ্যৎ। এলাকাবাসী আরো জানান, যমুনাচরের স্কুলগুলোতে শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তাদেরও কোন তদারকি নেই। এ সুযোগে শিক্ষকরা চাকরি না করে সরকারের লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

ইসলামপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জাহানারা বেগম জানান,প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয় পাঠদান করানোর কোন নিয়ম নেই। এ ধরনের কাজ কোন বিদ্যালয় করলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বর্তমানের প্রতিনিয়তই মনিটরিং চলছে। এতে করে শিক্ষার পরিবেশ অনেকটা ফিরে এসেছে।

সাপধরী ইউপি চেয়ারম্যান শাহ আলম মন্ডল বলেন, যমুনার চরাঞ্চল গুলো অত্যন্ত দূর্গম হওয়ায় প্রশাসনের অনেকটা নাগালের বাইরে। এছাড়া বেশীর ভাগই অতি দরিদ্রতার মধ্যে বসবাস করেন। চরাঞ্চলের শিশুদের শিক্ষিত করতে হলে শিশু শ্রম ও বাল্য বিবাহ বন্ধের পাশাপাশি চরের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ও শিক্ষকদের আবাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

ইসলামপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আরিফা আক্তার বাংলা টাইমসকে বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং ঝরে পড়া রোধের এই লড়াইয়ে প্রশাসনের পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অভিভাবকগণ যদি তাদের সন্তানদের পড়ালেখার নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখেন, তবে শিক্ষার্থীরা আড্ডাবাজি ও অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করে পড়াশোনায় মনোযোগী হবে। সকলের সম্মিলিত ও সমন্বিত প্রচেষ্টায় এগিয়ে যাবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং নিশ্চিত হবে সুন্দর ভবিষ্যৎ। এছাড়াও শিশুশ্রম বন্ধ এবং শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করতে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

চরাঞ্চল বাসীর দাবী,সঠিক তদারকির মাধ্যমে শিক্ষার সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পারলেই আলোকিত হবে যমুনার দূর্গম চরাঞ্চলবাসী।