অবসরে গড়িমসিতে প্রশ্ন, রাতের ভোটের ডিসিদের নিয়ে বাড়ছে বিতর্ক
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৪৫:৫৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অনুষ্ঠিত বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়ায় ধীরগতির অভিযোগ উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যেসব ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) ডিসির চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হবে, তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর কথা থাকলেও সেই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণের অভিযোগ উঠেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিতর্কিত নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী ২২ জন জেলা প্রশাসককে বাধ্যতামূলক অবসর এবং আরও ৩৩ জনকে ওএসডি করা হয়েছিল। বর্তমানে ওএসডি থাকা ওই ৩৩ কর্মকর্তার চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলেও এখনো তাদের অবসরের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
‘রাতের ভোট’ বিতর্কের পর তদন্ত
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশ-বিদেশে ‘রাতের ভোট’ নামে ব্যাপক সমালোচিত হয়। অভিযোগ ছিল, ভোটগ্রহণের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখা হয়েছিল এবং ভোটারদের ভোটাধিকার কার্যত খর্ব করা হয়।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এরপর বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়। এ লক্ষ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের তালিকা চেয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চিঠি দেয়।
তদন্তে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন এবং দুদকের অনুসন্ধানে অনেক সাবেক ডিসির বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও আর্থিক অনিয়মের তথ্য পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এসব তদন্ত শেষে পর্যায়ক্রমে ৫৪ জন কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়।
সরকারের আগের অবস্থান
ওএসডি করার সময় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সচিব মো. মোখলেস উর রহমান বলেছিলেন, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী জেলা প্রশাসকদের ভূমিকা দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তৈরিতে নেতিবাচক ছিল।
তিনি জানিয়েছিলেন, যাদের চাকরির বয়স ২৫ বছরের কম, তাদের ওএসডি করা হয়েছে। আর যাদের চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে, তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
‘সিন্ডিকেটের কারণে বিলম্ব’
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রের দাবি, সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়ের ভেতরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট নানা কৌশলে বিলম্ব করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, বিতর্কিত নির্বাচনে ভূমিকার মাধ্যমে এসব কর্মকর্তা পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের সুবিধা পেয়েছেন। এখন তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে গিয়েও নানা ধরনের প্রভাব খাটানো হচ্ছে।
তাদের ভাষ্য, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগে অভিযুক্ত এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শুধু প্রশাসনিক নয়, আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া উচিত।
অবসরের তালিকায় যাদের নাম
বাধ্যতামূলক অবসরের তালিকায় রয়েছেন পটুয়াখালীর সাবেক ডিসি মো. মতিউল ইসলাম চৌধুরী, পঞ্চগড়ের সাবেক ডিসি সাবিনা ইয়াসমিন, মেহেরপুর ও টাঙ্গাইলের সাবেক ডিসি মো. আতাউল গনি, পিরোজপুরের সাবেক ডিসি আবু আলী মো. সাজ্জাদ হোসেন, সিলেটের সাবেক ডিসি এম কাজী এমদাদুল ইসলাম, সাতক্ষীরার সাবেক ডিসি এস এম মোস্তফা কামাল, লক্ষ্মীপুরের সাবেক ডিসি অঞ্জন চন্দ্র পাল, কুড়িগ্রামের সাবেক ডিসি সুলতানা পারভীন, কিশোরগঞ্জের সাবেক ডিসি মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী, খাগড়াছড়ির সাবেক ডিসি মো. শহিদুল ইসলাম, খুলনার সাবেক ডিসি মোহাম্মদ হেলাল হোসেন, মাগুরার সাবেক ডিসি মো. আলী আকবর, বান্দরবানের সাবেক ডিসি মো. দাউদুল ইসলাম, চাঁদপুরের সাবেক ডিসি মো. মাজেদুর রহমান খান, চাপাইনবাবগঞ্জের সাবেক ডিসি এ জেড এম নুরুল হক, বরিশালের সাবেক ডিসি এস এম আজিয়র রহমান, ভোলার সাবেক ডিসি মো. মাসুদ আলম সিদ্দিক, চুয়াডাঙ্গার সাবেক ডিসি গোপাল চন্দ্র দাশ, বরগুনার সাবেক ডিসি কবীর মাহমুদ, দিনাজপুরের সাবেক ডিসি মো. মাহমুদুল আলম, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাবেক ডিসি হায়াত-উদ-দৌলা খান, কুমিল্লার সাবেক ডিসি মো. আবুল ফজল মীর, নেত্রকোনার সাবেক ডিসি মঈন উল ইসলাম, ফেনীর সাবেক ডিসি মো. ওয়াহিদুজ্জামান, রাঙামাটির সাবেক ডিসি এ কে এম মামুনুর রশিদ, রাজশাহীর সাবেক ডিসি এস এম আব্দুল কাদের, ঠাকুরগাঁওয়ের সাবেক ডিসি ড. কে এম কামরুজ্জামান সেলিম, শরীয়তপুরের সাবেক ডিসি কাজী আবু তাহের, নওগাঁ ও ময়মনসিংহের সাবেক ডিসি মো. মিজানুর রহমান, সুনামগঞ্জের সাবেক ডিসি মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ, শেরপুরের সাবেক ডিসি আনার কলি মাহবুব, নরসিংদীর সাবেক ডিসি সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন এবং হবিগঞ্জের সাবেক ডিসি মাহমুদুল কবীর মুরাদ।
ওএসডি হলেও দায়িত্বে একজন কর্মকর্তা
এদিকে ওএসডি হওয়ার পরও এক কর্মকর্তা এখনো দায়িত্বে বহাল রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারির প্রজ্ঞাপনে চাপাইনবাবগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক এ জেড এম নুরুল হককে ওএসডি করা হয়। সে সময় তিনি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, একই তালিকার অন্য কর্মকর্তাদের অবমুক্ত করা হলেও প্রায় দেড় বছর পার হলেও এ জেড এম নুরুল হক এখনো দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। বিষয়টি নিয়েও প্রশাসনের ভেতরে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।




















